অঙ্কন রায়

ছোটবেলার একটা দৃশ্য হঠাৎ মনে পড়ে গেল।

এমনই এক সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়ে আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে একদল অল্পবয়সী ছেলে একটা সাইকেলের কেরিয়ারে কাগজে মুখ ঢাকা এক মাটির প্রতিমা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে আর জোরে জোরে চেঁচাচ্ছে, ‘বোলো বিষকর্মা মাঈ কি… জয়!!’

আমি উঠোনে প্লাস্টিকের ক্রিকেট ব্যাট আর বল নিয়ে ছোটাছুটি করতে করতে দৌড়ে গেলাম গেটের কাছে। তারপরে ওদের ব্যাপার-স্যাপার বুঝতে না পেরে ফিরে এসে বারান্দায় বসে থাকা বাবাকে শুধোলাম, ‘বাবা, বাবা! ওরা কী ঠাকুর নিয়ে গেল?’

বাবা হাতের খবরের কাগজটা একরাশ বিরক্তি সহযোগে একপাশে সরিয়ে রেখে স্বগতোক্তির মতো করে বললেন, ‘বিষ, বিষ। এই সব ছোঁড়াগুলো এক একটা বিষ। ঠিক করে নামের উচ্চারণ করতে পারে না, তার উপর বাবাকেও মা বানিয়ে ছাড়ে।’

তারপরে আমায় বললেন, ‘কাল বিশ্বকর্মা পুজো বাবু। তাই ওরা প্রতিমা নিয়ে মণ্ডপে চলল।’

বিশ্বকর্মা! তিনি তো পুরুষ দেবতা। তা হলে ছেলেগুলো ‘মাঈ কি জয়’ বলতে বলতে গেল কেন? যাই হোক, সেই রহস্যের কুল কিনারা পাব না মনে করেই ওদিক আর মাড়াইনি খুব বেশি।

ছবি- আবু রায়হান শেখ

আসলে হয়েছে কী, বাবা বিশ্বকর্মা শুনেছি জগতের যাবতীয় মেশিনপত্রের দেবতা। তাই এই দেবতার সঙ্গে আমরা মানে মধ্যবিত্ত চাকুরিজীবী পরিবারের স্কুলপড়ুয়া ছোটরা খুব একটা সংযুক্ত হতে পারিনি কখনওই।

প্রবাসী বাঙালি আমি। আকৈশোর বাস উত্তর বিহারের পূর্ণিয়া জেলায়। বাবা-ঠাকুর্দারও জন্ম ওখানেই। সুতরাং ওই বিশেষ দিনটিতে বাংলার ঘুড়ি ওড়ানোর উন্মাদনা আমরা টের পাইনি। কারণ, এমন রেওয়াজ ওই অঞ্চলে কখনও দেখিনি বিশ্বকর্মা পুজোর দিন।

বরং দেখেছি, বিভিন্ন গ্যারাজের মালিক, রিকশাওয়ালা কাকুরা বা আটা, তেলের মিল মালিকেরা এই বিশ্বকর্মাপুজোর দিনটা উদযাপন করেন ঘটা করে। ঘটার বহিঃপ্রকাশ ঘটে চোঙ লাগানো মাইকে উৎকট বাজনা সহযোগে হিন্দি সিনেমার সেই সময়কার ‘সাম্প্রতিক’ জগঝম্প মার্কা গানে।

এ সব গান কানে তালা ধরিয়ে দেওয়ার পক্ষে ঘণ্টাখানেক লাগাতার চালালেই যথেষ্ট, আর সেদিন তো সারাদিন-সারারাত চলত এই কর্ণপীড়ার আয়োজন৷

অসুখকর সেই বিশেষ দিনটি হঠাৎই অভিনব ভাবে এক প্রিয় দিনে পর্যবসিত হল আমার জীবনে, যখন আমি শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতীর ছাত্র হয়ে এলাম।

এখানে এসে জানলাম, হিন্দু ধর্মের এক একটি পুজো বা পার্বণের দিনগুলোতে কীভাবে নতুন ভাবনার মোড়ক লাগিয়ে নিরাকারবাদীরা শিল্পসম্মত এক একটি নতুন পার্বণ তৈরি করেছেন, যেখানে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি রুচিশীল মানুষ একত্র হয়ে দিনটি উদযাপন করেন।

এমনই একটি শিল্পিত দিনের কথা জানলাম যার নাম ‘শিল্পোৎসব’। দিনটি বিশ্বকর্মা পুজোর দিনেই শান্তিনিকেতন সংলগ্ন শ্রীনিকেতনে উদযাপিত হয়।

শ্রীনিকেতনে ‘শিল্পোৎসব’ আরম্ভের ইতিহাস অবশ্য রবীন্দ্রনাথের জীবনাবসানের পরে। জানতে পারি, ১৯৪৪ সালে বিশ্বকর্মা পুজোর দিনেই এই উৎসব শুরু হয়।

তার আগে গ্রামকেন্দ্রিক শিল্পসম্ভার প্রস্তুতকারক ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র শ্রীনিকেতনে ধর্মীয় ভাবাবেগ মেনে বিশ্বকর্মা পুজো হত ঘট প্রতিষ্ঠা করে এবং সুরুল গ্রামের ব্রাহ্মণ পুরোহিত আনিয়েই। ১৯৪২ সালের একটি ঘটনা সেই অবস্থানের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

সে বার জয়পাল মেহেতা নামে একটি ছাত্র চামড়ার জুতো সেলাই করে সেটি শিল্পকর্ম হিসেবেই রেখেছিলেন ঘটের পাশে। পুরোহিত এ সব দেখে রাগ করে পুজো না করেই ফিরে যান এবং আচার্য নন্দলাল বসু এই শিল্পকর্মকে সম্মান জানাতে পুরোহিতকে ফিরিয়ে না এনে জয়পালকে দিয়েই সেবার ঘটপুজো করান। সেই আয়োজনের সঙ্গে ছিল অন্য ছাত্রছাত্রীদের গাওয়া রবীন্দ্রসঙ্গীত।

১৯৪৩ সালে শিল্পী সুশীল ভঞ্জ সেতার বাজিয়ে পুজো করেন। চুয়াল্লিশে নতুন নামকরণ নিয়ে নতুন এক উৎসবের প্রচলন ঘটে। তারই নাম, ‘শিল্পোৎসব’।

এখন আমাদের মনের কাছাকাছি বসবাস করেন বাবা বিশ্বকর্মা। নতুন আঙ্গিকে, নতুন চিন্তায় জারিত হয়ে যখন গুরুদেব রবীন্দ্রনাথের কথায় সুরে ছেলেমেয়েদের শেখাতে বসি ‘নমো যন্ত্র নমো যন্ত্র’ বা ‘যিনি সকল কাজের কাজি’ অথবা ‘কঠিন লোহা কঠিন ঘুমে ছিল অচেতন’, তখন আমি সাকার অথবা নিরাকারের তকমাধারী উপাসকের ঊর্ধ্বে আরও বৃহত্তর কোনও এক অচিন জগতে ভালবাসার বাবা বিশ্বকর্মার সঙ্গে ভালবাসায় ঘর করি।