সুদীপ জোয়ারদার

গাছ ঘিরে ঘরের চাল, নাকি ঘরটার চাল ফুঁড়ে গাছখানা? ছেলেবেলায় বোসদের বৈঠকখানা ঘিরে এ ছিল আমাদের এক অমীমাংসিত প্রশ্ন। এই গাছ-ঘর দু’টি কারণে আমাদের খুব প্রিয় ছিল। এক, ঘরটা ছিল বিশাল বড়। বেশ কয়েকজন মিলে দৌড়-ঝাঁপ, হই-হুল্লোড় করা যেত। আর একটা কারণ, একটা কাঠের বিরাট রেডিয়ো। যেটা রাখা থাকত একটা ঢাউস টেবিলের উপর।
এটা সেই সময় যখন আমরা ছোটরা অনেকেই বিশ্বাস করতাম, রেডিয়োর মধ্যে মানুষ বসে থেকে কথা বলে, গানবাজনা করে। তাদের আকার কেমন, তারা কখন ঢোকে, কখন বেরোয়, কী খায় এ সব নিয়ে অবশ্য আমাদের ভাবনা ছিল না। কারণ, এতই যদি ভাবব, তবে লুকোচুরি খেলব কখন, মাটির পুতুলের জন্য কখন করব ঝলমলে কাপড়ের সন্ধান!
তখন টিভি ছিল না, মোবাইলের তো প্রশ্নই ওঠে না। প্রকৃতি ছিল আমাদের সব সময়ের সঙ্গী। বর্ষা বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে যেই দেখতাম সকালে শিশির জমছে ঘাসে, ফুলে ফুলে সাদা হয়ে থাকছে শিউলিতলা আর আকাশটাও ফিরোজা রংয়ে ভারী খুশি খুশি হয়ে উঠেছে, বুঝতাম শরৎ এসে গিয়েছে। এরপর মহালয়া চলে এলেই শরৎ যেন আমাদের ফুটবল খেলার বল্টু রেফারি। যে ভাবে বল্টু রেফারি টেনে বাজিয়ে দিত আমাদের খেলা শুরুর বাঁশি, সে ভাবেই শরৎও যেন বাজিয়ে দিত তার বাঁশিখানা। সে বাঁশির শব্দহীন আওয়াজে আর কি ঘরে থাকা যায়! শুরু হয়ে যেত পুজোর আনন্দে, ছুটির আনন্দে আমাদের মেতে ওঠার আর এক খেলা।
এই খেলার আগে কিন্তু একটা শ্বেতশুভ্র ভোরের কথা বলতে হবে। সে ভোরে আমাদেরকে জাগিয়ে দেওয়া অথবা জেগে যাওয়া আজও বড় সুখের স্মৃতি। সবাই মিলে অত ভোরে আমরা সেই বোসদের গাছ-ঘরে হাজির। শুধু কি আমরা? গিয়ে দেখতাম, এক ঘর নানা বয়সী মানুষ উঠে এসেছে ঘুম ছেড়ে। আসবে নাই বা কেন! এমন ভোর ক’টা আসে তখন গাঁ-গেরামে!
রেডিয়ো খোলার আওয়াজ হতেই সবার কান খাড়া। আর রেডিয়োতে মহালয়া শুরু হতেই উলু আর শাঁখ। সেই ছেলেবেলায়,রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে যে গুটিকতক বিখ্যাত বাঙালির আমরা নাম জানতাম, তাঁদের মধ্যে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র একজন। বড়রা বলাবলি করতেন, বাঙালির এত বড় পুজো লোকটা একা কাঁধে করে নিয়ে আসেন প্রতিবার।
সবাই যে আমরা তন্ময় হয়ে মহালয়া শুনতে পারতাম তা নয় ,কেউ কেউ ঘুমে ঢলেও পড়তাম। গানের শিল্পীদের নাম আমাদের জানার কথা নয়। জানতামও না। গান শুরু হলে বোসবাড়ির কোনও দিদি বা পিসি কখনও বলতেন, ’এ গানটা গাইছেন দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়।’ কখনও তাঁদের মুখে শিল্পীর নাম শুনতাম, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় বা শিপ্রা বসু।
মহালয়া শুনেই আমরা দহের ঘাটে চলে যেতাম। তর্পণ দেখব। সে বার ভোরে দহের ঘাটে ,চ্যাঙা ঠাকুরের তর্পণের মন্ত্রে বীরেন্দ্রকৃষ্ণের অক্ষম অনুকরণ শুনে সবার সে কী হাসি! বলাই জেঠু চ্যাঙা ঠাকুরের ঢং দেখে ধমকে বলেই দিলেন ‘আগে শুদ্ধ মন্ত্র বলা শেখ, তারপরে মহালয়া করবি!’
