সুদীপ জোয়ারদার

—‘স্যর ৫৫৩।’
—‘ইস, একটুর জন্য ৮০ শতাংশ হল না! তবে যা হয়েছে সেটাও মন্দ নয়। কিন্তু তোর গলায় তো আনন্দ নেই একফোঁটাও। কী ব্যাপার?’ শুধোই সুমনকে।
—‘স্যর পরীক্ষা হলে মার্কস বেশি কম কী হত জানা নেই। তবে চারদিকে লোকে যা-তা বলছে!’
—‘কী যা-তা?’
—‘আমাদের দেখলেই বলছে, ‘করোনায় নম্বর ‘লুঠে লিলে!’
স্কুলটা গ্রামের দিকে। ওখানে কোনও আত্মসাতের ঘটনায় ‘লুঠে লিলে’র ব্যবহার খুব ‘কমন’ ব্যাপার।  তবে এতদিন ওটা মূলত অর্থ আত্মসাৎ প্রসঙ্গে শুনেছি। নম্বর প্রসঙ্গে এই প্রথম।
সুমনের কথা শুনে হাসতে গিয়েও হাসি না। সোশ্যাল মিডিয়ায়, সকাল থেকেই দেখছি এ বার মাধ্যমিকে একশো শতাংশ পাশ, নব্বই শতাংশ প্রথম বিভাগ আর ৭৯ জন প্রথম হওয়া নিয়ে একের পর এক রঙ্গ রসিকতা। লক্ষ্য সরকার, লক্ষ্য শিক্ষার্থীরা। কোনও কোনও ‘গভীর চিন্তক’ জানাচ্ছেন, ভালদের মেধার কোনও দাম রইল না। পড়ে এবং না পড়ে একই ফলাফল।
আমরা যাঁরা মাধ্যমিক পেরিয়ে এসেছি অনেকদিন, তাঁরা জানি মাধ্যমিকের ফলাফল দিয়ে জীবনে কিছুই হয় না। মাধ্যমিকের ফলাফল কেবল যারা নিজের স্কুল ছেড়ে অন্য কোনও নামী শিক্ষালয়ে ভর্তি হতে চায়, তাদের ক্ষেত্রে কিছুটা কাজে লাগে। কিছুটা, কিন্তু পুরোটা নয়। কারণ অনেক জায়গাতেই আলাদা পরীক্ষা নেওয়া হয়, ভর্তির জন্য।
যে সব নামী শিক্ষালয় উচ্চ মাধ্যমিকে অন্য স্কুলের ছাত্র ভর্তির ক্ষেত্রে নম্বরকে গুরুত্ব দিয়ে থাকে, সেখানে সত্যিকারের ভালরা এ বার উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি হতে পারবে কি পারবে না এই দুশ্চিন্তায় ভোগাটাও অমূলক। ফাঁকি দিয়ে যে এই মাধ্যমিকে প্রচুর নম্বর পেয়ে গেল, সে এবং তার অভিভাবক নম্বরের পিছনের মিথ্যেটা জানে। জানে এই মিথ্যে নিয়ে ওইসব জায়গায় পড়তে যাওয়ার ঝুঁকিটাও। আর করোনা কতদিনে যাবে কেউ বলতে পারে না। এই অবস্থায় ঠাঁইনাড়া হয়ে দূরের কোনও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেতে  চাইবে কতজন মেধাবী সেটাও বলার বিষয়।
মেধার দাম রইল না কথাটা কতটা সঠিক সেটাও বিচারের অপেক্ষা রাখে। এ বারের মাধ্যমিকের ফলাফল, নবম শ্রেণির মূল্যায়ন ও দশম শ্রেণির প্রজেক্ট এই দুইয়ের নম্বরের উপর করা হয়েছে। এটা ঠিক এখন যেহেতু দশমের সিলেবাসে মাধ্যমিক, অনেক শিক্ষার্থী নবম শ্রেণির পড়াশোনা, পরীক্ষাকে গুরুত্ব দেয় না। নবম থেকেই শুরু করে দেয় মাধ্যমিকের প্রস্তুতি। কিন্তু এ তো মেধাবীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তা হলে?  