দেবজ্যোতি কর্মকার 

ফের লকডাউন! ফের ঘরবন্দি। ফের অসহায় অবস্থা! অথচ তিনি মুখ গুঁজে পড়ে আছেন ‘মহাভারত’, ‘বেদ’, ‘উপনিষদ’ এর পুরনো পৃষ্ঠায়! আলমারি থেকে নিজেই খুঁজে বের করেছেন শঙ্খ ঘোষের ‘কবিতার মুহূর্ত’, ‘মূর্খ বড়ো, সামাজিক নয়’ ‘ছন্দের ভিতরে এত অন্ধকার’। কখনও কখনও রবীন্দ্রনাথের আঁকা ছবিগুলোয় চোখ বুলিয়ে নিচ্ছেন। আর সময় পেলেই নিজের ছড়ানো টেবিলে খাতা নিয়ে বসে পড়ছেন। প্রতিদিন নিয়ম করে অন্তত দুটো কবিতা লিখতেই হবে তাঁকে। তিনি বলেন, ‘‘এ এক অন্যরকম উপশম।’’ তিনি একাধারে মগ্ন কবি, ভারত সরকার ঘোষিত ‘শ্রেষ্ঠ নাট্য পরিচালক’ এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকার ঘোষিত ‘শ্রেষ্ঠ নাট্য অভিনেতা’ এবং সবচেয়ে বড় ব্যাপার তিনি নির্জন সাধকের মতো পাঠক। যিনি ইতিমধ্যেই কয়েক হাজার বই পড়ে ফেলেছেন! এই কাজটিই তাঁর পঞ্চম শ্রেণিতে পড়াকালীন শুরু  করেছিলেন কবি, নাট্য পরিচালক ও অভিনেতা অরু চট্টোপাধ্যায়। এখনও প্রতিদিন নিয়ম করে বারো ঘণ্টা বই পড়েন আর নিজেকে খোঁজেন। যখন করোনায় একের পর এক মৃত্যুর খবর আসছে তখন তিনি সমস্ত খবরের শিরোনাম থেকে যোজন দূরে গিয়ে প্রিয় বইয়ের কাছেই আশ্রয় খুঁজে নিচ্ছেন। এ যেন এক বিরাট সমুদ্রের ধারে অপার হয়ে বসে থাকা।
শিক্ষকতা থেকে দশ বছর অবসরের পরেও করিমপুরে তাঁর  স্বপ্নের বাড়িতে (বাড়িটির নাম তিনি রেখেছেন ‘স্বপ্ন’) নিভৃতে অনুবাদ করছেন গদ্য কবিতায় ‘মহাভারত’। টেবিলে ছড়ানো অসংখ্য বই। তার মধ্যে চোখে পড়ল হাতের কাছে রাখা বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’ও! নিজেকে আবার নতুন ভাবে শেখাচ্ছেন বোধহয়! তিনিই বললেন, ‘‘বুড়ো বয়সে আবার শিখতে হচ্ছে ছোটবেলায় শেখা বর্ণবোধ।’’ সেই পঞ্চম শ্রেণিতে পড়াকালীন বাড়ির সিন্দুকে লুকিয়ে রাখা বই গোয়ালঘরের কোণে বসে সকলের অজান্তে পড়া শুরু। হয়তো এটাই ছিল ভবিতব্য। যে বাড়ির কেউ পড়াশোনা জানতেন না সেই বাড়িতেই সিন্দুকে লুকিয়ে রাখা ছিল বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সমস্ত প্রবন্ধ, নবীনচন্দ্র সেন কিংবা ‘গোরা’! নাহলে অষ্টম শ্রেণির মধ্যেই কালীপ্রসন্ন সিংহের মহাভারত পড়ে ফেলতে পারতেন তিনি? তাঁর কথায়, ‘‘১৯৬৬ সালে আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক জয়ন্ত বিশ্বাস আমাকে পড়তে দিয়েছিলেন বুদ্ধদেব বসুর প্রবন্ধ যা আমার কাছে গীতা। তারপরে পড়ে ফেললাম সুধীন দত্ত, বিষ্ণু দে, অমিয় চক্রবর্তী। শুরু হল আধুনিক কবিতার প্রতি মননশীলতা। অষ্টম শ্রেণিতেই পড়ে ফেললাম বুদ্ধদেব বসু অনুদিত বোদলেয়ারের কবিতা। সুধীন দত্তকে না বুঝেই পড়েছি। তবে জীবনানন্দ তখনই আত্মস্থ করে ফেলেছি।’’
