দেবযানী ভৌমিক চক্রবর্তী

বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপুজোকে ঘিরে কত উন্মাদনা, উৎসাহ, পারস্পরিক সৌহার্দ্য বিনিময়৷ মহালয়া যেন সেই উৎসবেরই শুভ মহরত৷ মহালয়া থেকেই দিন গোণা শুরু৷ শারদোৎসব কথাটি দুর্গাপুজোর থেকেও জ্যান্ত হয়ে ওঠে আমাদের অনুভবে৷ তাই তো হিন্দু ধর্মের রীতিনীতি মেনে পূজার্চনা হলেও এ উৎসবের আত্মা হল অসাম্প্রদায়িক মানবাদর্শ৷
সাম্প্রতিক সমস্যাটা হল মহালয়ার দিন বন্ধুদের শুভ বলাটা নাকি সাঙ্ঘাতিক বেআক্কেলে কাণ্ড! সমাজ-মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে, কিছু মানুষ উঠেপড়ে লেগেছেন যাতে কেউ ‘শুভ মহালয়া’ না বলেন সেটি বোঝাতে৷ তাঁদের যুক্তি, মহালয়া আসলে পূর্বপুরুষদের তিল, জল দানের দিন৷ অর্থাৎ পূর্বপুরুষদের স্মৃতি-তর্পণ৷ কাজেই স্মরণের দিন কেন শুভ হবে? কিন্তু ছোট থেকেই শুভ মহালয়া কথাটায় অভ্যস্ত মানুষজন এই হঠাৎ আবির্ভূত বক্তব্যে কিছুটা অবাক এবং হতাশও৷
মহাভারত উদ্ধৃত করে একটি কাহিনি সমাজ-মাধ্যমে প্রচারিত৷ সেটি হল— কর্ণের আত্মা যখন স্বর্গে গেল, তখন তাঁকে সোনাদানা খেতে দেওয়া হল৷ এতে তো মহা সমস্যায় পড়লেন কর্ণ৷ যমরাজকে বললেন, তাঁর জন্য খাদ্য, পানীয়ের ব্যবস্থা কি হবে না? জানতে পারলেন, তাঁকে এ সবই খেতে হবে৷ কারণ, তিনি পূর্বপুরুষকে জল দান করে আসেননি। তাই অর্জিত পুণ্যবলে তাঁর পানীয় বা খাদ্যলাভের অধিকার নেই৷ উপায় কী? যমরাজের বিধানে মর্ত্যে গিয়ে তিনি পূর্বপুরুষকে জল দান করলেন৷ সূর্য যেদিন কন্যা রাশিতে প্রবেশ করে সেদিন থেকে বৃশ্চিকে প্রবেশ করার এই এক পক্ষকালেই এহেন ঘটনা ঘটে৷ তাই তর্পণের দিন পূর্বপুরুষকে স্মরণ বা তিল, জল দান করাই রীতি হয়ে গেল৷ সেক্ষেত্রে দিনটি নাকি মহাশোকের, তাই ওই দিন কোনওভাবেই ‘শুভ মহালয়া’ বলা যাবে না৷
এই কাহিনিটি মহাভারতের ঠিক কোথায় আছে তার কোনও উল্লেখ অবশ্য সেখানে নেই৷ মহাভারত হাতড়ে তার সমাধানও মিলল না৷ আমরা যদি ধরেও নিই গল্পটি মহাভারতে রয়েছে, তাও সেখানে একটা বক্তব্য মাথায় আসে৷ সেটি হল, কর্ণ তো পিতৃপরিচয়হীন ৷ মায়ের বিবাহের আগের সন্তান হওয়ায় মা তাঁকে ত্যাগ করেছিলেন লোকলজ্জার ভয়ে৷ মা ধারণ করলেও মায়ের পরিচয় সন্তানের জন্য যথেষ্ট নয়৷ কাজেই বাধ্য হয়েই কুন্তী তাঁকে ত্যাগ করেছিলেন৷ আজন্ম লাঞ্ছিত কর্ণ কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ শুরুর আগের দিন জানলেন তাঁর প্রকৃত পিতৃ পরিচয়৷ তারপরে তো তিনি যুদ্ধক্ষেত্রেই মারা গেলেন৷ কাজেই পূর্বপুরুষকে জল দেবেন কী করে! অথচ স্বর্গে গিয়েও তাঁর নিস্তার নেই৷ এ-ও তো পুরুষতন্ত্রেরই চোখরাঙানি বলে মনে হয় আমাদের৷ মা নন, বাবার প্রাধান্য সেখানেও৷
কর্ণের কাহিনির অনুসরণে পরবর্তীতে সাধারণ মানুষও পূর্বপুরষকে জলদান বা তর্পণ শুরু করলেন৷ এ বারে আমাদের প্রশ্ন, তাতে দুঃখের কী আছে? স্বয়ং নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী বললেন, ‘‘দিনটি কোনওভাবেই দুঃখের বা শোক পালনের দিন নয়। এটা সত্যি যে এই দিন পিতৃপক্ষের শেষ, তেমনই দেবীপক্ষেরও তো শুরু। এ ছাড়া পূর্বপুরুষের উদ্দেশে তর্পণ, অর্থাৎ তৃপ্ত করা বা সন্তুষ্টিবিধান করা। তা হলে পূর্বপুরুষকে তৃপ্ত করে তাঁদের আশীর্বাদ প্রার্থনা করার দিনটি সবসময়ই শুভ৷’’
এ ছাড়াও, বাড়িতে বিয়ে বা কোনও মঙ্গলানুষ্ঠানের আগে তো নান্দীমুখ করা হয়, সেটাও তো শ্রাদ্ধই, তাহলে কি বিয়ের দিনটাও দুঃখের দিন? কাজেই মহাভারতের কাহিনি যতই টানা হোক, আমরা ‘শুভ মহালয়া’ই বলব, এতে কোনও মহাভারত অশুদ্ধ হবে না৷
(লেখক জিয়াগঞ্জ শ্রীপৎ সিং কলেজের সহযোগী অধ্যাপক। মতামত লেখকের ব্যক্তিগত)