সন্দীপন মজুমদার

গত শতাব্দীর সত্তরের দশকের শেষে এবং আশির দশকের গোড়ায় বেশ কয়েকজন বাঙালি চলচ্চিত্র পরিচালক বেশ সাড়া ফেলে আবির্ভূত হয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, গৌতম ঘোষ, উৎপলেন্দু চক্রবর্তী, অপর্ণা সেন, নব্যেন্দু চট্টোপাধ্যায় প্রভৃতি। ঋত্বিক ঘটক প্রয়াত হলেও সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন তখনও সৃষ্টিশীল। তবুও এই নতুন পরিচালকেরা তাঁদের সৃষ্টিকর্মের দিকে আলাদা করে নজর কেড়ে নিতে পেরেছিলেন। ফলে অনেক আলোচক এমনও বলতে শুরু করেছিলেন যে, বাঙালি পরিচালকেরা এক নবতরঙ্গের জন্ম দিয়েছেন। ষাটের দশকের গোড়ায় ফ্রান্সে পাঁচ পরিচালকের ছবিকে যে ভাবে নবতরঙ্গ (নুভেল ভাগ) আখ্যা দেওয়া হয়েছিল, এটা অনেকটা সেই রকম। কিন্তু সময়ের ব্যবধান পেরিয়ে এসে বোঝা যায় যে, আমাদের এখানে আদৌ কোনও নবতরঙ্গ হয়নি ফ্রান্সের মতো।
ফ্রান্সে নবতরঙ্গের মূল লক্ষণ ছিল যে, তাঁরা সিনেমার প্রচলিত ভাষা ও ন্যারেটিভকে প্রশ্ন করে নতুন ভাষার জন্ম দিয়েছিলেন। ওই নবতরঙ্গের অন্যতম প্রাণপুরুষ জাঁ লুক গোদার জাম্পকাট এবং হ্যাণ্ডহেল্ড ক্যামেরার ব্যবহারে, ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো ফ্রিজ শটের উদ্ভাবনে আমাদের চমকে দিয়েছিলেন। আমাদের এখানে সিনেমার ন্যারেটিভ বা ভাষা নিয়ে সেরকম কোনও প্রতিপ্রশ্ন পরিচালকদের ছিল না। ফলে এখানে সিনেমায় নবতরঙ্গ বলে তখনও কিছু ছিল না, এখন তো আরও নেই। এর একটা বড় কারণ শুধু ফর্ম নয়, বিষয়বস্তুর দৈন্যও বটে। আমরা যাঁদের দিকে বড় ভরসা নিয়ে তাকিয়েছিলাম তাঁদের সিনেমাও ব্যতিক্রম ব্যতিরেকেই পরবর্তীকালে রক্তাল্পতায় ভুগেছে। অথচ যাঁর মধ্যে এই অন্য ধারার সিনেমার প্রস্ফুটিত হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে প্রবল ছিল তিনিই সম্প্রতি চলে গেলেন। হ্যাঁ, আদি পর্ব বাদ দিলে বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের সিনেমার বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবনে কোনও প্রভাব ছিল না। সেটা তাঁর কোনও ছবিই এখানকার প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেত না, শুধু সেই কারণেই নয়। দেশ বিদেশের চলচ্চিত্র উৎসবে তাঁর ছবি নিয়মিত প্রদর্শিত হলেও তিনি যে নতুন কিছু করছেন না, পুনরাবৃত্তির চক্রে ঘুরপাক খাচ্ছেন সে কথা প্রকৃত চলচ্চিত্র রসিকদের কাছে অজানা ছিল না।
