অনল আবেদিন

লালবাগ শহরের মতিঝিল এলাকার বাড়ি থেকে লালগোলায় তাঁর কর্মক্ষেত্রে আসা-যাওয়া মিলে মোট দূরত্ব ৭৬ কিলোমিটার। কর্মক্ষেত্র বলতে একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের লালগোলা শাখা অফিস। তিনি ছিলেন সেখানকার নিরাপত্তারক্ষী। প্রায় তিন দশক আগে প্রতিদিন এই ৭৬ কিলোমিটার পথ তিনি পাড়ি দিতেন সাইকেল চালিয়ে। বছর পঞ্চাশের ওই ‘তরুণ’ আসলে ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত জওয়ান। আব্দুর রৌফ খান। লোকে তাঁকে এ আর খান নামে চেনেন। ব্যাঙ্কের এই নিরাপত্তারক্ষীর দৈনিক সাইকেল চালিয়ে কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার সুবাদে ২৭ বছর আগে জন্ম নেয় আজিমগঞ্জের কাছে ভাগীরথী নদীর উপর রেলসেতু নির্মাণ করে পূর্বরেলের হাওড়া ও শিয়ালদহ বিভাগের সংযুক্ত করার ‘অলীক স্বপ্ন’। যা আজ আর স্বপ্ন নয়। জলজ্যান্ত বাস্তব।
তিনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে হাজারদুয়ারি ও ইমামবাড়াকে বাঁ হাতে রেখে জিয়াগঞ্জ-আজিমগঞ্জ পুরসভার ফুলতলা মোড় হয়ে বাগডহরায় বহরমপুর-লালগোলা রাজ্য সড়ক ধরতেন। এই রুট মাহাত্ম্যের গুণে জিয়াগঞ্জ শ্মশানের কাছে নদীগর্ভে দু’টি ভগ্নপ্রায় পিলারের মাথাটুকু দেখতে পান, ওই সাইকেল আরোহী। সেখান থেকেই তাঁর মাথায় সৃষ্টির পোকা নড়ে উঠে। তিনি প্রাচীন মানচিত্র হাতড়াতে থাকেন। অবশেষে ১৯৯৪ সালের কোনও একদিন তিনি ‘ইউরেকা’ বলে উঠেন। জানতে পারেন, নদীর বুকে পরিত্যক্ত ওই পিলার দু’টি আসলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রয়োজনে নির্মীত রেলসেতুর অংশবিশেষ। রেলের মানচিত্র ও প্রাচীন নথি থেকে এ আর খান এই ইতিহাস উদ্ধার করেন। জেলের মাছ ধরার ডিঙিতে চেপে তিনি পিলার দু’টির ও নদীর দু’পাড়ের দূরত্ব নির্ণয় করেন।
বুঝতে পারেন, এখানে রেলসেতু নির্মাণ করে পূর্বরেলের হাওড়া ও শিয়ালদহ বিভাগের সংযোগ ঘটালে নদিয়া ও মুর্শিদাবাদ জেলার অর্থনৈতিক কাঠামো-সহ নানা দিকের উন্নতি ঘটবে। রেলের দু’টি পথের সংযুক্তির ফলে বিপর্যয়কালীন সময়ে একটি পথের ট্রেন দ্বিতীয় রেলপথ দিয়ে চলতে পারবে। দু’টি রেলপথের সংযুক্তির ফলে আপৎকালীন সময়ের এই বিকল্প পথের সুযোগ ছাড়াও দিল্লি ও উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে কলকাতা, নদিয়া ও মুর্শিদাবাদের দূরত্ব বেশ কিছুটা কমে যাবে। লালবাগের রৌশনবাগে বিএসএফের স্থায়ী ছাউনি থাকায় উত্তর-পূর্ব ভারতে জওয়ানদের স্থানান্তরের সুবিধা বাড়বে দু’টি রেলপথের সংযোগের ফলে। এই রকম নানা ভাবনার উদ্ভাবনী পোকা ‘মামুলি’ নিরাপত্তারক্ষীর মাথায় নড়ে উঠলে কী হবে? তিনি তো আর রাজনৈতিক ব্যক্তি নন! ফলে গণ্যমান্যদের কাছে পাত্তা না-পাওয়া, এমনকি সাংবাদিককুলের কাছেও গুরুত্ব না-পাওয়া মানুষটি ভাগীরথীর উপর আজিমগঞ্জ-নশিপুর রেলসেতু নির্মাণ ও নদীর দু’পাড় দিয়ে বয়ে চলা রেলের দু’টি বিভাগের সংযুক্তির জন্য ‘মুর্শিদাবাদ রেলওয়ে প্যাসেঞ্জারস অ্যাসোসিয়েশন’ গড়ে আন্দোলন শুরু করেন।