কবিতা, নাটক, সাহিত্য, ইতিহাস, চিত্র, দর্শন, ধর্ম, নৃতত্ত্ব সব ধরনের বই-ই আছে তাঁর। তবে তাঁর প্রিয় বই ভাষাতত্ত্ব। যেমন প্রিয় কবি জীবনানন্দ তেমনই প্রিয় ইলিয়ট, ইয়েটস। প্রিয় কাব্য ভার্জিলের ‘ইনিড’। আবার প্রিয় নাটক রবীন্দ্রনাথের ‘ডাকঘর’, ‘রক্তকরবী’। সে অর্থে প্রিয় নাট্যকার ও গীতিকার কবিগুরুই। ফরাসি চিত্রকর সি জান তাঁর খুবই প্রিয়।
১৯৫০ সালের ২০ অগস্ট মুর্শিদাবাদের আমতলায় তাঁর জন্ম। ১৯৭২ সালে কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে বাংলা অনার্স পাশ করেন। ১৯৭৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাশ করেন। ১৯৭৯ সালে করিমপুর জগন্নাথ হাইস্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। অবসর নেন ২০০৮ সালে। কর্মজীবনে খুব সাদামাটা ব্যক্তিত্ব ছিলেন। দূর থেকে এখনও বোঝা কঠিন কী পরিমাণ পাণ্ডিত্য তাঁর। অথচ এক মহৎ শিল্পের সৃজনশীল নির্জন সাধক তিনি। খুব কষ্ট করেই তাঁর নাগাল পাওয়া। যেমন জানতে গিয়ে বেশ কিছুটা বেগ পেতে হয় যে, তিনি ১৯৮৭ সালে ‘সর্বভারতীয় শ্রেষ্ঠ নাট্যপরিচালক সম্মান’ পেয়েছেন। বাদল সরকারের ‘ভোমা’ নাটকটি সে বার মঞ্চস্থ হয় কানপুরে। এ প্রসঙ্গে করিমপুরের আর এক নাট্যব্যক্তিত্ব কল্যাণ চট্টোপাধ্যায় যেমন বলেন, ‘‘অরুণদার শ্রেষ্ঠ নাট্যপরিচালক হিসেবে সম্মানিত হওয়ার খবর সেই ১৯৮৭ সালেই রাতে আকাশবাণী মারফত জানতে পারি। তখন রেডিয়োই ছিল একমাত্র সম্বল। কী যে গর্ববোধ হয়েছিল সেদিন! এখনও একইরকম শ্রদ্ধা করি অরুণদাকে।’’
তারও আগে ১৯৭২ সালে বঙ্গ রঙ্গমঞ্চের শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষে রাজ্য সরকারের তরফে শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে সম্মানিত হন। নাটক নিয়ে এই পথহাঁটাও তাঁর ছাত্র জীবনে শুরু। খুবই অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি এটাই যে, তিনি ষষ্ঠ শ্রেণিতেই পড়াকালীন প্রথম নাট্যপরিচালনা করেন স্কুলের অনুষ্ঠানে। স্কুল আর স্কুলের বাইরে স্থানীয় ক্লাবের হয়ে ‘ডাকঘর’, বিসর্জন’ ‘রক্তকরবী’ ‘মুকুট’ এর মতো নাটক পরিচালনা করে হাত পাকিয়ে ফেলেন। বলা যায় নাটকের প্রতি নেশায় বুঁদ হয়ে যান। নিজেই বললেন, ‘‘১৯৭০ সালে কৃষ্ণনাথ কলেজে পড়তে এসে আমার নাটক এবং লেখালিখির পরিসর বেড়ে যায়। বহরমপুরের  ‘চৌপর’ই (নাট্য ও সাহিত্য সংস্থা) আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ওই সংস্থার সম্পাদক পম্পু মজুমদারের সান্নিধ্যে এসে লেখার পাশাপাশি নাটক নিয়ে পড়াশোনা এবং অভিনয়ের জগতেও ঢুকে