দেব প্রসাদ সান্যাল

এখনও নিঝুম দুপুরে ফিরে ফিরে আসে পুরনো সেই দিনের কথা। এখনও গ্রামের মানুষ কথায় কথায় টেনে আনেন তাঁর প্রসঙ্গ। এখনও সান্যাল বাড়ির আনাচকানাচে পড়ে রয়েছে তাঁর বহু স্মৃতি-চিহ্ন!
ধোড়াদহের সান্যাল বাড়ির কাঁঠালতলার আঁতুড়ঘরে ১৮৯৮ সালের ২২ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন বাংলার কৃতী সন্তান, দেশপ্রেমিক, স্বাধীনতা সংগ্রামী, রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ, সফল ব্যবসায়ী, স্পোর্টসম্যান ড. নলিনাক্ষ সান্যাল। পিতা রজনীকান্ত সান্যাল সেই সময় বহরমপুরের বিখ্যাত আইনজীবি ছিলেন। মেধাবী নলিনাক্ষ বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজ এবং প্রেসিডেন্সি কলেজের পাঠ শেষ করে স্কলারশিপ পেয়ে বিলেতে যান। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্স- এ অর্থনীতিতে পিএইচডি করেন। লন্ডনে থাকাকালীন জাতীয়তাবাদী ও দেশাত্মবোধক রাজনীতিতে আকৃষ্ট হন। সে দেশে সাইমন কমিশনকে বয়কটের জন্যে বিদেশে তাঁর কারাবাসও হয়।
ধোড়াদহ রজনীকান্ত উচ্চ বুনিয়াদি বিদ্যালয়
দেশে ফিরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘ ৩৫ বছর অর্থনীতির অধ্যাপক ছিলেন। চিত্তরঞ্জন দাশের হাত ধরে তিনি জাতীয় কংগ্রেসে পা রাখেন। ব্রিটিশ বিরোধী ভূমিকা পালন করার জন্য তাঁকে মোট সাত বার কারাবরণ করতে হয়। আধুনিকমনস্ক, সংস্কারমুক্ত চিন্তার মানুষ ছিলেন তিনি। এ প্রসঙ্গে একটি বিশেষ ঘটনা উল্লেখ করতেই হয়। ১৯২৪ সালে বিবাহ করেন বহরমপুরের কাদাইয়ের ভট্টাচার্য পরিবারের কন্যাকে। বন্ধুর বিয়ে উপলক্ষে কবি নজরুল ইসলাম বহরমপুরে আসেন এবং বরযাত্রীও যান। মুসলিম ব্যক্তির উপস্থিতিতে ব্রাহ্মণ বাড়িতে বিবাহ আসরে আলোড়ন পড়ে যায়। সেখানে অন্য বরযাত্রীদের থেকে দূরত্ব রেখে নজরুল ইসলামকে খেতে দেওয়া হয়।
নলিনাক্ষ সান্যালের ভাই, শশাঙ্কশেখর সান্যাল ওই দৃশ্য দেখে ক্ষুব্ধ হয়ে দাদাকে বিয়ের মঞ্চে গিয়ে বলেন, ‘দাদা ওরা কাজিকে অপমান করেছে। এই বিয়ে হবে না, তুই চলে আয়।’ তখন নজরুল সকলকে বুঝিয়ে শান্ত করেন। সেই রাতেই নজরুল ‘জাতের নামে বজ্জাতি সব/ জাত জালিয়াত খেলছ জুয়া’, বিখ্যাত কবিতাটি রচনা করেন। এর পরে বিবাহ পর্ব শেষে ভোরের দিকে উঠোনে চেয়ারে বসে বাড়ির কর্তা শরৎচন্দ্র ভট্টাচার্য তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় শুনতে পান সুমধুর কন্ঠে কেউ এক জন শ্যামাসঙ্গীত গাইছে। খড়ম পায়ে উঠে গিয়ে তিনি দেখেন, বাড়ির কালীমন্দিরে বসে চোখ বন্ধ করে নজরুল গাইছেন আর তাঁর চোখ দিয়ে জল ঝরছে।
নলিনাক্ষ সান্যালের জন্মভিটে