১৯৭৮ সাল। বানে ভাসল রাজ্যের চারদিক। আমরা ভয়ে ভয়ে আছি। আমাদের গাঁ খানাও এ বার ডুববে নাকি! আমাদের দহটা, যা আমাদের কাছে নদীর চেয়েও কুলীন, সে-ই সামলে দিল। আগত সব জল ধারণ করে। সে বার আমাদের নতুন রেডিয়ো। ভোরে উঠে বোসদের গাছ- ঘরে গিয়ে নয়, মহালয়া শুনব বাড়িতে। বানের ভয়ের মধ্যেও বুকে একটা পাখি শিস দিচ্ছে অবিরাম। কিন্তু মেঘ, বর্ষণ, বিদ্যুতের ঝিলিক মহালয়া প্রায় আটকে দিল। বেশিরভাগটাই শোনা গেল না ইথারে মেঘের হস্তক্ষেপে।
মহালয়া হলেই মনে ছুটির হাওয়া। কিন্তু সত্যিকারের ছুটির জন্য তো সেই পঞ্চমীর অপেক্ষা। স্কুল সেদিন এক দু’পিরিয়ড হয়ে তবে ছুটি। ক্লাস নাইন তখন। মহালয়ার পরের দিন স্কুলে প্রথম পিরিয়ডে এলেন বাংলার সুরেনবাবু। পড়া, ‘অচেনার আনন্দ’। লেখক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। পাঠ সংকলনে ‘অচেনার আনন্দ’ বের করতে করতে সুরেনবাবু শুধোলেন, ‘কাল কী গেছে বলো তো?’ আমরা সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠলাম ‘মহালয়া,স্যর!’ সুরেনবাবু বললেন ‘মহালয়া সে তো আমরা সবাই জানি। কাল আরও একটা ব্যাপার ছিল।’
আমরা সবাই তাকিয়ে রয়েছি সুরেনবাবুর দিকে। সুরেনবাবু বললেন ‘সেও এক মহালয়া। তবে দিনটা সে বার ছিল ২ অক্টোবর। আর সালটা কত জানো? ১৯২৯। একটা বই বেরিয়েছিল সেদিন। আজ যে গদ্যটা আমরা পড়তে চলেছি, সেই গদ্যটা যে বই থেকে নেওয়া, সেই বই। হ্যাঁ, ‘পথের পাঁচালী।’
সুরেনবাবু আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ মহালয়া মানে পিতৃ-তর্পণের দিন। বিভূতিভূষণ তাঁর দিনলিপিতে সেদিন কী লিখেছিলেন দেখ।’ একটা চিরকুট বের করে সুরেনবাবু পড়লেন ‘আজ মহালয়া, পিতৃ-তর্পণের দিন। কিন্তু আমি তিলতুলসী তর্পণে বিশ্বাসী নই। বাবা রেখে গিয়েছিলেন তাঁর অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করবার জন্য। তাই যদি করতে পারি, তার চেয়ে সত্যতর কোনো তর্পণের খবর আমার জানা নেই।’
সুরেনবাবু অদ্ভুত শান্ত গলায় বলে চললেন, ‘’যাঁরা এই বই দেখলে খুশি হতেন সেই সব নিকটজন অনেকেই তখন পরপারে, অনেকের খবর অজানা। তাঁদের উদ্দেশে বিভূতিভূষণ লিখছেন, ‘এই নিস্তব্ধ রাত্রির অন্ধকার- ভরা শান্তির মধ্য দিয়ে আমি সকলকেই আমার অভিনন্দন পাঠিয়ে দিচ্ছি।’ কী সুন্দর,তাই না!’’
মনে সেদিন অন্যরকম প্রশান্তি। মহালয়া এলে আজও পিতৃ-পুরুষের সঙ্গে ফিরে ফিরে আসেন সুরেনবাবু, বিভূতিভূষণ। আর এই দিনে বের হওয়া সেই বিখ্যাত বইখানা তাক থেকে পেড়ে পড়ে চলি আবার… আরও একবার…

(ফিচার ছবি গুগল থেকে নেওয়া)