সুমিত তালুকদার

 

 

 

মুখ ঢেকে যায় স্লোগানের বিজ্ঞাপনে। নির্বাচনকে পাখির চোখ করে যেমন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তাদের কর্মসূচিতে নানা রদবদল আনছে, তেমনই স্লোগানেও পরিবর্তন এনে পার্টির ইমেজকে আরও জনমুখী ও জনপ্রিয় করে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে। কে কত স্বচ্ছতা ও ন্যায়নীতির প্রমাণ দিতে পারবে তার যেন প্রতিযোগিতা চলছে। ১৯৯৮ সালে তৃণমূলের সুপারহিট স্লোগান ছিল ‘চুপচাপ / ফুলে ছাপ’। তার পরের ভোটের স্লোগান হল – ‘বদলা নয় / বদল চাই’। সম্প্রতি ‘দিদিকে বলো’-র পরে এখন আবার চমক ‘বাংলার গর্ব মমতা’। বিরোধীপক্ষও পিছিয়ে নেই। তাদেরও পাল্টা স্লোগান ‘আর নয় অন্যায়’।

একটা সময় পশ্চিমবঙ্গকে বলা হত – স্লোগান নগরী’। কারণ, গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশক থেকে বামপন্থীদের শাসনে ও প্রশাসনের সময় পর্যন্ত নিত্যদিন মিছিল, ধর্মঘট এবং ‘দিতে হবে, মানতে হবে’ আর ‘চলবে না, চলবে না’ জাতীয় স্লোগান জনজীবনকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। কমিউনিস্টরাও পিছিয়ে ছিল না। তাদের টার্গেট ছিল প্রধানত দু’জন– প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অতুল্য ঘোষ ( যিনি একটা চোখে দেখতে পেতেন না) আর মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্লচন্দ্র সেন। অশালীন স্লোগানে আক্রমণ করা হল– “দু আনা সের বেগুন কিনে / মন হোলো প্রফুল্ল / বাড়িতে এসে কেটে দেখি / সব কানা অতুল্য”। কংগ্রেসিরাও স্লোগান-যুদ্ধে শামিল হলেন এ ভাবে – “ অনিলা মাসি বাজায় কাঁসি / জ্যোতি বাজায় ঢোল / আয় প্রমোদ ভাত খাবি আয় / (দিয়ে) চিনা মাছের ঝোল”। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য ব্যক্তিরা হলেন– জ্যোতি বসু, প্রমোদ দাশগুপ্ত এবং ‘এ.বি.টি.এ’ নেত্রী অনিলাদেবী। আর সেই সময় বিজেপির স্লোগান ছিল, “চোরে চোরে মাসতুতো ভাই / সিপিএম আর কংগ্রেস আয়”। মনে পড়ে, নির্বাচনের মুখে সেই বিখ্যাত স্লোগান – “ভোট দেবেন কিসে / কাস্তে ধানের শীষে”। কাস্তে আর ধানের শীষ ছিল অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির নির্বাচনী প্রতীক। দল ভাগের পর সেই স্লোগান ধার নিয়ে সিপিএম বলল – “ভোট দিন বাঁচতে / তারা হাতুড়ি কাস্তে”।

স্লোগানকে সামান্য হেরফের করে যে কত কী ঘটে, তারও সাক্ষী থেকেছে দেশ। ১৯৭১ সালে ইন্দিরা গাঁধী উন্নয়নের শপথ হিসাবে ‘গরিবি হঠাও / দেশ বাঁচাও’ স্লোগানকে হাতিয়ার করে দিল্লি দখল করেছিলেন। আবার ১৯৭৫-এ জরুরি অবস্থার জন্য ইন্দিরা গাঁধী যখন জেরবার বিরোধীদের আক্রমণে, সেই সময়ে জয়প্রকাশ স্লোগান তুললেন – “ইন্দিরা হঠাও / দেশ বাঁচাও”। ১৯৭৭ সালে নির্বাচনে হেরে গেলেন ইন্দিরা। আবার ১৯৮০-র নির্বাচনে “ইন্দিরা লাও / দেশ বাঁচাও” স্লোগানকে হাতিয়ার করে ফিরেও এলেন বিজয়িনী হয়ে। প্রতুল মুখোপাধ্যায় তো “স্লোগান” নিয়ে গোটা একটা গানই বেঁধে ফেললেন। সাড়াও ফেলেছিল খুব সেসময়। ১৯৮২- সালে গান রচনা করেছিলেন ‘ম্যানিফেস্টো’ পত্রিকার অতি বাম সম্পাদক কবি পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়। ১৯৯৪-তে রেকর্ড -এর ডিস্কে বন্দি হল ‘স্লোগান’।

সম্প্রতি ‘জয় শ্রীরাম’, ‘আজাদি চাই’ এবং হিন্দি ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে ‘ সোজা বাংলায় বলছি‘- র মতো স্লোগানও বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। আসলে, স্লোগানচর্চা কখনও থেমে থাকে না। গতিময়তা তার ধর্ম। নতুন নতুন ভাবনাচিন্তার প্রয়োগে, পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি সাজিয়ে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে স্লোগান হয়ে ওঠে প্রতিবাদের হাতিয়ার। এখনও।