তবু আমাদের কাছে সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণাল উত্তর পর্বে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় পরিচালক যে বুদ্ধদেবই ছিলেন সে ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই। অন্তত তাঁর একদম প্রথম কাহিনি-চিত্র ‘দূরত্ব’ (১৯৭৮) এবং মাঝে ‘নিম অন্নপূর্ণা’ (১৯৭৯) কে বাদ দিয়ে ‘গৃহযুদ্ধ’ (১৯৮২) এবং হিন্দিতে ‘আন্ধি গলি’ (১৯৮৪) এই  চিত্রত্রয়ী বা ট্রিলজি যে তর্কমুখরতার জন্ম দিয়েছিল, সামাজিক ও রাজনৈতিক আদর্শের অবক্ষয়কে চিহ্নিত করেছিল তা যেন আজকে আরও প্রাসঙ্গিক মনে হয়। এরমধ্যে গৃহযুদ্ধর একটা চলনসই, দূরত্বের একটা খারাপ এবং আন্ধি গলির একটা জঘন্য মানের প্রিন্ট ইউ টিউবে পাওয়া যায়। সেটাই মন্দের ভালো। আমরা তাই প্রয়াণলেখ হিসেবে এই চলচ্চিত্রত্রয়ী নিয়েই শুধু কিছু কথা বলব।
পরিচালক অশোক বিশ্বনাথন একবার বহরমপুরে এক ঘরোয়া আলাপচারিতায় বলেছিলেন, ‘‘বুদ্ধদেব পরে অনেক ছবি বানালেও প্রথম ছবি ‘দূরত্ব’ই তাঁর শ্রেষ্ঠ ছবি।’’ কথাটার সঙ্গে অনেকে একমত না-ও হতে পারেন কিন্তু দেখলে বোঝা যায় আজও একটা টাটকা নির্মাণের ছাপ এর সর্বাঙ্গে, যেন মেধা, শ্রম আর কল্পনাশক্তির পূর্ণ ব্যবহার করেই এই ছবির ফ্রেমগুলি তৈরি করা হয়েছে। এই ছবির নায়ক অধ্যাপক মন্দার বসু (প্রদীপ মুখার্জী) কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়াতে গিয়ে এঙ্গেলসের পরিবারপ্রথা, মাতৃত্ব আর পিতৃতন্ত্রের সম্পর্ক পড়ায় কিন্তু নিজের জীবনে তা প্রয়োগ করতে পারে না, নিজে একসময় বিপ্লবী মার্কসবাদী রাজনীতির অংশীদার হওয়া সত্ত্বেও। তাই অঞ্জলির সঙ্গে বিয়ের পরপরই তার বিচ্ছেদ হয়ে যায় কারণ অঞ্জলির গর্ভে অন্য কারও সন্তান ছিল বিয়ের আগেই। এই সন্তান এসেছিল পরিস্থিতির চাপে যাকে নষ্ট করতে চায়নি অঞ্জলি। অঞ্জলি আজকের নারীবাদী নায়িকা নয় যে, সে সিঙ্গল পেরেন্ট হয়ে উঠবে। তাই মন্দারের প্রেমে সাড়া দিয়ে সে তাকে বিয়ে করেছিল। সন্তানের একটা পিতৃপরিচয় চেয়েছিল সে। পাশাপাশি ভেবেছিল, মন্দার নিশ্চয় অন্যরকম মানুষ যে তাকে বুঝবে। না, মন্দার বোঝেনি। বিপ্লব, রাজনীতি ব্যক্তিজীবনে প্রয়োগ করতে পারেনি সে। এই দূরত্ব রয়েই গেছে। সামাজিক বিপ্লব না করতে পারার অক্ষমতা রাজনৈতিক বিপ্লব না করতে পারার অক্ষমতায় পরিণত হয়েছে।
ট্রিলজির দ্বিতীয় ছবি ‘গৃহযুদ্ধ’ তে মধ্যবিত্তের এই পলায়নপর স্বভাব, এই বিশ্বাসভঙ্গের প্রবণতার প্রতি আরও কঠোর সমালোচক বুদ্ধদেব। কিন্তু এই ছবির  থ্রিলারঘেঁষা আঙ্গিক চমকে দেবার মতো। ছবির প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত চারটি খুন আছে। খুনি কে আমরা শুধু আন্দাজ করতে পারি কিন্তু তা স্পষ্ট ভাবে দেখতে পাই না। বুঝতে পারি এর পিছনে আছে বৃহৎ কোম্পানির প্রত্যক্ষ হাত যাঁরা