সারথি বিশ্বাস

আমি নিকুম্ভ স্যার তো নই! আমি প্রতিদিন দেরি করে স্কুলে যাওয়া বাঙালি, আমি সময়ের আগেই বাড়ি চলে আসা বাঙালি, আমি অনেকটা দেরিতে ক্লাসে গিয়ে কিছুটা আগেই বেরিয়ে আসা বাঙালি, থুড়ি, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, মানে আপনাদের অনেকেই যাঁরা বলে থাকেন— প্রাইমারি টিচার।
স্কুলে কিস্যু হয় না। মাস্টাররা আড্ডা মেরে বেতন নেন। এই ‘উচিত’ কথাগুলো যাঁরা প্রায়ই বলেন, তাঁদের পাল্লা ভারী হল তো? মাস্টাররা চালও কিনে খান না (কেননা মিডডে- মিলের চালেই তাঁদের সংসার চলে যায়) এই সাহসী বাক্যটা যাঁদের মুখ থেকে বেরোয়, সেই সমস্ত স্পষ্টবক্তাদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই আপাতত এই বিষয়টা তুলে রাখছি। কারণ, খাওয়া-দাওয়ার মতো লোভনীয় বিষয় কিনা! তার উপরে এই খাওয়া-খাওয়ির জমানা! যেখানে ত্রাণও চুরি যায়!
প্রায় দেড় বছর হল আমূল বদলে গিয়েছে আমাদের পৃথিবী। বাতাসে এখন শুধুই ভাইরাসের গন্ধ। পৃথিবীর দখলদারি নেওয়া মানুষ একটা অদৃশ্য ভাইরাসের ভয়ে ঘরের কোণে সেঁধিয়ে। করোনা আমাদের সবাইকে বিধ্বস্ত এবং বিপর্যস্ত করে ছেড়েছে। কিন্তু করোনায় সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে শিক্ষা-প্রাঙ্গন। হীরক রাজার দেশের মতো একদিন হঠাৎ শুনলাম, কাল থেকে আর পাঠশালা নেই। ব্যস! যদিও এ আদেশ কোনও রাজার ইচ্ছেয় হয়নি, বাধ্য করেছে করোনা নামে এক অদৃশ্য ভাইরাস। তারপর এখন, একটু একটু করে আর সব কিছুই কমবেশি ছাড়ের আওতায় এসেছে, তালা খোলেনি কেবল ক্লাসরুমগুলোর। আমাদের শিক্ষাপ্রাঙ্গন এখনও স্পর্শের বাইরে।
অবশ্যই শিক্ষার্থীদের উপর এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি। কিন্তু বন্ধ ক্লাসরুম শিক্ষকদের জীবনেও রচনা করেছে এক কলঙ্কিত অধ্যায়। ‘বসে বসে’ বেতন নেওয়ার গ্লানি এবং আম-পাবলিকের গালি, উভয়ই হজম করতে হচ্ছে তাঁদের। শিক্ষকদের উপর সমাজের একটা বড় অংশের ক্ষোভ বাড়ছে। অবশ্যই এই ক্ষোভ আর্থ-সামাজিক বৈষম্যের দান। কিন্তু এর থেকে জন্ম নেওয়া বিদ্বেষ এবং অশ্রদ্ধার বীজ শিশুমনের নরম মাটিতেও বপন করে ফেলছি আমরা, আমাদের অজান্তেই। এবং এই বীজ একসময় তার প্রধান মূল, শাখামূল, প্রশাখামূল নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে শিক্ষক ও পড়ুয়ার উপর, নড়বড়ে করে দিচ্ছে তাঁদের মধ্যেকার সব সম্পর্কের ভিত। এটা খুবই অশুভ সঙ্কেত।