সুদীপ জোয়ারদার

অভিধান বলবে, অদ্ভুত। বলবে, মিথ্যে, অলীক। আমরা বলব, হোক না তা। মাঝে মাঝে এত সত্যির ভিতরে কিছু মজার মিথ্যেই না হয় রইল! দিনটা যখন বর্ষার তখন এমন গল্প তো বিষণ্ন দিনটাকেই একটু অন্যরকম করে দেয়! ‘আষাঢ়ে গল্প’ তাই বর্ষার নানাবিধ ঐশ্বর্যের মধ্যে একটি।
আমরা যাঁরা ছেলেবেলা কাটিয়েছি গ্রামে, না-ইলেকট্রিকের যুগে, তাদের কাছে ‘আষাঢ়ে গল্পে’র স্মৃতি বেশ উজ্জ্বল। বর্ষার দিনে বড় একজন কাউকে পাকড়াও করে অসম্ভবের নানা গল্প তখন কেমন জমে যেত, তা অনেকেরই মনে পড়বে। চাই কি এই বাদল দিনের প্রথম কদমফুলের মতোই সুবাসও ছড়িয়ে দিয়ে যাবে।
বেশিরভাগ অভিধান ‘আষাঢ়ে গল্পে’র সঙ্গে আষাঢ়ের যোগ নিয়ে উচ্চবাচ্য করেনি। তা নাই করুক, রবীন্দ্রনাথ যখন লিখে গিয়েছেন, ‘আষাঢ় মাসের সঙ্গেই আষাঢ়ে গল্পের যোগ’ তখন অভিধান বা প্রমথ চৌধুরীর, বাঙাল ভাষার ‘আজাড়ে গল্প’ থেকে এসেছে ‘আষাঢ়ে গল্প, মতও তত ধরার নয়।
আর আমরা তো জানিই আষাঢ়ে যখন, ‘উতল ধারা’য় ‘বাদল ঝরে’, চারদিক ‘আঁধার করে আসে’, সত্যি- মিথ্যের সীমারেখা তখন কী ভাবে মুছে যেতে থাকে। একটা বাল্যকাল যেন বিরাজ করতে থাকে প্রকৃতি জুড়ে। এ সময়ে অসম্ভবের গল্প ছাড়া আর কী-ই বা মানায়! ‘আষাঢ়ে গল্প’ তাই আষাঢ়েরই গল্প বা একটু সীমাটা বাড়িয়ে বলা যেতে পারে বর্ষার গল্প।

তবে ছেলেবেলায় দেখতাম যাঁরা একটু বয়স্ক কথক, তাঁরা কিন্তু চট করে শিশুদের ভয় দেখাতে চাইতেন না। তাঁদের গল্পে শীর্ষেন্দুর উপন্যাসের মতো ভাল ভূত, ভাল ব্রহ্মদত্যিরা ভিড় করে আসত। এবং এঁরা যে সব সময় প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার নিরিখে গল্প বলতেন তাও নয়। এঁদের গল্পে ছায়া থাকত উপেন্দ্রকিশোর, দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারদের লিখে যাওয়া গল্পের।

‘আষাঢ়ে গল্প’ যখন বলা হয়, তখন কথক এমনভাবে গল্পটা বলেন, যেন ঘটনা ঘটার সময়ে সাক্ষী হিসেবে তিনি উপস্থিত ছিলেন, অথবা তাঁর জীবনেই ঘটে গিয়েছে ঘটনাটি। এইসব গল্পের বেশিরভাগই ভূত, পেত্নি— এ সব নিয়ে। যে বাঁশবাগান, নিমগাছ বা এলাকার প্রান্তের পোড়ো ভিটেটাকে আমরা সে ভাবে গুরুত্ব দিইনি এতদিন, সেগুলো বেশিরভাগ অশরীরীকেন্দ্রিক গল্পের অকুস্থলের গৌরব পেয়ে যায়। তারপরে বড় না হওয়া পর্যন্ত ছোটদের কাছে সেগুলো বেশ আতঙ্কেরও হয়ে থাকে।
তবে আষাঢ়ে গল্প মানেই যে ভয়-ধরানো ব্যাপার তা কিন্তু নয়। অভিধানের অর্থ তালিকায় ভয়ের তো নামগন্ধ নেই। আর জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের অভিধানে যেখানে আষাঢ়ে গল্পের অর্থটা সুস্পষ্ট করার চেষ্টা করা হয়েছে বন্ধনীর মধ্যে, সেখানেও লেখা হয়েছে, ‘আষাঢ় মাসের দিনগুলি দীর্ঘ এবং বৃষ্টি বাদলে বাহিরে যাইবারও উপায় বড় থাকে না। পূর্ব্বে বাঙ্গালার ছেলে মেয়েরা বৃদ্ধাদিগের নিকট বসিয়া বহুবিধ অদ্ভুত ও  আনন্দজনক গল্প শুনিয়া আষাঢ়ের দীর্ঘ দিবসগুলি কাটাইত’ ইত্যাদি।
