সুদীপ জোয়ারদার

একসময় পানিপথে বেশ কয়েকবার যেতে হয়েছিল বিশেষ কাজে। একবার দিন দশেক ছিলামও ওখানে। তখন ঘুরে ঘুরে দেখেছিলাম, পানিপথ ও সংলগ্ন জায়গাগুলো। ফিরে এসে এক জনপ্রিয় দৈনিকে পানিপথ ভ্রমণ  নিয়ে একটা লেখাও লিখেছিলাম। ভাবতে ভাল লাগছে, অলিম্পিকে জ্যাভলিনে সোনা জয়ী নীরজ চোপড়া সেই পানিপথের ছেলে।
নীরজের সোনা জয় কিন্তু কিছুটা প্রত্যাশিতই ছিল। কারণ এর আগে ২০১৮ সালের এশিয়ান গেমসে জ্যাভলিনে সোনা জিতেছিলেন ৮৮.০৬ মিটার ছুড়ে যা অলিম্পিক রেকর্ডের খুব কাছেই। আর নীরজ মানেই বারে বারে নিজেকে ছাপিয়ে যাওয়ার কাহিনি। নিজের গড়া রেকর্ডও তো নিজেই ভেঙেছেন। সুতরাং নীরজ তো বটেই তাঁর কাছের জনেরা ভালো কিছুর প্রত্যাশাতেই ছিলেন। তাঁকে নিয়ে তবু মিডিয়ার চাঞ্চল্য নজরে পড়েনি। কেন? এই প্রশ্নটার উত্তর আমাদের অজানা নয়। এ দেশে সব খেলা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসার সুযোগ পায় না। মাত্র কয়েকটা দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ক্রিকেটের সাফল্য নিয়ে যে পরিমাণ আলোচনা, হুল্লোড় হয় তার ছিটেফোঁটাও অন্য খেলা নিয়ে হয় না।
অন্য খেলায় চমকে দেওয়া সাফল্য যখন হাজির হয় তখনই কেবল সেই সাফল্য নিয়ে কিছুদিন তোলপাড় হয়। জ্যাভলিন কী, কে নীরজ চোপড়া, সোনা আসার আগে খুব বেশিজন জানতেন বলে মনে হয় না। অথচ নীরজ চোপড়ার কেরিয়ার আগাগোড়া সোনা দিয়েই মোড়া। আক্ষরিক অর্থেই তিনি সোনার ছেলে। আর এ বার অলিম্পিকে তিনি যা করে দেখালেন, সে তো ইতিহাস। আমাদের ক্রীড়া আলোচনার অনেকটা পরিসর তাঁর আগেই প্রাপ্য ছিল নিঃসন্দেহে। দিতে পারিনি সেটা আমাদের দুর্ভাগ্য।
নীরজ কৃষক পরিবারের সন্তান। পানিপথ থেকে ১৬ কিলোমিটার দূরের এক গ্রাম খান্ডরা তাঁর জন্মভূমি। খুব বড় গ্রাম নয় খান্ডরা। ৩৯২টি পরিবারের বাস। সেখানেই সতেরো সদস্যের পরিবার নীরজদের। হরিয়ানার গ্রামের দিকে গেলে চারদিকে ফসলের ঘ্রাণ, জায়গায় জায়গায় জৈব সারের সেই প্রাচীন গন্ধ, বিলুপ্তপ্রায় ধানের গোলা— সব মিলিয়ে চোখ আরাম পায়, মন প্রশান্ত হয়। জীবনানন্দ আপনিই চলে আসে আমাদের স্বরযন্ত্রে। সোনা জয়ের পরে দেশের তেরঙা জড়িয়ে নীরজ যখন ছুটছিলেন মাঠ দিয়ে, মনে হচ্ছিল শুধু অগণিত ভারতবাসীই জয়ের আনন্দে ওঁর সঙ্গে দৌড়চ্ছে না, দৌড়ে যাচ্ছে ফসলের গন্ধ মাখা খান্ডরার মাঠ-প্রান্তরও!