এই ক্ষতিপূরণ কী ভাবে হবে জানি না। তবুও দীর্ঘদিন ধরে সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অবিরাম অবিশ্বাসের পরে আজ যখন চারিদিকে একটা গেল গেল রব উঠছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা লাটে উঠেছে বলতে শোনা যাচ্ছে, বেশ আশা জাগছে মনে। মানুষ তো মানুষকে বিপদে আর বিপর্যয়েই ভালো করে চিনতে পারে, বুঝতে শেখে। তাই এত দিন স্কুল বন্ধ থাকার ফলে যদি মানুষ বুঝতে পারে স্কুলের গুরুত্ব, সেইসঙ্গে শিক্ষকের ভূমিকাও, মন্দ কী! শিক্ষক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং অন্য মানুষের মধ্যে এই প্রয়োজনীয় বোঝাপড়াটুকুর এতখানি পরিসর এর আগে কখনও গড়ে ওঠেনি। আমাদের দুর্ভাগ্য, এই আস্থাটুকু অর্জন করতে একটা অতিমারি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হল।
স্বীকার করছি, যেহেতু আমার দেওয়ার অভ্যাস নেই কিছুই, যেহেতু আমি শুধুই নিই, তাই বঞ্চিত হওয়ার পালাও কেবল আমারই। দীর্ঘ দেড় বছর স্কুল বন্ধ থাকায় পড়ুয়াদের কী কী ক্ষতি হয়েছে, কী পরিমাণে হয়েছে, চিন্তাবিদরা বিস্তারিত বলছেন বারবার। আমার চিন্তা কেবল নিজের বঞ্চনা নিয়ে। নাহ্, বেতন বন্ধ হয়নি। যদিও এই লকডাউনে শিক্ষকেরা বাড়িতে ‘বসে বসে’ বেতন পাওয়ায় অনেক সমাজ সচেতন মানুষেরই বিস্তর আপত্তি। ‘মাস্টাররা বসে বসে বেতন নিচ্ছে’— কথাগুলো এমন ভাবে কানে আসে যেন আমরা তোলাবাজি করি বা এলাকার সমস্ত উন্নয়নমূলক কাজে কাটমানি খাই! কিন্তু নিন্দুকের মুখে ছাই দিয়ে বেতনটা এখনও ঠিকঠাকই পেয়ে যাচ্ছি। তবে আমার আবার কিছু উপরিপাওনার অভ্যাস আছে। দীর্ঘ লকডাউনে ওই উপরি পাওনায় বঞ্চনা জমেছে।আমার পাওয়ার ঝুলিটা খানিকটা কাত করছি, দেখুন। চোখ ছানাবড়া হয়ে যাবে। হিসাব সংগ্রহে রাখুন। আক্রমণে কাজে লাগবে। ক্লাসরুমে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে ধেয়ে আসা নালিশগুলো রোলকল সম্পূর্ণ হতে দেয় না কিছুতেই। দূর থেকে সমাধান হওয়ার সম্ভাবনা কম ভেবে কেউ কেউ চলে আসে এক্কেবারে টেবিলের কাছে। কুলের সময় কেউ বাড়িয়ে দেয় একমুঠো কুল, কিংবা আমের সময় একটা কাঁচা আম। কেউ বা বাড়ির গাছ থেকে তুলে আনা ফুলটা নিয়ে সামনে হাত বাড়ায়। কেউ নিজের হাতে আঁকা ছবির পাতাখানা খাতা থেকে ছিঁড়ে এই ভাজ করে টেবিলের উপর রাখে টুক করে। প্রশ্নের উত্তর বলতে পারায় ওদের আনন্দ, পড়া না পারার বেদনা, ক্লাসজুড়ে কত হইচই, কত ঝগড়া, কত কথা, কত চেনা অচেনা গল্প, বারান্দা দিয়ে ওদের ছোটাছুটি, ডিম, সয়াবিন বা মাংসের দিন জল খাওয়া, টয়লেট যাওয়ার নাম করে বারবার রান্নাঘরের সামনে দিয়ে চক্কর মারা, রান্নাঘরের গ্রিল ধরে একটু সময় ঝুলে থাকা, ঠ্যালাঠেলি করে মিডডে-মিল খাওয়া— এই সব আমি ঝোলায় ভরে বাড়ি নিয়ে আসতাম।
