সুমন চট্টোপাধ্যায়

পুজো শেষ, এ বার কি তবে ফের আর্তনাদের শুরু?
ডাক্তারবাবুরা ভয় দেখাচ্ছেন, বলছেন নিয়মভাঙা দায়িত্বজ্ঞানহীনতার মাশুল এ বার আমাদের দিতে হবে। রে রে করে নাকি কোভিড ফিরবে, আবার হাসপাতালের শূন্য বিছানাগুলো ভরতে থাকবে, অ্যাম্বুল্যান্সের হুটারের আওয়াজ ফের শোনা যাবে ঘনঘন। নতুন করে কান্নার রোল শোনা যাবে ঘরে ঘরে।
ছবিটা এমন হবেই ডাক্তারবাবুরা সে কথা বলছেন না। তাঁরা আপাতত বিপদ-সঙ্কেতের বার্তা শুনিয়ে রাখছেন। কেরলে ওনাম উৎসবের পরে এমনটি হয়েছিল। বাংলায় সেই অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি হতেই পারে।
এমন জলঘোলা পরিস্থিতিতে আমরা যে কাজটা সবচেয়ে ভালো পারি সেটাই শুরু করে দিয়েছি। কেউ দোষ চাপাচ্ছি পুজো কর্মকর্তার ঘাড়ে, কেউ কাঠগড়ায় তুলছি কাণ্ডজ্ঞানহীন জনতাকে, কেউ আবার সঙ্কটে রাজ্যবাসীর সামনে সাবধানতার নীল নকশা তৈরির ব্যর্থতার দায় ঠেলে দিচ্ছি রাজ্য সরকারের কোর্টে। ডাক্তার কুনাল সরকার পরিহাসছলে যাকে বলছেন, ‘দ্য পাওয়ার অব কনফিউশন’।
মোদ্দা কথাটি হল চোর পালিয়ে যাওয়ার পরে বুদ্ধি বাড়ল না কমল, তার হিসেব করে কী লাভ?
আমার ক্ষুদ্র ব্যক্তিগত পরিসরে আমি কোনও বিপদের আশঙ্কা করছি না। আমরা কর্তা-গিন্নি গৃহপালিত জীব হয়ে গিয়েছি অনেক দিন, পুজোর দিনগুলিতেও চৌকাঠ পেরোনোর তাগিদ অনুভব করিনি। পুত্র-কন্যা প্রবাসে, যে যার কর্মস্থলে, তাদের নিয়েও আপাতত শিরঃপীড়া নেই। দিন কতক আগে শরীরটা একটু বিগড়ে ছিল, গলায় ব্যথা, জ্বর জ্বর ভাব। আমি জাত হাইপোকন্ড্রিয়াক, কাল বিলম্ব না করে আরটি-পিসিআর পরীক্ষা করিয়ে নিয়েছি। এই নিয়ে দশবার করালাম, প্রতিবারই নেগেটিভ। শুনে আমার দিদি বলল, ‘এ বার গিনেস বুক অব রেকর্ডসে’ ঠিক তোর নাম উঠবে।
আপনি বাঁচলে বাপের নাম, আমরা সবাই কম বেশি এ জাতীয় স্বার্থপরতায় আক্রান্ত। অস্বীকার করা হবে মিথ্যাচার। সমস্যা আমার ব্যক্তিগত নয়, সমষ্টিগত, স্বজন, বন্ধু, পরিচিত, অপরিচিত, সব্বাইকে নিয়ে সেই সমাজ। করোনার প্রথম ঢেউয়ে যায় যায় অবস্থা হয়েছিল আমার গিন্নির, চলে গিয়েছিলেন হরি বাসুদেবন, আমার মাস্টারমশাই, প্রিয় বন্ধু ও সহপাঠী তপতী গুহঠাকুরতার স্বামী। পায়ে হেঁটে গটগট করে হাসপাতালে ঢুকে হরি বেমালুম ভ্যানিশ হয়ে গেলেন, স্ত্রী-কন্যা তাঁকে দেখতেও পেলেন না। এমন অপ্রত্যাশিত, অসময়োচিত, বিচ্ছেদ বেদনাকে ছায়াসঙ্গী করে তপতী দিন গুজরান করছে বছর খানেকের বেশি হয়ে গেল। ওর ফেসবুক প্রোফাইলে একবার চোখ বোলালেই তা পরিষ্কার হয়ে যায়। ফেসবুকের পোস্টে ও হরির সঙ্গে নিয়ত কথা বলে, সাংসারিক টুকিটাকি খবর দেয়, অতীতের অ্যালবাম থেক ছবি তুলে এনে সুখস্মৃতি রোমন্থন করে। আমি পড়ি, তাপুর শোক বন্ধু হিসেবে পঙ্গু করে দেয় আমাকেও। আমি ওর পোস্টে কোনও মন্তব্য করি না, কেবল ওর শোক, ওর বেদনা, ওর আর্তি আত্মস্থ করার চেষ্টা করি।