১৯৪৬। কলকাতায় দাঙ্গা। তখন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় সাহসিকতার সঙ্গে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ড. নলিনাক্ষ সান্যাল। অনেকেই সে ইতিহাসের পাতা আর খুলে দেখেন না। ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হলেও ঝুলে রইল করিমপুর-সহ নদিয়া-মুর্শিদাবাদের বৃহৎ অংশের ভাগ্য। সে সব এলাকা আদৌ ভারত ভূখণ্ডের মধ্যে থাকবে নাকি পাকিস্তান সীমানার মধ্যে চলে যাবে, এই চিন্তায় বিনিদ্র রজনী যাপন করেছে এই দুই জেলার মানুষ। সেই সময় ড. সান্যালের ভূমিকা ছিল সদর্থক। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে অন্যদের সহযোগিতায় ধোড়াদহ, করিমপুর, শিকারপুর অঞ্চল নদিয়ার জেলার অন্তর্ভুক্ত করে ভারতীয় ভূখণ্ডে রাখতে পেরেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে নদিয়া ও মুর্শিদাবাদের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের স্বাধীনতা দিবস ১৯৪৭ সালে ১৭ অগস্ট।
নলিনাক্ষ সান্যালের ব্যবহার করা চেয়ার
১৯৬৭ সালে অজয় মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে আলাদা বাংলা কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করেন এবং করিমপুর বিধানসভা থেকে বিধায়ক নির্বাচিত হন। ১৯৬৯ সালে মতবিরোধে আবার দল পরিত্যাগ করে প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষের পিডিএফ মন্ত্রিসভায় যোগ দেন। নিজের গ্রাম ধোড়াদহের সাধারণ ছেলেমেয়েদের কথা ভেবে শিক্ষাব্রতী নলিনাক্ষ নিজের  উদ্যোগে এলাকার বিদ্যোৎসাহী মানুষের সহায়তায় তাঁর পিতা রজনীকান্ত সান্যালের নামে ১৯৬১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ‘ধোড়াদহ রজনীকান্ত উচ্চ বুনিয়াদি বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করেন। বিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক প্রধান শিক্ষক ছিলেন গ্রামের কৃতী সন্তান তারাপ্রসাদ সান্যাল। করিমপুর ও তার পার্শ্ববর্তী বিস্তীর্ণ অঞ্চলের ছাত্রছাত্রীরা বাধ্য হতো উচ্চ শিক্ষালাভের জন্য প্রায় আশি কিলেমিটার দূরে কৃষ্ণনগর অথবা বহরমপুরে যেতে। এলাকার সাধারণ মানুষে উচ্চতর শিক্ষালাভের স্বার্থে নলিনাক্ষ সান্যাল অন্য শিক্ষানুরাগীদের সঙ্গে নিয়ে করিমপুরের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী দুর্গাপ্রসাদ আগরওয়ালের দান করা জমিতে ১৯৬৮ সালে করিমপুরে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। দুর্গাপ্রসাদ আগরওয়ালের স্ত্রী পান্নাদেবীর নামানুসারে এই কলেজের নামকরণ করা হয় করিমপুর পান্নাদেবী কলেজ। প্রসঙ্গত, নলিনাক্ষ সান্যাল ভারতীয় রেলবোর্ডের উচ্চপদে আসীন ছিলেন বেশ কিছুদিন।
১৯৮৭ সালের ২৯ অক্টোবর কলকাতার ৩৫, হিন্দুস্থান রোডের বাড়িতে বর্ণময় এই মহান মানুষের জীবনদীপ নিভে যায়। নতুন প্রজন্মের কাছে ড. নলিনাক্ষ সান্যাল প্রায় না শোনা একটি নাম। আক্ষেপের কথা, নদিয়ার ধোড়াদহের মতো অতি প্রত্যন্ত এলাকা থেকে দেশের রাজনৈতিক ও শিক্ষাজগতে তাঁর কীর্তি বর্তমান প্রজন্মের কাছে বিস্মৃতপ্রায়। আর সেই কারণেই প্রায় নীরবেই চলে গেল আরও একটা ২৯ অক্টোবর।