কারো এক্কেবারে কাছে চলে এসে রিনরিনে গলায় কানে কানে বলা কথা, অন্যকে ‘গুড’ বললে কারও অভিমান— ‘ওহ! আমি তা হলে গুড না, তাই তো?’ কারণে-অকারণে গায়ের ঠিক কাছটিতে চলে এসে প্রিয় শিক্ষকের উষ্ণতা নেওয়া… বেতনের বাইরে ডিএ, ইনক্রিমেন্টের মতো এইসবও পেয়ে থাকি আমরা। সারাদিন অনেকের সামনে দিয়েই হেঁটে গিয়েছি, আমার স্বাস্থ্যের খোঁজ নেওয়ার ফুরসত হয়নি কারও। ক্লাসেই হয়তো প্রথম কেউ বলল, ‘ম্যাম, আপনার শরীর খারাপ?’ আর ওই যে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুটি, রাজিবুল, যে নিজের নাম বলে আজিবুল, সারাদিনে স্কুলে একবারও জিজ্ঞাসা করার সময় পায় না, কিন্তু ছুটির পরে রাস্তায় ঠিক বলবে, ‘ম্যাম ভায়ো আছেন?’ এদের সঙ্গে করে বাড়ি নিয়ে আসতাম আমি।আর মধু! প্রি-প্রাইমারির ক্লাসে একদিন আমাকে বলেছিল, মধু নাম ওর খুব পছন্দ। কিন্তু ওর নাম মধু না, ওর নাম তামিম। সেদিন থেকে আমি ওকে মধু ডাকি। আমার সেই মধু একদিন বলল, ‘ম্যাম, কাল আসেননি কেন? আপনাকে না দেখলে আমার বুকের মধ্যে কেমন করে।’ এই অব্যক্ত আবেগটুকু, এই নিশ্বাস-প্রশ্বাসটুকু, স্কুলবাড়িটার এই গন্ধটুকু সঙ্গে করে নিয়ে আসতাম আমি। লিস্টি বড় করছি না। আরও আছে। অজস্র শব্দ। অগুনতি ছবি। ঘরবন্দি হয়ে আজ স্পর্শের বাইরে চলে গেল সব। দীর্ঘ লকডাউনে আমাদের সম্পর্কে ধুলো পড়েছে, ঝেড়ে ফলতে হবে তা। তিল তিল করে গড়ে তোলা আমাদের মধ্যের সব ভিত নড়বড়ে হয়ে গিয়েছে হয়তো, নতুন করে মজবুত করতে হবে আবার। যেখানে শেষ হয়েছিল, শুরু করব ঠিক সেখান থেকেই। আমাদের সব পাওনা, উপরি-পাওনা উসুল করে নেব আবার।
কিচ্ছুটি না দিয়েও আমরা কিন্তু পাচ্ছি এত্তো কিছু! তো, রাগ করবেন না প্লিজ! গাছ তো আশেপাশে অনেক আছে। সব গাছে কি পাখি বাসা বাঁধে? অনেকগুলো ছোট পাখির সঙ্গে আমাদের নির্মীয়মাণ বাসাখানা গড়ে নিতে ডালপালা মেলে আছি। তাই ওদের কিচির-মিচির শব্দখানা দিচ্ছে হানা। সেই জন্য হানাবাড়ি হয়ে পড়া স্কুলবাড়ির তালাগুলো খুলে দেওয়া দরকার। স্কুলবাড়ির কথা আর কী বলবো, সবকটা যেন ইংরেজ আমলের পোড়ো বাড়ি, বৃদ্ধের লম্বা দাড়ির মতো থুতনিতে আগাছা নিয়ে, হাতে লাঠি ধরে শতায়ু বছরের বৃদ্ধ যেন, ভেঙে পড়তে বাকি আছে কেবল! তার শরীরে প্রয়োজনীয় অক্সিজেনটুকু পৌঁছে দিতে, শিরা ধমনিতে রক্তের ঘাটতি মেটাতে সজীব কোষগুলোকে এখনই ডেকে আনা দরকার। পুরনো পড়ার মতো স্কুলবাড়িটাকেও ভুলে যাওয়ার আগে স্কুলের সিঁড়িতে পা পড়ুক পড়ুয়াদের। পুজোর ছুটির পরে স্কুল খোলার ভাবনাকে তাই স্বাগত, স্বাগত এবং স্বাগত।
(মতামত লেখকের ব্যক্তিগত। ফিচার ছবি গুগল থেকে নেওয়া।)