সমীর ঘোষ

 

 

 

নিজের নামের সঙ্গে তাঁর বোধহয় নিয়ত দ্বন্দ্ব ছিল।

যদিও অন্ত শব্দবন্ধেই সাধারণ্যে তিনি পরিচিত। তবু সেই চেনা ‘বিদ্যাসাগর’-এর আগে মূল নাম, ‘ঈশ্বরচন্দ্র’। এবং এও ঠিক, ঈশ্বরের কোনও সংসর্গে তিনি ছিলেন না।

ঈশ্বরপ্রতিম এক প্রবাদ পুরুষ, বীরসিংহের পুরুষ বিক্রম, কখনও আবার করুণা সাগর বা দয়ার সাগর, আদ্যন্ত রক্তমাংসের মানুষ।

তাঁর সমগ্র জীবন তাই ঘটনার সংবর্তে উথালপাথাল। তা তাঁর মাত্র আট বছর বয়সে রাজপথে মাইলফলক দেখে সংখ্যা শিখে যাওয়া থেকে শুরু করে কার সাহেবের বুট জুতো পরা পা টেবিলের উপর তোলার বদলে তাঁর প্রতিস্পর্ধী চটিশুদ্ধ পা তোলা, সংস্কৃত কলেজে অব্রাহ্মণ ছাত্রদের ভর্তি করা থেকে বিধবা বিবাহকে আইনসম্মত করা বা বহু বিবাহ রোধ, কত না উদাহরণ !

এবং শুধু উদাহরণ? গল্পে নয়, একটি মানুষের জীবনের গাথা এত বিচিত্র, এত বিপুল হতে পারে, বিশেষত ঈর্ষাকাতর অলস বাঙালি জীবনের ক্ষেত্রে, ভাবলে বিস্মিত হতেই হয়।

বরং আসা যাক কিছু প্রত্যক্ষতায়। একজন যৌনকর্মীর ছেলেকে হিন্দু কলেজে ভর্তি নেওয়া হয়। কলেজের পরিচালন সমিতি ঘোর বিরোধী। সে কী? সমাজ বলে একটা কথা আছে তো! কমিটির কয়েকজন সদস্য চাইলেন, সেই ছাত্রটিকে টি.সি. দিয়ে বিদায় করতে। কিন্তু বাদ সাধলেন বিদ্যাসাগর। তিনি তখন এডুকেশন কাউন্সিলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন সদস্য। তিনি কমিটির এই অন্যায় সিদ্ধান্তে ভীষণ অসন্তুষ্ট। তিনি জানালেন- ‘মা দুশ্চরিত্রা হ‌ইতে পারে, কিন্তু পুত্র কি দোষ করিল যে সে বিদ্যালয়ে পড়িতে পাইবে না?’ কমিটি বা সমাজ কেউই এর উত্তর দিতে পারেনি।

সংস্কৃত কলেজে অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি ছিলেন। সামান্য একটি বিষয়ে মতবিরোধ হল। বিদ্যাসাগর পদত্যাগ করলেন। এমন অবস্থাও হয়েছে যে, তিনি বলছেন যে, দরকার হলে বাজারে আলু-পটল বিক্রি করবেন কিন্তু আদর্শের প্রশ্নে কোনও আপস করবেন না।

তাঁর পিতৃদেব তখন কাশীবাসী। একদল শীর্ষস্থানীয় ব্রাহ্মণ অর্থ সাহায্যের জন্য তাঁর দ্বারস্থ হলেন। ব্রাহ্মণদের কথা ছিল বড় বা নামকরা লোক কাশীদর্শনে এলে দান করাই রেওয়াজ। বিদ্যাসাগরের স্পষ্ট উত্তর- ‘আমি কাশী দর্শনে আসিনি, পিতৃ দর্শনে এসেছি। আপনারা যত প্রকার কুকর্ম করা যায়, তা করে দেশত্যাগ করে কাশীবাস করছেন। … আমার বিশ্বেশ্বর ও অন্নপূর্ণা পিতৃদেব ও জননী।’

নিজের মর্যাদাবোধ এত তীব্র ছিল যে, এশিয়াটিক সোসাইটি পরিদর্শনের জন্য এইচ.এফ. ব্ল্যানফোর্ড তাঁকে আমন্ত্রণ জানালে তিনি চটি পরে স্বপরিচ্ছদে গেলে তাঁকে যখন সেখানে ঢুকতে দেওয়া হল না, তিনি এমন একটি চিঠি লিখলেন যার দ্বারা বোঝা যায়, পরাধীন দেশে দাসসুলভ বাঙালির মধ্যে তিনি ছিলেন, ইস্পাতদৃঢ় অনমনীয় তেজস্বী সিংহবিক্রম ।

‘যদি ইংরেজী ধরনের জুতো পরে গেলে জুতো পরেই ভেতরে যেতে দেওয়া হয়, তাহ’লে এক‌ই শ্রেণীর মানুষকে দেশীয় চটি পরে আছেন বলে, চটি পরে ভেতরে কেন যেতে দেওয়া হবে না, তা আমার বোধগম্য হয়নি।’ এখানে শুধু জুতো বা চটির প্রশ্ন গৌন। ‘নেটিভ’ জাতির উচ্চ-শির, এক স্বাধীন সত্তার রুখে দাঁড়ানোর স্পষ্ট স্বর প্রতিধ্বনিত।