আন্দোলনের শুরুর দিকে এই ‘ওয়ান ম্যান আর্মি’র রেলসেতুর স্বপ্ন গণ্যিমান্যিরা ‘পাগলের প্রলাপ’ ও ‘আকাশকুসুম স্বপ্ন’ বলে দাগিয়ে দেন। এ আর খান কিন্তু স্বপ্নপূরণে নাছোড়বান্দা। এই স্বপ্নপূরণের জন্য রেলের প্রায় প্রতিটি স্তরে নিয়মিত লিখিত আবেদন নিবেদন করা ছাড়াও সাইকেলের ক্যারিয়ারে মেয়েকে বসিয়ে লালবাগ থেকে বহরমপুরে এসে জেলাশাসকের কাছে নিয়মিত দরবার করতেন। হাফ ডজন রেলবোর্ড ও হাফ ডজন রেলমন্ত্রীর কাছেও স্মারকলিপি জমা  দিয়েছেন অনেকবার। ইতিমধ্যে এই ‘ওয়ানম্যান আর্মি’ গুরুত্বপূর্ণ দু’টি কাজে সাফল্য অর্জন করার সুবাদে গণভিত্তি পেতে শুরু করেন। কয়েক বছর ধরে রেলের শিয়ালদহ বিভাগের লালগোলা থেকে দেবগ্রাম পর্যন্ত ৮৭ কিলোমিটার রেলপথে ২৮টি মৃত্যুফাঁদ (রেলের ভাষায় কসান) থাকায় দুর্ঘটনার সমুহ আশঙ্কা নিয়েই গন্তব্যে ট্রেন পৌঁছত ৩-৪ ঘণ্টা দেরিতে। খান সাহেবের রেলযাত্রী সমিতির দাবি মেনে নিয়ে ১৯৯৮ সালে রেল কর্তৃপক্ষ ২৮টি মৃত্যুফাঁদ মেরামত করে রেলপথ সুগম ও সুরক্ষিত করেন।
দ্বিতীয় কাজটি তারও সাত বছর আগের। ঘসেটি বেগমের স্বামী নবাব নওয়াজেস মহম্মদ খাঁ ১৭৫০ খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ করেন মতিঝিল মসজিদ ও লাগোয়া ‘ফুরানিয়া দারুল উলম মাদ্রাসা’। তিন গম্বুজ বিশিষ্ট ওই ঐতিহাসিক মসজিদের সামনেই রয়েছে নবাব নওয়াজেস মহম্মদ খাঁ, তাঁর সেনাপতি সামসের আলি খাঁ, নবাব সিরাজ-উদ-দৌলাহের ছোট ভাই একরাম-উদ-দৌলাহ, তাঁর ধাত্রীমা ও গৃহশিক্ষকের সমাধি। ‘মতিঝিল মসজিদ কমিটি’র সম্পাদক এ আর খানের উদ্যোগে ১৯৯১ সালে সরকারি অনুদানে মসজিদটির আংশিক সংস্কার করা হয়। পরবর্তীতে তাঁর দাবি মেনে মসজিদ ও সমাধিক্ষেত্রটি ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ বিভাগ অধিগ্রহণ করে। তাঁর এই রকম বিভিন্ন উন্নয়নমূলক উদ্যোগের সাফল্যের ফলে অনেক সংস্থা ‘মুর্শিদাবাদ রেলওয়ে প্যাসেঞ্জারস অ্যাসোসিয়েশন’- এর রেলসেতু নির্মাণ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়। তাদের মধ্যে অগ্রগণ্য সংস্থা হল স্বপনকুমার ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে ‘মুর্শিদাবাদ জেলা চেম্বার অব কমার্স’ ও অরুণকুমার সাহার নেতৃত্বে ‘জিয়াগঞ্জ-আজিমগঞ্জ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমিতি’। তার ফলে রেল অবরোধ, উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কাছে স্মারকলিপি প্রদান, অবস্থান বিক্ষোভ ও পথসভার মতো নানা তরিকার আন্দোলনের বান ডাকে। এমনকি কলকাতার পিজি হাসপাতালে অসুস্থ স্ত্রীকে শয্যাশায়ী রেখে রেলসেতু নির্মাণের সুপারিশ করতে রেলভবনে পৌঁছে যান খান সাহেব।
এখানে অবশ্য কিছুটা ভিন্নভাষ্য রয়েছে স্বপনকুমার ভট্টাচার্যের। তাঁর দাবি, “ওখানে রেলসেতুর পুনর্নিমাণের দাবিতে গত শতাব্দীর সত্তরের দশকে আন্দোলন শুরু হয় অধুনাবিলুপ্ত বহরমপুরের সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘গণকণ্ঠ’-এর সম্পাদক প্রাণরঞ্জন চৌধুরী ও তাঁর সহযোগী প্রতিভারঞ্জন মৈত্রের নেতৃত্বে। পরে নানা কারণে সেই আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়ে। ১৯৯৬ সালে স্তিমিত আন্দোলনের ব্যাটনটি এ আর খানের হাতে তুলে দেওয়া হয়।” বিতর্ক যা-ই থাকুক, ভাগীরথীর বুকে এই রেলসেতু নির্মাণের আন্দোলন ১৯৯৯ সালে ‘কুলীন’ মর্যাদা অর্জন করে। এই বছর বহরমপুর জজকোর্ট মাঠের বিশাল সমাবেশে