নিজস্ব প্রতিবেদন

চরের পলিতে হলদেটে বাঁশের আগায় পতপত করে ওড়ে তেরঙ্গা। তাকে ঘিরে চরের বাসিন্দারা মাথা নিচু করে প্রার্থনা করেন— ‘হে তেরঙ্গা, আমাদের স্বাধীনতা দাও।’ সে কথা কি কারও কানে যায়? স্বাধীনতার এত বছর পরেও সে কথা কি কারও কানে গিয়েছে?
চারপাশে বুনো ঘাস, আগাছাদের বাড়বাড়ন্ত উজিয়ে বাতাসে ভাসে বর্ষার গন্ধ। ঘোলাটে নদীর উপরে শামিয়ানার মতো ঝুলছে কুচকুচে কালো মেঘ। তার নীচে নিকোনো উঠোন আছে। পেটে খিদে আছে। বুকে ভালবাসা আছে। অন্তরাত্মায় ভয় আছে। প্রেম আছে। বিয়ে আছে। মেনে চলা শাসন আছে। আবশ্যিক অনুশাসন আছে। ভারী বুটের আওয়াজ আছে। ভাষা বুঝতে না পারার শাস্তি বেমক্কা চড়-থাপ্পড় আছে। কিন্তু স্বাধীন দেশে থেকেও স্বাধীনতা নেই!
নিজের গ্রাম থেকে যখন-তখন তাই বেরোনো যাবে না। ইচ্ছেমতো নদী পার হওয়া যাবে না। পরিচয়পত্র ভুলে যাওয়া যাবে না। এবং আরও অনেক না। তাই দরকার সচিত্র পরিচয়পত্র। আগে চলত ভোটার কার্ড, এখন হয়েছে আধার কার্ড। অথবা যে কোনও একটি। আগন্তুকের হাতে যে কার্ড দেখে মুর্শিদাবাদের উদয়নগর খণ্ড, চরপরাশপুর, কাকমারি, বামনাবাদ, মেঘনা, চর মেঘনা কিংবা নাসিরেরপাড়ার চাষিরা হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়েন, ‘‘ও কত্তা, এ কার্ড আপনি কোথায় রাখেন? আলমারির ভিতরে নাকি? এ তো এক্কেবারে নতুন গো!’’
ভোটার কিংবা আধার কার্ড চকচকে হলে যে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়, কে জানত! ওঁরা বলে চলেন, ‘‘আপনাদের কার্ড তো নতুন হবেই। আপনাদের তো আর কথায় কথায় কার্ড দেখাতে হয় না! কার্ড তো বের করেন খুব দরকারি কাজে। আর সেই ভোটের সময়। আর আমরা?’’ পাশ থেকে খেই ধরেন হাসমত শেখ, ‘‘আমাদের তো কার্ডই সব। রাতে এ কার্ড আমরা বালিশের তলায় রেখেই ঘুমোই। সকালে উঠে ওটাই তো সবার আগে দরকার।’’
চর মেঘনা গ্রামের জামাই বাবাজীবনেরাও জামাইষষ্ঠী বা অন্য কোনও কারণে শ্বশুরবাড়ি এলে সঙ্গে করে নিয়ে আসেন ভোটার কিংবা আধার কার্ড। জামাইকে আগেই ফোন করে মনে করিয়ে দেওয়া হয়, ‘‘আসার সময় ভোটার বা আধার কার্ডটা এনো বাবা!’’ তারপরে বিএসএফের কাছে নাম-ধাম-বাবার নাম, কতদিন শ্বশুরবাড়িতে থাকবেন সে সব লেখালিখির পালা সাঙ্গ হলে তবেই মেলে শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার অনুমতি!
প্রান্তবাসীরা জানাচ্ছেন, তাঁদের অবস্থা শাঁখের করাতের মতো। এক দিকে বিএসএফের সন্দেহ। অন্য দিকে ও পারের চোখরাঙানি। কাঁটাতারের ওপারে রয়েছে বিঘের পর বিঘে ভারতীয় জমি। রয়েছে ভারতীয় গ্রাম। বিএসএফের অনুমতি নিয়েই সেখানে যাতায়াত করতে হয়। এবং জমা রাখতে হয় পরিচয়পত্র। সেখানেও রয়েছে হরেক নিয়ম। কোথাও কার্ড রেখে যেতে হয় ক্যারিব্যাগের মধ্যে, কোথাও আবার দেখনদারি বাক্সে। যাতে ফিরে এসে সে কার্ড খুঁজে নিতে যাতে সমস্যা না হয়!
এ ভাবেই স্রেফ পরিচয় নয়, পরিচয়পত্র দেখিয়েই বয়ে চলে জীবন। বয়ে চলে মাথাভাঙা, জলঙ্গি কিংবা পদ্মা। আর চরাচর জুড়ে হার না মানা স্পর্ধা মুখের উপরে ছুড়ে দেয় অত্যন্ত সহজ এবং চেনা প্রশ্ন, ‘‘স্বাধীন দেশে থেকেও আমাদের স্বাধীনতা কবে আসবে?’’

অঙ্কন— অর্কজ্যোতি প্রামাণিক