এ বারের মাধ্যমিকের মূল্যায়ন পদ্ধতি ঘোষণার পরে নবমের ফলে যদি কোথাও কিছু ‘ম্যানুপুলেশন’ও হয়ে থাকে তবে সেটা নিশ্চয়ই সার্বিক নয়। তাছাড়া গরমিলের দরজা সাধারণ অবস্থাতেও তো কোনওদিন বোর্ডের পরীক্ষার মূল্যায়নকে সার্বিক হতে দেয়নি। ‘ইনভিজেলেশন’এ কোথাও চূড়ান্ত কড়াকড়ি কোথাও চরম ঢিলেমি, পরীক্ষকের সঙ্গে পরীক্ষকের মূল্যায়নের তারতম্য ভাল খারাপের তফাৎকে কবেই বা সঠিক  মাত্রায় তুলে ধরেছে! প্রদীপের তলাটা কোনওদিনই কিন্তু আলোকিত ছিল না।
ফাঁকি দিয়ে নিম্নমেধার কেউ ঘাড়ে চলে এল বা টপকে চলে গেল, এই নিয়ে লেখাপড়ায় ভালদের মনখারাপের কোনও মানে নেই। কারণ, শেষ বিচারে নম্বর নয়, কথা বলবে মেধাই। অনেকেই বলছেন, ‘‘পরীক্ষা কি নেওয়া যেত না, অন্তত নিজের স্কুলেও?’’ সিবিএসই, আইসিএসই-ও এ বার কিন্তু পরীক্ষা নেয়নি। সেখানে এত শোরগোল তো নেই! মধ্যশিক্ষা পর্ষদ সর্বভারতীয় বোর্ডগুলোর দেখানো পথে না হেঁটে যদি উল্টোপথে হাঁটত তখন করোনা সংক্রমণের কোনও ঘটনা ঘটে গেলে আবার বেসুরো গাইতে এই ‘অনেকে’দের কিন্তু দেরি হত না। আর নিজের স্কুলে, বিধি মেনে পরীক্ষা নেওয়া সর্বত্র কতটা সম্ভব তা আমরা যাঁরা গ্রামের স্কুলগুলোতে শিক্ষকতা করি তাঁরা ভালই জানি। মূল্যায়নের জন্য সরকারকে একটা রাস্তা নিতেই হত। এই মূল্যায়নের জন্য হাতের কাছে নবম শ্রেণির ফল আর দশম শ্রেণির প্রজেক্ট ছাড়া আর কিছুই ছিল না। এতে একশো শতাংশ পাশ তো করারই কথা। কাজেই এ বারের মাধ্যমিকের ফলাফলের সমালোচনা করার আগে এ সবগুলোও যেন আমরা ভাবি।
জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষা ঘিরে কত ভাবনা, কত আশঙ্কা থাকে। সেই বড় পরীক্ষা যে এমন ডামাডোলে পরিণত হবে কোনও শিক্ষার্থীই ভাবতে পারেনি। জীবনের প্রথম পরীক্ষার ফল যে এমন রঙ্গ-রসিকতার সম্মুখীন হবে সেটা তো আরওই অপ্রত্যাশিত ছিল। এই ফল নিয়ে ওরা সকলেই চিন্তিত। জীবনের প্রথম মার্কশিট ফাইলবন্দি হবে প্রাপ্তির আনন্দ বা অপ্রাপ্তির বেদনা নিয়ে ততটা নয়, যতটা ব্যঙ্গ-কৌতুক গায়ে মেখে। অথচ সন্তানসম এই শিক্ষার্থীদের করার কিছুই ছিল না। তারা পরিস্থিতির শিকার। তবে এক্ষেত্রে এত জাঁক করে কতজন প্রথম, কতজন প্রথম বিভাগ ইত্যাদি ঘোষণা বোর্ডের তরফে না করলেও চলত। এতে শিক্ষার্থীদের নিয়ে ব্যঙ্গ-কৌতুক কিছুটা হয়তো কম হত।
(ফিচার ছবি গুগল থেকে নেওয়া।মতামত লেখকের ব্যক্তিগত)