দীপক সাহা

নাম ঘোষণা হওয়ামাত্রই হাততালিতে ফেটে পড়ল গোটা হলঘর। রাষ্ট্রপতি ভবনের লাল কার্পেটের উপর দিয়ে খালি পায়ে হেঁটে আসছেন সত্তরোর্ধ্ব মহিলা। সাদামাটা অথচ দাপুটে। ধীরপায়ে হেঁটে প্রথমেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে নমষ্কার করলেন তিনি। প্রত্যুত্তরে হাতজোড় করলেন মোদীও। তারপরে অমায়িক কায়দায় সকলের উদ্দেশে প্রণাম জানিয়ে হেঁটে এগিয়ে গিয়ে রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দের হাত থেকে নিলেন পদ্মশ্রী পুরস্কার। সারা জীবন ধরে পরিবেশ রক্ষায় তাঁর কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তুলসীকে এই সম্মান। ২০২০ সালের পদ্মশ্রী পুরষ্কারে পুরস্কৃত হলেন তিনি। মুহূর্তে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল তুলসী গৌড়া।
ভারতের চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক খেতাব ‘পদ্মশ্রী’ পেলেন ১১৯ জন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন আলোচিত বলিউড অভিনেতা কঙ্গনা রানাউত, পরিচালক করণ জোহর, প্রযোজক একতা কাপুর, সঙ্গীতশিল্পী আদনান শামি-সহ প্রমুখ। এই তালিকার এক অখ্যাত নাম তুলসী গৌড়া। আসলে নাম নয়, আস্ত এক অরণ্য যেন। পুরস্কারের মঞ্চে এসেছিলেন নিজের হাল্কাকি জাতিসত্তার ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে। এই আদিবাসী নারী তাঁর জীবনকেও তথাকথিত সভ্যতার ‘অন্ধকারে’ নয়, বরং সাজিয়েছিলেন প্রকৃতির আদিম অকৃত্রিমতায়।
সাদামাটা অবতারেই দেশবাসীর মন জয় করে নিয়েছেন তিনি। নেট দুনিয়ায় এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি চর্চিত নাম তুলসী গৌড়া। আদিবাসী শাড়ি পরিহিত তুলসীর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে সৌজন্য বিনিময়ের চিত্র সবচেয়ে বেশি ভাইরাল হয়েছে। খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ইনস্টাগ্রামে তুলসীর ছবি শেয়ার করেছেন।
তুলসীর জন্ম কর্নাটকের হান্নালি গ্রামে। আজ থেকে সাত দশক আগে জাতপাতের সমস্যা আরও প্রকট ছিল দ্রাবিড়ভূমে। হাল্লাকি নামে এক উপজাতির অন্তর্গত এক পরিবারে জন্ম হয়েছিল তুলসীর। মাত্র দু’বছর বয়সে হারিয়েছেন বাবাকে। তারপর থেকেই মায়ের সঙ্গে পরিশ্রমের জীবন শুরু। সংসার চালাতে মায়ের সঙ্গেই একটি নার্সারিতে কাজ করতেন তিনি। ছোট ছোট গাছদের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল জীবন। প্রকৃতির মাঝে থাকতে থাকতেই সবুজকে ভালোবেসে ফেলেছিলেন তুলসী। আর সেই ভালোবাসার টানেই কিনা গত ছ’দশকে লাগিয়ে ফেলেছেন ৩০ হাজারেরও বেশি চারাগাছ।