পড়ি। সেইসময় কামুর নাটক ‘ক্যালিগুলা’ ছাড়াও ‘ওয়েটিং ফরগডট’ ‘লিউজিপিরান্দলো’ নাটকে অভিনয় করি। সেই সঙ্গে র‍্যাঁবো, রিলকে, বোদলেয়ার পড়ি। বোধের দরজায় যেন আধুনিকতার স্পষ্ট আহ্বান শুনতে পাই। কৃষ্ণনাথ কলেজের পাঠ চুকিয়ে যখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এলাম তখনই পরিচয় হল বিখ্যাত নাট্যদল ‘সৈলুষ’ এর সঙ্গে। যেখানে দেখা পেলাম বিকাশ জানা, সন্দীপ দত্তের (লিটিল ম্যাগাজিনে অন্যতম ব্যক্তিত্ব)। তখনই শুরু পড়ার পাশাপাশি নাটক দেখাও। দেখে ফেললাম শম্ভু মিত্রের পরিচালনায় ‘রক্তকরবী’ ‘অয়দিপাউস’ ‘চোপ আদালত চলছে’। পরিচয় হল ঋত্বিক ঘটক, বিজন ভট্টাচার্যের সঙ্গেও।’’
শিক্ষকতার পাশাপাশি প্রতি শনিবারে মুর্শিদাবাদের আমতলায় গিয়ে নাটক পরিচালনার কাজ করতেন। তাছাড়া নদিয়ার করিমপুরের ‘তরুণ সঙ্ঘ ব্যায়ামাগার’-সহ আরও কয়েকটি নাট্যদলের হয়ে নাটক পরিচালনা  করেছিলেন। অবসর নেওয়ার পরে ২০০৯ সালে করিমপুরে নতুন নাট্যদলের পরিচালনা করেন। ‘উত্তর মঞ্চ’ নামে সেই দলের অন্যতম নাটক ছিল ‘ক্যাপ্টেন হুররা’ যা করিমপুরে বেশ সাড়া ফেলেছিল। এছাড়াও ২০১৩ থেকে করিমপুরের ‘মুক্তধারা’ নাট্য দলের হয়ে ‘অয়দিপাউস’, ‘চরণদাস চোর’ ‘বিসর্জন’ প্রভৃতি নাটক পরিচালনা করেন। দীর্ঘদিন বাদে নিজের লেখা নাটক ‘কিছু বিচিত্র সিম্ফনি’র একক অভিনয়ে করিমপুরের নাট্যমোদী মানুষকে মুগ্ধ করেন। যে নাটক অভিনয় করেই (শিক্ষকতার ইন্টারভিউতে) করিমপুর জগন্নাথ উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক রূপে যোগ দেন। এ তো গেল নাটকের দিক। এ বার কবিতার জগতে আসা যাক।
কী ভাবে অরুণ চট্টোপাধ্যায়, অরু চট্টোপাধ্যায় হলেন? উত্তর এলো, ‘‘আমি তখন অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। একদিন  সন্ধেয় পড়তে বসেছি। বাইরে হঠাৎ ঝড় উঠল। জানলা দিয়ে দমকা হাওয়া এসে ভেঙে দিল হ্যারিকেনটা। আলো নিভে যাওয়া নিয়েই আমার প্রথম কবিতা— ‘এক চাপ অন্ধকার বাতাস উড়িয়ে এনেছে কখন/ জানলা দিয়ে ঢুকে পড়ে পুরো অন্ধকার/এই মুহূর্তে দপ দপ কান্না শুনি হ্যারিকেনের/নিভে গেল আলোকের পৃথিবী আমার …’। ১৯৬৬ সালে এই কবিতাটিই ‘আলোকের পৃথিবী আমার’ নামে আমতলার একটি ছোট পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।’’ তারপরে ‘অভিনব কাব্য সংকলন’ নামের একটি কবিতা সংকলনে ‘স্মৃতি’ কবিতাটি ছাপা হয়। তখন তিনি দশম শ্রেণি। সেই সংকলনে শ্যামলকান্তি দাশ, গৌরশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ অনেকেরই কবিতা ছিল। বহরমপুরে ছাত্রাবস্থায় নিজের উদ্যোগে একটি পত্রিকা ‘দিশারী’ ১৯৭০ সালে শুরু করেন। কিছুদিনের মধ্যেই অকালপ্রয়াণ ঘটে। তবে এই পত্রিকা করতে গিয়েই প্রাপ্তি হয় অনেক। দেখা হয় অমিতাভ মৈত্র, প্রশান্ত গুহ মজুমদার, জমিল সৈয়দ, কওসর জামাল, অগ্রজ কবি উৎপল গুপ্ত, দীপক রায়, পম্পু মজুমদার-সহ অনেকের সঙ্গে। পম্পু মজুমদারের অফিসে মাঝেমাঝেই কবিতা পাঠ হত। ততদিনে কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে পরিচয় হয়ে গিয়েছে। সে সময় কবিতা লিখে কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে ১৯৭১ সালে তিনি পুরস্কৃত হয়েছিলেন। বীরেন চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে খুবই হৃদ্যতা ছিল তাঁর মৃত্যুর আগে পর্যন্ত। তাঁর প্রতিটি বই অরুবাবুকে নিজ হাতে দিয়েছিলেন। তাঁর অজস্র চিঠি আজও তিনি যত্নে রেখে দিয়েছেন। অরু চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘‘বীরেনদাই একবার আমাকে কলকাতায় থাকার জন্য ঘরের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। মনে আছে তিনি বলতেন, ‘কবিতা এমন একটা জিনিস যেটা দিয়ে আকাশেও ঝড় তোলা যায়, সে ঝড় অনুভূতির। কলকাতায় গিয়ে চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকের  অগ্রজ কবিদের সঙ্গে আলাপ হল। কবি অরুণ মিত্র, অমিতাভ দাশগুপ্ত প্রমুখ। তারপর থেকেই দেখলাম অরুণ নামে অনেকেই কবিতা লিখছেন। নিজের নাম তাই ‘অরু’ করে দিলাম। আমি গ্রাম থেকে কলকাতায় গিয়ে কবিতার অন্যরকম স্বাদ অনুভব করলাম। দেখি কবিতায় আন্দোলনের নামে একধরনের জড়তা চলছে। ‘আধুনিকতা’র মোড়কে যাকে আহত করা হচ্ছে। তারপরেই নিভৃতে চলে এলাম। ভাবলাম, কবিতা তো চিৎকার করে পড়ার জন্য নয়। একদম নিজেকে নিজের মধ্যে আবদ্ধ করে ডুব দিলাম কবিতার গভীর অরণ্যে।’’
অজ্ঞাতবাস থেকেই কবিতার সাধনা করে যাচ্ছেন তিনি। ২০১৪ সালে ‘দেশ’ পত্রিকায় ‘আমার দ্বিতীয় জন্ম নেই’ কবিতাটি প্রকাশের পরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়-সহ একাধিক জায়গায় সেই কবিতা আবৃত্তি করা হয়। তারপরে একাধিক কবিতা ‘দেশ’ এ প্রকাশিত হয়েছে। ২০১৯ সালে পেয়েছেন (দর্পণ মুখের খোঁজে আয়োজিত) ‘কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচী স্মৃতি পুরস্কার’। সম্প্রতি প্রতিভাস প্রকাশনা থেকে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ঘাসের দোতরা’ প্রকাশিত হয়েছে। তিনি অনুবাদ করেছেন অজস্র গ্রীক, ইতালীয় ও জাপানি কবিতা। একটি প্রকাশনা সংস্থার প্রস্তাবে মহাভারত অনুবাদ করছেন আধুনিক গদ্য কবিতায়। খুব তাড়াতাড়ি ১৯৬৬-৮০ সালে লেখা ‘যাযাবরী অসুখের ছড়া’ নামের কবিতার আরও একটি বই প্রকাশিত হবে। আমরা সকলেই অপেক্ষায় রইলাম।