হরপ্রসাদ শাস্ত্রী আবার আর এক রকম সাক্ষী দিচ্ছেন। ‘বিদ্যাসাগরের মনুষ্যত্বে একটু আঘাত দিবামাত্র যেমন লৌহের সংঘর্ষণে চকমকির অগ্নুৎপাত হয়, সেইরপ বিদ্যাসাগর…..।’ বিদ্যাসাগর একবার বলেছিলেন, ‘ভারতবর্ষে এমন রাজা নাই এই চটি শুদ্ধ টক করিয়া লাথি না মারিতে পারি ।’ হরপ্রসাদের মন্তব্য এক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যে, ‘চটিযুক্ত পা খানার যে মূল্য ছিল, ভারতবর্ষের সমুদয় রাজাগুলোর মুকুট শোভিত মস্তক বিক্রয় করিলেও সে মূল্য হয় না।’

অন্যত্র, ছোটলাট ইডেন সাহেব গাড়িতে যাওয়ার পথে বিদ্যাসাগরকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমাকে চিনতে পারেন? আমি ইডেন!’ বিদ্যাসাগরের ইঙ্গিতপূর্ণ অথচ তির্যক উত্তর ,’ তুমি আগে পাতলা ছিলে এখন মোটা হ‌ইয়াছ, কি করিয়া চিনিব’? সেই সময়ে ভারতীয়তাকে উপেক্ষা করা এবং ভারতীয় মর্যাদাকে নীচু করে রাখার যে মনোভাব ইংরাজ সিভিলিয়ানদের ছিল, তার‌ই বিরুদ্ধে এক দৃঢ় মনোভাব গড়ে তুলেছিলেন বিদ্যাসাগর। কিন্তু সারাজীবন আপসহীন সংগ্রামশীল এই মানুষটির আদ্যশ্রাদ্ধ না করলে, পিণ্ডি না চটকালে এক শ্রেণির বাঙালির ভাত হজম হত না।

তাঁর জীবনের মুখ্য উল্লেখযোগ্য কাজ বিধবা বিবাহ। যেদিন সুকিয়া স্ট্রিটে জাঁকজমকের সঙ্গে প্রথম বিধবার বিবাহ দেন, সে দিন ১০/১৫ হাত অন্তর পুলিশ প্রহরায় তা সম্পন্ন হয়। বহু লোকের সামাজিক শাসন, তর্জন-গর্জন, অত্যাচার, নিপীড়নকে তিনি তোয়াক্কাই করেননি। তাঁর প্রাণ সংশয় ছিল। এতদসত্ত্বেও প্রায় আটশো লোক বিবাহে নিমন্ত্রিত ছিল। শুধু বিধবা বিবাহের বাস্তব রূপায়নে তাঁর ঋণ হয়ে গিয়েছিল আশি হাজার টাকা। জানা যায় যে, মুর্শিদাবাদের কান্দির রাজা প্রতাপচন্দ্র সিংহ তাঁকে বিরাট অর্থ সাহায্য করেছিলেন‌।

এটা ঠিক যে, বহু বিবাহের বিরুদ্ধে আইন করার ক্ষেত্রে তাঁর সংগ্রাম সফল হয়নি। এবং ব্যক্তিজীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতা আর প্রবল বিপর্যয় তাঁকে ক্লান্ত অভিমানাহত করেছিল‌। যে জন্য বিহারের জামতাড়া এবং মধুপুরের মাঝে কার্মাটার আদিবাসী অধ্যুষিত এক গ্রাম প্রকৃতির নির্জন মনোরম পরিবেশে তিনি জীবন কাটাতে চাইলেন। স্বাস্থ্যগত কারণে কেবলমাত্র নয়, বাংলা এবং বাঙালিকে তাঁর বড় অসার বলে মনে হয়েছিল।

রবীন্দ্রনাথ বলেছেন- ‘ বাধাই যে দেশের দেবতা সে দেশ এই মহাপুরুষদের সন্মান করতে জানে না।’ উত্তরপাড়া বালিকা বিদ্যালয় পরিদর্শনে যাওয়ার পথে বিদ্যাসাগর আর মিস্ কারপেন্টার- এর ঘোড়ার গাড়ি পথে উল্টে গেলে তাই বিষাদ নয় যেন স্বস্তির সুরই বেজে গেছে ‘বেঁচে থাক বিদ্যাসাগর’-এর শেষেঃ ‘উত্তরপাড়া স্কুল যেতে,বড়‌ই রগড় হলো পথে/এটকিনসন উড্রো আর সাগর সঙ্গেতে। নাড়াচাড়া দিলে ঘোড়া মোড়ের মাথাতে,/গাড়ি উল্টে পল্লেন সাগর, অনেক পুণ্যে গেছেন বেঁচে’।’

কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় তাঁর ‘লাগস‌ই’ কবিতায় লিখেছেন আর একটু অন্যরকম ভাবেঃ

‘যেহেতু ঈশ্বরচন্দ্র বাস্তবিক ছিলেন না ঈশ্বর

তাঁকে ধরা যেত

মানুষের দুঃখ দেখলে হতেন কাতর।’

রক্তমাংসের এক মানুষ। কালে কালে মুণ্ডছেদ করি আমরা কেউ না কেউ। আবার কেউ বা মূর্তি গড়ে ফুলমালা দিই। ঈশ্বর নন, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মুচকি হাসেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here