১৩৫ কোটির এই দেশে অলিম্পিকে একটা সোনা এখনও খুব মহার্ঘ এক ব্যাপার। কারণ ক্রীড়া-বিশ্বে   আমাদের অবস্থান খুব নীচের দিকে। কেন নীচের দিকে, কী করলে উপরে আসা যাবে তা এখন আর কোনও গবেষণার বিষয় নয়। একটা বাচ্চা ছেলেও খেলাধুলো সম্পর্কিত রচনা লিখতে গেলে এইসব বিষয় অনায়াসে লিখে দেয়। কিন্তু  অন্য সব ব্যাপারের মতোই এখানেও জগদ্দল পাথরের মতো চেপে রয়েছে ‘কর্তার ভূত।’ সে ভূত তাড়ানো রাজনীতিসর্বস্ব এই দেশের পক্ষে সহজ কাজ নয়।
আমরা আমজনতা তাই একটা সোনাজয় ঘিরে সঙ্গত কারণেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ি। অলিম্পিকে একটা  সোনা জয় এমনিতেই কঠিন ব্যাপার, তার উপর অ্যাথেলিটিক্সে সোনা জয়। এর আগে অ্যাথেলিটিক্সে পদকের খুব কাছাকাছি গিয়েও সফল হতে পারেননি মিলখা সিং, পিটি ঊষা। এ বারে প্রত্যাশাপূরণ করলেন নীরজ। ব্রোঞ্জ বা রূপো দিয়ে নয়, একবাবের সোনা জিতে। এই দেশের ক্রীড়াবিদদের যেখানে লড়তে হয় শুধু শারীরিক দক্ষতা অর্জন, ক্রীড়ানৈপুণ্য বৃদ্ধির জন্য নয়, লড়তে হয় দারিদ্র, রাজনীতি-সহ অন্যান্য নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির বিরুদ্ধেও। সেখানে এই জয় নিঃসন্দেহে এক বিরাট ব্যাপার।
এত বড় জয়ের পরে সারা দেশের আগ্রহ নীরজকে ঘিরে থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু একশো বছরের মধ্যে অ্যাথেলেটিক্সে প্রথম সোনা বিজয়ীকে গড়পড়তা যুবকদের ছাঁচে ফেলে অহরহ গার্লফ্রেন্ড আছে কিনা প্রশ্নে জেরবার করে দেওয়া একটু অতিরিক্তই মনে হচ্ছে। অলিম্পিকে এত বড় সাফল্য পেতে গেলে যে সেটাকেই পাখির চোখ করে এগোতে হয়, অন্য কোনও দিকে দৃষ্টি দেওয়া যায় না সেটা অন্তত কপিলদেবের বোঝা উচিত ছিল।
মনে আছে, ১৯৮৩ সালে ভারতীয় ক্রিকেট দল যেদিন প্রুডেনশিয়াল বিশ্বকাপের ফাইনাল জেতে, আকাশবাণীর সংবাদ পরিক্রমায় প্রণবেশ সেন লিখেছিলেন, ‘‘এমন একটা দিনে আকাশকে বেশি নীল লাগে, সবাইকে আরও বেশি ভালবাসতে ইচ্ছে হয়।’’ নীরজ অনেকদিন পরে তেমনই একটা দিন উপহার দিয়েছেন আমাদের।
অলিম্পিকের ভিক্ট্রি স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়েছিলেন নীরজ। মাঠে বাজছিল জাতীয় সঙ্গীত। মাস্কের আন্দোলনে বোঝা যাচ্ছিল, নীরজও গাইছেন একই সঙ্গে। সেই সময় মনে পড়ে যাচ্ছিল আর একজনকেও। এমন এক ৭ অগস্টেই তো তাঁর মহাপ্রয়াণ। প্রয়াণ দিবসে এমন উজ্জ্বল স্মরণ ওপার থেকে কবিও কি দেখলেন?

(মতামত লেখকের ব্যক্তিগত। ছবি গুগল থেকে নেওয়া)