সারথি বিশ্বাস

এই মুহূর্তে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অতিমারির চেয়ে আহামরি ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে নুসরত জাহানের ব্যক্তিগত জীবন। মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা ঝুলে থেকে থেকে পড়ে গেল জলে, এখন কী হবে পড়ুয়াদের ভবিষ্যৎ, কোন মানদণ্ডেই বা তারা ‘মানুষ’ হবে, তার থেকেও জরুরি প্রশ্ন হচ্ছে— নুসরতের সন্তানের বাবা কে? আমাদের পুরুষতন্ত্র আর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের মাঝে, বাস্তবকে ভুলিয়ে দেওয়ার এটা আবার নতুন কোনও চক্রান্ত কিনা কে জানে! আসলে আমরা ‘গসিপ’ ভালোবাসি তো! তাই ভালোবেসে পড়ে থাকি ও-পাড়ায়!
তবুও, নৈতিকতার দোহাই দিয়ে কেউ কেউ যদি বলেন, সন্তান বড় করতে আমাদের সমাজে পিতৃ-পরিচয় গুরুত্ব পায়, আমি সেই দায়িত্বশীল ‘ফেলু মিত্তির’-দের বলব, নুসরত যা করেছেন স্বেচ্ছায় করেছেন, তিনি সাহসী, স্বাবলম্বী, তার উপর আমাদের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে, তাঁর সন্তানের বাবা খোঁজা ছাড়ুন; আমাদের চারপাশে মানসিক ভারসাম্যহীন ভবঘুরে যে মহিলারা ‘উপরওয়ালার’ কৃপায় হঠাৎ হঠাৎ অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন, পেটে বাচ্চা নিয়ে রাস্তায় পড়ে থাকেন, তাঁদের সন্তানের বাবা খুঁজে দিন না, প্লিজ!
কে অন্তঃসত্ত্বা হয়েছেন, আর কে সেই ইতিহাস গড়েছেন, এ সবের ভূত-ভবিষ্যৎ তাঁদের উপরেই ছেড়ে দিলে হয় না! কে কার সঙ্গে প্রেম করল, কার সংসার কেন ভাঙল, এ সব প্রশ্নের উত্তর কি তৃতীয় মানুষ দিতে পারে? কোনও মানুষের পক্ষে কি এর নাগাল পাওয়া সম্ভব? আসলে, সংসার কী এবং কাকে বলে, সংসার থেকে আমরা ঠিক কী চাই, এ সব নিয়ে মানুষের মধ্যে কিছু ‘কমন’ ধারণা আছে। মানুষ সংসার জীবনে একটা লক্ষ্মণরেখা টেনে রাখে। এর বাইরে গেলেই গেল গেল রব ওঠে! যখন কোনও সংসার ভেঙে যায়, আমরা দু’জনের মধ্যে অন্তত একজনকে হয় আশির দশকের হিন্দি সিনেমার কুমির পোষা ভিলেন ভাবি, আর না হয় বাংলা সিরিয়ালের সংসার ভাঙা কুটনী। অপর জনকে ভাবি গঙ্গাজল, ধোয়া তুলসীপাতা অথবা বিশল্যকরণী। কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে আসলে কিন্তু আমরা বেশিরভাগই কেউ-ই এতটা ভালো নই, আবার এতটা খারাপও নই। দু’জন ভালো মানুষের মধ্যেও সম্পর্ক না-ও টিকতে পারে। এটা আমাদের বুঝতে ও শিখতে হবে। নুসরত বিয়ের সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে এসেছেন মানেই তিনি খুব ভয়ঙ্কর কেউ, এমন তো না-ও হতে পারে।
প্রেম যখন আসে, সব প্রেমই অনন্তের বার্তা নিয়ে আসে। তারপরে কখন ক্ষয় ধরে অজান্তে! ক্যান্সার আক্রান্ত হয় প্রেম। ক্যান্সার আক্রান্ত কোষ বাদ দেওয়াই সুস্বাস্থ্যের লক্ষণ। এক ছাদের নীচে থাকলেই, এক বিছানায় ঘুমোলেই, এক টেবিলে নৈশভোজ করলেই সুখী হওয়া যায় না সব সময়। শরীর নিয়ে কাছে আসলেই মনের কাছে আসা যায় না। সঙ্গম করলেই স্পর্শ করা হয় না। অনেক দম্পতিই আছেন আমাদের মধ্যে, যারা সঙ্গম ছাড়া একে অপরকে স্পর্শ করেন না কখনও। অথচ, আমরা সবাই বেখেয়ালে হাতের উপর একটা হাত চাই, কিছু অপ্রয়োজনীয় কথা চাই, একটু এলোমেলো হাসি চাই। শুধু এটুকুর খোঁজেও কেউ কেউ পথে বের হয়। পেল কী পেল না, সেটা তার ব্যাপার। পাবে, কী পাবে না, সেটা ভবিষ্যৎ বলবে। পথের শেষে ঠিকানা না মিললে, সে বুঝবে। হাঁটছে তো সে, আমাদের পায়ে এত ফোসকা পড়ে কেন?
প্রত্যেক ব্যক্তির চাহিদা আলাদা, প্রয়োজন আলাদা, সমস্যা আলাদা। সবার সমাধানও এক পথে আসে না। নুসরত, নিখিল আর যশকে ওঁদের নিজের দায়িত্বে ছেড়ে দেওয়া যায় না কি? তবুও, নৈতিকতার দোহাই দিয়ে কেউ কেউ যদি বলেন, সন্তান বড় করতে আমাদের সমাজে পিতৃ-পরিচয় গুরুত্ব পায়, আমি সেই দায়িত্বশীল ‘ফেলু মিত্তির’-দের বলব, নুসরত যা করেছেন স্বেচ্ছায় করেছেন, তিনি সাহসী, স্বাবলম্বী, তার উপর আমাদের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে, তাঁর সন্তানের বাবা খোঁজা ছাড়ুন; আমাদের চারপাশে মানসিক ভারসাম্যহীন ভবঘুরে যে মহিলারা ‘উপরওয়ালার’ কৃপায় হঠাৎ হঠাৎ অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন, পেটে বাচ্চা নিয়ে রাস্তায় পড়ে থাকেন, তাঁদের সন্তানের বাবা খুঁজে দিন না, প্লিজ!

(ফিচার ছবি গুগল থেকে নেওয়া)