গণমাধ্যম, পুলিশ থেকে শুরু করে গোটা ব্যবস্থাটা চালায়। এদের হাতে খুন হয় শ্রমিকদের বিপ্লবী ইউনিয়নের প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন আদর্শবাদী স্টিলওয়েভ কোম্পানির লেবার অফিসার, ওই ইউনিয়নের সাহসী নেতা প্রবীর, প্রবীর ও লেবার অফিসারের মৃত্যু নিয়ে তদন্তরত সাংবাদিক সন্দীপন রায় (গৌতম ঘোষ) এবং কাজ ফুরিয়ে যাওয়ায় খুন হয় প্রবীরকে খুনের দলে যাঁরা ছিল সেই ভাড়াটে খুনিদের অন্যতম শীতল দাস (সুনীল মুখার্জী)। প্রবীরের সঙ্গী বিজন নন্দী, যে প্রবীরের বোন নিরুপমার প্রেমিকও বটে, প্রবীরের খুনের পর বোম্বে পালিয়ে যায়। যখন সে ফিরে আসে তখন সে এক পালটে যাওয়া মানুষ। প্রবীরের রাজনৈতিক আদর্শকে তার এখন ইলিউশন বলে মনে হয়। তার মনে হয় কিছুই পাল্টায় না তাই ব্যবস্থাটাকে পাল্টানোর চেষ্টা করাই বৃথা। সে এখন আত্মপ্রতিষ্ঠায় মন দিয়ে কলকাতায় একটা ফ্ল্যাট কিনতে সচেষ্ট। নিরুপমা রাজনীতির তত্ত্ব না বুঝলেও এই পাল্টে যাওয়া বিজনকে মেনে নিতে পারে না। সে বোঝে এই রাজনৈতিক বিস্মৃতি আসলে মানবিক মূল্যবোধের বিস্মৃতির পটভূমিকা মাত্র। বিজনকে নিরুপমা ফিরিয়ে দেয়।
ট্রিলজির তৃতীয় ছবি ‘আন্ধি গলি’ তে মূল চরিত্র হেমন্ত (কুলভূষণ খারবান্দা) অতীতে কলকাতায় বিপ্লবী রাজনীতিতে যুক্ত থাকলেও এখন বোম্বেতে থাকাকালীন সে কথা মনেই করতে চায় না। সম্ভবত এখানে কোনও বিশ্বাসঘাতকতা করে কোনও কমরেডকে ধরিয়ে দিয়েই সে পালিয়ে গিয়েছিল। জয়াকে (দীপ্তি নাভাল) বিয়ে করে সে সুখী হতে চায়। কিন্তু বোম্বেতে একটা ফ্ল্যাট কেনার জন্য টাকা জোগাড় করতে গিয়ে সে হন্যে হয়ে ওঠে। অবশেষে ইচ্ছের বিরুদ্ধে জয়াকে মডেলিংয়ের কাজে নামায়। ফ্ল্যাটের টাকা জোগাড় হয় বটে কিন্তু চুক্তিমাফিক ছোটো পোশাকে মডেলিং করার জন্য জয়ার ওপর চাপ আসে। জয়া রাজি হয় না। হেমন্ত তাকে জোরাজুরি করে, এমনকি শারীরিক ভাবে আঘাতও করে। উঁচু ব্যালকনি থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে জয়া আত্মহত্যা করে। গোটা ছবি জুড়েই উচ্চতা বনাম ভূমির এই দ্বন্দ্ব। ছবি জুড়ে অজস্র বার প্লেনের উড়ান দেখানো হয় (হেমন্তের উচ্চাকাঙ্খার মতোই তা গগনচারী)। মাটির আশ্রয়ে শুয়ে থাকে জয়া, যে ভাবে আগের একটি সিকোয়েন্সে মাটির নীচে স্থান পেয়েছিল তার গর্ভচ্যুত সন্তান। এই ট্রিলজি শেষ বিচারে বাঙালির রাজনৈতিক স্বপ্নভঙ্গের দলিল, তার বিশ্বাসভঙ্গের বেদনার্ত আখ্যান। সমসাময়িক রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে একে মিলিয়ে পড়তে তাই আমাদের কোনও অসুবিধা হয় না, আজও।

(ফিচার ছবি গুগল থেকে নেওয়া)