অর্থাৎ সারকথা এটাই, বক্তার গল্পের গরু যেন গাছে ওঠে, সে ভয় ধরানো গল্প হোক বা না হোক। তবে ছেলেবেলায় দেখতাম যাঁরা একটু বয়স্ক কথক, তাঁরা কিন্তু চট করে শিশুদের ভয় দেখাতে চাইতেন না। তাঁদের গল্পে শীর্ষেন্দুর উপন্যাসের মতো ভাল ভূত, ভাল ব্রহ্মদত্যিরা ভিড় করে আসত। এবং এঁরা যে সব সময় প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার নিরিখে গল্প বলতেন তাও নয়। এঁদের গল্পে ছায়া থাকত উপেন্দ্রকিশোর, দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারদের লিখে যাওয়া গল্পের। তবু মাঝে মাঝে কিছু অন্যধারার গল্পও সেখানে থাকত। এর মধ্যে একটা ছিল নিশির ডাকের গল্প।
মনে পড়ে, আমাদের গ্রাম-লাগোয়া ছোট্ট স্টেশনখানা বিকেলের গাড়ি চলে যাওয়ার পরে যখন শুনশান হয়ে যেত বেশ কিছুক্ষণের জন্য, সেসময় রেলের এক কর্মচারী আমাদের মতো কয়েকটা কচিকাঁচাকে জুটিয়ে গল্পের আসর বসাতেন। সে আসরেই এক ঝিরঝিরে বৃষ্টি-বিকেলে প্রথম শুনেছিলাম নিশির ডাকের গল্প। রাত গভীর হলে কোনও চেনা মানুষের রূপ ধরে যে নিশি এসে ধরে নিয়ে যায় বালক বালিকাদের, তারপর পিছু পিছু তাকে নিয়ে গিয়ে কখনও চাঁপা গাছে দোল খাওয়ায়, কখনও ফাঁকা মাঠে তার সঙ্গে খেলা করে, আর সব শেষে নদী বা পুকুরের জলে ডুবিয়ে মারে কিংবা অনেকদূরে কোনও গাছের তলায় তাকে ফেলে রেখে যায় মৃতবৎ।
আজ বুঝি বর্ষার কাছ থেকে এই সব ভয়ভীতি মিশ্রিত আনন্দ সে সময় শিশু-কিশোরদের ছিল এক অনিবার্য ও মহার্ঘ পাওনা। শুধু  যে বড়রাই ছোটদের আসরে এসে এই সব আষাঢ়ে গল্পে কাঁপন ধরাতেন তা কিন্তু নয়। ছোটরা বাড়ির বড়দের মুখে শোনা গল্পও নিজেদের মধ্যে বলাবলি করত। স্কুলে পড়ার সময় একবার এক বৃষ্টি-বিঘ্নিত ছুটির দিনে স্কুল বারান্দায় বসে সহপাঠী বেল্লাল শুনিয়েছিল জিনে পাওয়া ওর এক পাড়াতুতো পিসির গল্প। রাত্রিতে পিসির ঘর থেকে নাকি গানবাজানার আওয়াজ পাওয়া যেত। কিন্তু দরজা খুলে ভিতরে ঢোকার সাহস কারও ছিল না। কারণ দরজা খুলে ভিতরে ঢুকলেই নাকি অবধারিত ছিল মুখ দিয়ে রক্ত উঠে মৃত্যু। বেল্লাল নিজের কানে গানবাজনার শব্দ শুনেছে কিনা অথবা দরজা খুলে ভিতরে ঢুকে কেউ মারা পড়েছে কিনা এ সব প্রশ্ন করার বয়স বাল্যকাল নয়। বাল্যকাল মানে চোখ-কান বুজে সব কিছুকে বিশ্বাসের কাল। অন্তত তখন। তাই বাড়ি ফিরেছিলাম মাথায় যুগপৎ জিন ও জল নিয়ে। আর এর সঙ্গে তো জিনের খপ্পরে পড়ে যাবার একটা কারণহীন আশঙ্কা ছিলই।

এখন অবস্থাটা একটু আলাদা। স্কুলের চৌকাঠ পেরোতে না পেরোতেই এখন সবার কাছে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপের দরজা খুলে যায়। বর্ষার দিনে এত বড় বন্ধুদের ফেলে কে উঁকি মারবে অবাস্তব আর আজগুবি গল্পের জগতে!