দ্বিতীয় ঢেউ নিয়ে গেল আরও দু’জন অতিপ্রিয় মানুষকে। কলকাতায় সৌরভ মুখোপাধ্যায়, দুর্গাপুরে পবিত্র চট্টোপাধ্যায়। এদের নিয়ে আমি আমার ব্লগে লিখেছি, আর তার পুনরাবৃত্তি চাই না। তাই চাই না তৃতীয় ঢেউ আসুক, আর একটি প্রাণও নষ্ট হোক, খালি হোক কোনও মায়ের কোল। কৈলাসগামিনী মায়ের কাছে আমি এই প্রার্থনাই করেছি, এখনও করছি। আপনারাও করুন। বলুন, ‘ভয় হতে তব অভয় মাঝে নুতন জনম দাও হে।’
ভুবনেশ্বরের কয়েদখানায় বসে আমি খুব মন দিয়ে আবার কামুর ‘প্লেগ’ পড়েছিলাম। লিখেও ছিলাম তা নিয়ে। এই বই পড়ার পরে মহামারীক্লিষ্ট জনপদের মানুষের মনস্তত্ত্ব বুঝতে আর কোনও অসুবিধে হয় না। অসুবিধে হয় না এই অমোঘ সত্যকে বুঝতেও যে ভাইরাসের বিরুদ্ধে মানুষের জয় সর্বদাই সাময়িক। কামুর উপলব্ধিতে ‘Being alive always was and will always remain an emergency, it is truly an inescapable underlying condition’. কামুর কাছে এটাই হল absurdity of life.
তাই বলে কি এই উপলব্ধি থেকে হতাশাই কেবল জন্ম নেবে? আদপে নয়। বরং এই উপলব্ধি হলে হৃদয় শান্ত হবে, জাগ্রত হবে আনন্দ আর মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতাবোধ। পাঠককে ভয় পাইয়ে দেওয়াটা এই উপন্যাসের লক্ষ্য নয়, কেন না ভয়ের মানে হল একটা সাময়িক আপৎকালীন অবস্থায় সুরক্ষার সন্ধান। কিন্তু সুরক্ষা বা নিরাপত্তা শেষ পর্যন্ত একটা অলীক কল্পনা ব্যতীত আর কিছু নয়। Life is a hospice, never a hospital।
সব কিছুরই একটা শেষ থাকে, শেষ থাকে সর্বনাশেরও। পুজোর ক’দিনে কলকাতায় আমরা যে ছবি দেখলাম, ফ্রান্সের ওরান শহরেও কামু একই রকম ছবি এঁকেছেন। ওরান একদিন প্লেগমুক্ত হয়, উন্মুক্ত হয় বন্ধ দরজা, বন্দরে আবার জাহাজ এসে নোংরা করে। স্বজন বিয়োগের বেদনা ভুলে গিয়ে শহরবাসী ফের মেতে ওঠে উন্মত্ত আনন্দে, দোকানপাট খোলে, পানশালায় ভিড় উপচে পড়ে, এতদিন শ্মশানের নীরবতা নিয়ে পড়ে থাকা ধূ ধূ বালুকাবেলা আবার কোলাহল মুখরিত হয়ে ওঠে, রাস্তায় গভীর আশ্লিষ্ট চুম্বনে প্লেগের দুঃস্বপ্ন ভুলতে চায় প্রেমিক যুগল। এটা তাই কাণ্ডজ্ঞান বা দায়িত্বজ্ঞানের প্রশ্ন নয়, দীর্ঘ,অবরুদ্ধ, নিঃসঙ্গ জীবনের বিরুদ্ধে মানবমনের স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহ।
সবার ওপরে সবচেয়ে বড় সত্যটা হল, মানুষ মরে কিন্তু ভাইরাস মরে না। সে চুপ করে ঘাপটি মেরে বসে থেকে ধৈর্যের পরীক্ষা দেয়, সকলের অলক্ষ্যে সে বসে থাকে শোয়ার ঘরের তাকে, স্যুটকেসের ভিতরে, পকেটের রুমালে কিংবা পুরোনো কাগজপত্রের ভাঁজে। তারপর একদিন সে অতর্কিতে একই ভাবে হানা দেবে অন্য কোথাও, অন্য কোনওখানে।

(মতামত লেখকের ব্যক্তিগত। ঋণ-বাংলাস্ফিয়ার। সুমন চট্টোপাধ্যায়ের আরও লেখা পড়তে ক্লিক করুন sumanchattopadhyay.com এ)