আজিমগঞ্জ-নসিপুর রেলসেতু নির্মাণ আন্দোলনের ‘পথিকৃৎ’এ আর খানকে নাগরিক সংবর্ধনা দেন সাংসদ অধীর চৌধুরী। তার দু’বছর পরে ২০০১ সালে ওই রেলসেতু নির্মাণের অনুমোদন দেন রেলমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ না হওয়ায় নির্মাণ কাজ তখনও শুরু হয়নি। অবশেষে ২০০৪ সালে রেলমন্ত্রী লালুপ্রসাদ যাদব অর্থ বরাদ্দ করেন। জিয়াগঞ্জ শ্মশানের কাছে ওই বছরের ৩০ ডিসেম্বর ম্যারাপ বেঁধে সাধের রেলসেতুর শিলান্যাস করেন রেলমন্ত্রী লালুপ্রসাদ যাদব, পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায়, দুই সাংসদ অধীর চৌধুরী ও মান্নান হোসেন। প্রস্তাবিত ওই রেলসেতু তিন বছরের মধ্যে নির্মাণ করে ট্রেন চালানো হবে বলে অনুষ্ঠান থেকে দুই কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ঘোষণা করলেও ১৭ বছরেও প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি।
বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মদতে পুষ্ট জমিজটের কারণে সেতু নির্মাণের এই শম্বুক গতি। সেতু ও সেতুর সংযোগকারী নদীর দুই পাড়ের রেললাইনের শতকরা ৯৫ ভাগ নির্মাণ কাজ সম্পূর্ণ হয়ে গিয়েছে বছর দশেক আগে। এ বার ১০৫ জন জমিমালিকের চাকরির দাবিতে অবশিষ্ট ৫ ভাগ কাজ আটকে আছে বছর দশেক থেকে। রেলের প্রতিমন্ত্রী থাকালীন ২০১৪ সালে অধীর চৌধুরী আজিমগঞ্জে গিয়ে জমি মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করে চাকরি সংক্রান্ত বিষয়ের নীতিগত সমস্যার সমাধান করেন। কিন্তু তারপরেও তাঁরা চাকরি না পাওয়ায় অবশিষ্ট ৫ শতাংশ নির্মাণ কাজ আটকে থাকায় এ আর খানের স্বপ্ন আজও পূরণ হয়নি। গত ১ জুলাই ৭৬ বছর বয়সে তিনি প্রয়াত হন। মৃত্যুর মাস দেড়েক আগেও রেল কর্তাদের চিঠি দিয়ে সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন, দারিদ্রের কারণে হাইস্কুলের চৌকাঠ অতিক্রম করতে না-পারা খান সাহেব। প্রয়াত স্বপ্নস্রষ্টার প্রতি শ্রদ্ধা ও পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানাতে খান সাহেবের বাড়ি গিয়েছিলেন মুর্শিদাবাদ (লালবাগ) পুরসভার প্রশাসক তৃণমূলের বিপ্লব চক্রবর্তী, স্থানীয় বিধায়ক বিজেপির গৌরীশঙ্কর ঘোষ ও কংগ্রসের সাংসদ অধীর চৌধুরী দিল্লিতে থাকায় তাঁর প্রতিনিধি হিসাবে প্রাক্তন বিধায়ক মনোজ চক্রবর্তী। গত ৫ জুলাই দিল্লি থেকে ফিরে এসে অধীর চৌধুরী নিজেও মতিঝিলের বাড়ি গিয়েছিলেন।
ওই রাজনীতিকরা সবাই প্রয়াত স্বপ্নস্রষ্টার বাড়িতে বসে ‘মুর্শিদাবাদ (লালবাগ) নগরোন্নয়ন কমিটি’র অজাতশত্রু সম্পাদক এ আর খানের স্বপ্নপূরণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। রেলসেতু ছাড়াও তিনি আরও দু’টি সঙ্গত স্বপ্ন দেখতেন। লালবাগে মতিঝিলের কাছে ভাগীরথীর উপর সেতু নির্মাণ করে বিচ্ছিন্ন নবগ্রাম থানাকে লালবাগ মহকুমা শহরের সঙ্গে সংযুক্ত করা ও অন্যটি নবাবি শহর লালবাগে মহিলা কলেজ প্রতিষ্ঠা করা। মৃতের সামনে কেবল প্রতিশ্রুতি বিতরণই নয়, বিভিন্ন রঙের রাজনীতিকরা সম্মিলীত ভাবে এই তিনটি স্বপ্নপূরণ করলেই খান সাহেবের প্রতি যথার্থ শ্রদ্ধা জানানো হবে। নইলে মৃতের বাড়িতে, মৃতের শিয়রে দাঁড়িয়ে বিলি করা প্রতিশ্রুতিটাই হয়ে যাবে অশ্রদ্ধার নামান্তর।
(সৌজন্যে পুবের কলম)