বর্ষার দিনে শুধু যে আষাঢ়ে গল্প শুনেই আমরা ক্ষান্ত হতাম তা কিন্তু নয়। পড়তামও এই ধরনের গল্প। পছন্দের বই ছিল আরব্যরজনী। আলাদিন, আলিবাবা আমাদের তখন প্রিয় গল্প। এ সব গল্প গোগ্রাসে গেলার জন্য মেঘমেদুর দুপুরবেলার চাইতে প্রশস্ত সময় আর কী হতে পারে! উপেন্দ্রকিশোরের ‘গরীব মুচির গল্প’ তখন প্রাথমিকে পাঠ্য। এই ধরনের গল্প লেখার জাদুকর লেখকের নামটি তখন থেকেই জানা। সত্যজিতের সিনেমা দেখার ঢের আগে আমাদের পড়া হয়ে গিয়েছিল, উপেন্দ্রকিশোরের ‘গুপি গাইন বাঘা বাইন’। মন ফুরফুরেও হয়ে গিয়েছিল। ঠিক উল্টোটা হয়েছিল এর অনেক পরে এক বৃষ্টিভেজা রাতে উপেন্দ্রকিশোরের নাতি সত্যজিতের ‘খগম’ পড়ে। রাত্রিতে সেদিন আর বিছানা ছেড়ে ওঠার সাহস হয়নি।
আমাদের বাংলা সাহিত্যে আষাঢ়ে গল্প কিন্তু নেহাৎ কম নেই। আষাঢ়ে গল্পের গল্পকারদের মধ্যে ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় তো বসে আছেন একেবারে রাজার আসনে। তাঁর ‘লুল্লু’তে আমীর সেখের পরিহাস করে বলা ‘লে লুল্লু’ কথাটার সূত্রে আমীরের বিবির লুল্লু ভূতের খপ্পরে পড়া এবং তার কাছ থেকে আমীরের বিবি-উদ্ধার কাহিনি যেমন চমকপ্রদ, তেমনি উদ্ভট। জল জমে বরফ হওয়ার মতো অন্ধকার জমে ভূত হওয়ার কথা বাংলাসাহিত্যের পাঠক সেই প্রথম জানল। জানল ভূতের তেলের কথা, ঘানি ঘুরিয়ে ভূতের দেহ থেকে তা বের করার কলাকৌশল ও ভূতের তেলের গুনাগুণ। ত্রৈলোক্যনাথের ‘ডমরু-চরিতে’র গল্পগুলো তো আষাঢ়ে গল্পের প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
রাজশেখর বসু বিখ্যাত রস-সাহিত্যক। আজগুবি গল্প তিনিও লিখে গিয়েছেন বেশ কিছু। এরমধ্যে ‘ভুশণ্ডীর মাঠে’ গল্পে জনমানবশূন্য ভুশণ্ডীর মাঠটায় শিবু ভট্টাচার্যের তিন জন্মের তিন স্ত্রী, আর শিবু-পত্নী নৃত্যকালীর তিন জন্মের তিন স্বামী মিলে যে অশরীরী কাণ্ডকারখানা ঘটায়, তা পড়ে মুগ্ধ হয়নি এমন বাঙালি বিরল।
আষাঢ়ে গল্প রবীন্দ্রনাথের মতো লেখক লিখবেন না তাই কখনও হয়? ‘একটা আষাঢ়ে গল্প’ নাম দিয়েই তো তিনি লিখে গিয়েছেন একখানা অসম্ভব কল্পনার গল্প। এক দুয়োরানীর ছেলে এক রাজপুত্র, সওদাগর পুত্র ও কোটাল পুত্রের সঙ্গে ভাগ্যচক্রে তাসের রাজ্যে চলে এলে কী ভাবে তাসের ছবির দল মানুষ হয়ে উঠল, সে গল্প আমরা কে না পড়েছি! গল্পটার ‘তাসের দেশ’ নাটকে রূপান্তর তো আরও উপভোগ্য। আষাঢ়ে গল্প রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন আরও। ১৯৩৭ সালে প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর ‘সে’ নামের এক অসাধারণ সাহিত্যকর্ম। এখানে বাঁধনহারা অসম্ভব কল্পনা, শিশুমনের সাধ, ভাললাগা কৌতুকরস যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে তাঁর খেয়ালী মনের ভিন্ন এক প্রয়াস, কথাকে অর্থের বন্ধন মুক্তি। ‘সে’কে বলা হয় ছদ্মবেশী শিশুসাহিত্য। অবশ্য সে-বিচারে শিশুতোষ অনেক আজগুবি গল্পই তো শুধু শিশুদের জন্য নয়। তাই বিচার থাক। উদ্ভট কল্পনা রসে জারিত ‘সে’ র কিছু অংশের রস তো আমরা আমাদের ছেলেবেলায় উধো, গোবরা, পঞ্চুর কথাবার্তার মাধ্যমেই পেয়েছি। সেসময় ‘গেছোবাবা’ নাটক না বুঝেও ভাল লেগেছে। এখানেই তো আষাঢ়ে গল্প হিসাবে ‘সে’র সিদ্ধি।
বর্ষার দিনে আষাঢ়ে গল্পের মজা সে শুনেই হোক বা পড়েই হোক, শুধু শিশু-কিশোরদেরই একচেটিয়া ছিল, এমন ভাবার কিন্তু কোনও কারণ নেই। তখন না ছিল টিভি, না ছিল মোবাইল। ঘনবৃষ্টিধারার আবরণে কেজো পৃথিবীর চাহিদা বড়দের কাছেও কিছুটা সময়ের জন্য লুপ্ত হয়ে যেত। তখন তাঁদের কাছে সত্যি সত্যি ‘ধরা যেন অস্ফুট স্বপন’ (‘শ্রাবণে’/অক্ষয় কুমার বড়াল)। এ সময় সে ফিরত আপন ঘরে। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘একটু ভেবে দেখলেই দেখা যায়, বুদ্ধি বিচার তর্ক বা চিন্তার শৃঙ্খলা— এ আমাদের সহজভাব নয়, এ আমাদের যেন সংসারে বেরোবার আপিসের কাপড়-দ্বিতীয় ব্যক্তির সঙ্গে দেখা  করবার সময়েই তার আবশ্যক-আপনার ঘরে এলেই ছেড়ে ফেলি। আমরা স্বভাব-শিশু স্বভাব-পাগল বুদ্ধিমান সেজে সংসারে বিচরণ করি’ (‘বর্ষার চিঠি’)। ফলে উপকথাগুলো আমাদের বড়দের কাছেও কেমন যেন সত্যি হয়ে উঠত।
এখন অবস্থাটা একটু আলাদা। স্কুলের চৌকাঠ পেরোতে না পেরোতেই এখন সবার কাছে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপের দরজা খুলে যায়। বর্ষার দিনে এত বড় বন্ধুদের ফেলে কে উঁকি মারবে অবাস্তব আর আজগুবি গল্পের জগতে! তবু এরই মধ্যে যখন কিছু ব্যতিক্রমী যৌবন আজও খুঁজতে চায় বর্ষার পুরনো গন্ধ ও স্বাদ, বুঁদ হয় ইউটিউবে ‘সানডে সাসপেন্স’ জাতীয় অডিয়ো গল্পে তখন সত্যি বড় আহ্লাদ হয়।

(ফিচার ছবি গুগল থেকে নেওয়া)