এই মুহূর্তে ৭২ বছর বয়স তাঁর। এখনও থামেননি। একাধিক পরিবেশ সংরক্ষণ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন তিনি। বলাই বাহুল্য, ছোট থেকে নার্সারিতে কাজ করার কারণে প্রথাগত শিক্ষালাভ হয়ে ওঠেনি তাঁর। নেই কোনো নামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভারী ডিগ্রি। তবে গাছপালা সম্পর্কে তাঁর জ্ঞানের বহর তাক লাহিয়ে দিয়েছিল বন বিভাগের আধিকারিকদের। ভালোবেসে তাই এ দেশের মানুষ তাঁর নাম দিয়েছেন ‘এনসাইক্লোপিডিয়া অব ফরেস্ট’। কারণ, বিশ্বের প্রতিটি গাছ সম্পর্কে জ্ঞান রয়েছে তুলসীর। গাছের গুণাগুণ থেকে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, সবটাই তাঁর নখদর্পণে।
৭২ বছরের বৃদ্ধা বরাবরই প্রকৃতিপ্রেমী। মাত্র ১২ বছর বয়স থেকেই তিনি বৃক্ষরোপণ করতে শুরু করেছিলেন। পরবর্তীতে বন দফতরের ভলান্টিয়ার হিসেবে কাজ করতে শুরু করেন। বন সংরক্ষণের প্রতি তাঁর ঝোঁক মুগ্ধ করেছিল ওই দফতরের আধিকারিকদের। সেই কারণেই পরবর্তীতে তুলসী ওই দফতরে চাকরি পেয়েছিলেন। পাশাপাশি, নিজের মায়ের নার্সারিতেও কাজ করতেন তিনি। কয়েক দশক ধরে, এই বৃদ্ধা বন সংরক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে কাজ করে চলেছেন।
তুলসী গৌড়া কোনও প্রথাগত শিক্ষা পাননি, তবে গাছপালা এবং ঔষধি সম্পর্কে অবিরাম জ্ঞান অর্জন করেছেন। তুলসী বনবিভাগ দ্বারা পরিচালিত বনায়ন কর্মসূচিতে সক্রিয় ভাবে জড়িত এবং যতক্ষণ না গাছের চারাগুলি নিজেরাই দাঁড়াচ্ছে ততক্ষণ তাদের লালন-পালন করেন। তিনি বিরল নানা জাতের গাছের কী ভাবে যত্ন করতে হয় তা জানেন। একক ভাবে তিনি গাছ-শিকারিদের মোকাবিলা করেছেন। দাবানল আটকেছেন। পশ্চিমঘাটের বন সংরক্ষণে তাঁর অবদান অপরিসীম।
তাঁর কাজ কোনও সীমানা মানে না, গোটা বিশ্বের জন্য নিরলস ভাবে পরিশ্রম করে চলেছেন তিনি। বিশ্ব যখন জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে চিন্তিত, গ্লাসগোয় বিশ্বের তাবড় জনপ্রতিনিধিরা বৈঠকে বসছেন। গত ছ’দশকেরও বেশি সময় ধরে সমস্ত বাধা বিপত্তি উপেক্ষা করে নিজের উদ্যোগে চারা গাছ লাগিয়ে চলেছেন কর্ণাটকের আঙ্কোলা তালুক এলাকায়। চরম দারিদ্রের সঙ্গে লড়াই করে নিজের একক পরিশ্রমের সরকারি স্বীকৃতি পেলেন জীবনের প্রায় উপান্তে এসে।
তবে এতকিছু এত সম্মান পাওয়ার পরেও মাটির কাছাকাছি থাকতে চান, নিজের হোনাল্লি গ্রামে একটি ছোট্ট কুঁড়েঘরে থাকেন তিনি। একেবারেই আড়ম্বরহীন জীবনযাপন। পরিবেশ রক্ষার চেষ্টায় সারাটা জীবন নিরলস পরিশ্রম করে চলেছেন। প্রথমে নিজের এলাকা, তারপর নিজের রাজ্য, তারপর অন্য রাজ্যে। এমনকি বন দফতরকেও সাহায্য করেছেন তাঁর অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান দিয়ে।
তুলসীর হৃদয় জুড়ে রোপিত হয়ে আছে প্রকৃতি, অরণ্য ও বৃক্ষের প্রতি প্রেম। প্রত্যন্ত এলাকাকে সবুজে আচ্ছাদিত করাই তাঁর জীবনের মূলমন্ত্র। তাঁর কাছে বনের গাছপালাই সংসার, আর প্রতিটি চারা গাছই তাঁর কাছে সন্তানের মতো। এই নিয়েই বেশ আছেন তুলসী। তাঁর রোপিত ৩০ হাজার গাছই আজ আশ্রয় হয়েছে বহু প্রাণের স্পন্দনের।
(মতামত লেখকের ব্যক্তিগত। ফিচার ছবি গুগল থেকে নেওয়া)