কার্তিক ভট্টাচার্য

বাতাসে কান পাতলে আজকাল শিক্ষকদের সম্পর্কে কত কথাই না শোনা যায়! সে সব ঠিক না ভুল, উচিত না অনুচিত সে বিতর্কে যাচ্ছি না। নিজেও দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেছি। এখন আমার বয়সও প্রায় পঁচাত্তর। আজ আমার এক শিক্ষকের কথা বলব আপনাদের।
ধোড়াদহ রজনীকান্ত উচ্চ বুনিয়াদি বিদ্যালয়ের প্রথম প্রধানশিক্ষক তারা প্রসাদ সান্যাল। জন্ম ১৯৩৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি। বীরভূমের তারাপীঠে। তারাপীঠে জন্ম, তাই দাদামশাই শান্তনাথ ভট্টাচার্য নাতির নাম রাখেন তারা প্রসাদ। বাবা অনিলকুমার সান্যাল ছিলেন দোগাছি প্রাথমিক স্কুলের প্রধান শিক্ষক। গ্রামে সেই সময় কোনও হাইস্কুল না থাকায় তারা প্রসাদকে ভর্তি হতে হয় মুর্শিদাবাদে আমতলা হাইস্কুলে। পরে বহরমপুরে মামাবাড়িতে থেকে বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজে সংস্কৃতে অনার্স-সহ বিএ পাশ করেন। পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে এমএ।
বরাবরই ভালো ছাত্র ছিলেন তারা প্রসাদ। বাম আদর্শে বিশ্বাসী তারা প্রসাদ উত্তর ২৪ পরগনার বাণীপুরে পিজিবিটি পড়ার সময় শিক্ষাবিদ ড. হিমাংশুবিমল মজুমদারের নজরে পড়েন। সেখানে সরকারি বেসিক কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন। ইতিমধ্যে ধোড়াদহের ভূমিপুত্র ড. নলিনাক্ষ সান্যাল ধোড়াদহে রজনীকান্ত উচ্চ বুনিয়াদি বিদ্যালয়ে সব ব্যবস্থা পাকা করে ফেলেছেন। তারা প্রসাদকে নলিনাক্ষ বলেন, ‘‘পুনু (তারা প্রসাদের ডাকনাম) গাঁয়ে হাইস্কুল হচ্ছে। তোকে হেড মাস্টারি করতে হবে।’’ নলিনাক্ষ সান্যালের কথার উপর কথা বলার সাহস ছিল না কারও। তবুও আদর্শবাদী শিক্ষক তারা প্রসাদ ভয়ে ভয়েই বলেছিলেন, ‘‘হিমাংশুদার সঙ্গে বেইমানি করা হবে না?’’
নলিনাক্ষ বলেছিলেন, ‘‘ও সব আমি হিমাংশুকে বলে ঠিক করে নেব। তোর চিন্তা নেই।’’ তারপর থেকে আমার শিক্ষক নিজের গাঁয়ের আশেপাশের ছেলেমেয়েদের মানুষ করার দায়িত্ব নেন। ১৮ জন ছেলেমেয়ে নিয়ে ১৯৬১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি রজনীকান্ত উচ্চ বুনিয়াদি বিদ্যালয় পথচলা শুরু করে। সরকারি চাকরি ছেড়ে তারা প্রসাদ প্রধান শিক্ষক হিসেবে ওই স্কুলে যোগ দেন ৪ ফেব্রুয়ারি। অবসরও নিয়েছেন এই স্কুল থেকেই।
আমার শিক্ষক তারা প্রসাদের কাছ থেকেই শিখেছি সময়ানুবর্তিতা, কর্তব্য, নিষ্ঠা। তিনি মনে করতেন এগুলো শিক্ষারই অঙ্গ। ক্লাসে গল্পের ছলে তিনি নানা কঠিন বিষয় সহজেই বুঝিয়ে দিতেন। সময় সম্পর্কে ভীষণ সচেতন ছিলেন তিনি। সাড়ে ৭টা মানে তাঁর কাছে ৭টা ৩০। ৭টা ৩১ নয়। একবার নাটকে ঠিক সময়ে দর্শক এসে পৌঁছয়নি। কিন্তু তিনি নাটক শুরু করেছিলেন সময়েই। তিনি মাঝেমধ্যেই বিতর্ক, আলোচনাসভাতে আমাদের যোগ দিতে বলতেন। বলতেন, ‘‘এ সবের মধ্যে দিয়ে না গেলে প্রকৃত শিক্ষা অধরা থেকে যায়।’’
প্রধানশিক্ষক হয়েও গ্রামে গ্রামে গিয়ে ছাত্র সংগ্রহ করে এনে স্কুলে ভর্তি করিয়েছেন। পুস্তক বিক্রেতাদের দেওয়া বই বিলিয়ে দিতেন দুঃস্থ পড়ুয়াদের মধ্যে। স্কুলে বুক-ব্যাঙ্ক চালু করেছিলেন। তাঁর শেখানো পথেই চলেছি। এখনও চলছি। আমার সাহিত্যচর্চায়ও তাঁর অবদান কখনও ভুলব না। ধোড়াদহে তিনি নিজে নাটকের একটা দল গড়েছিলেন। স্কুল সেরে বাড়ি ফিরে বসতেন শখের হোমিওপ্যাথ দাতব্য চিকিৎসালয়ে।
তারা প্রসাদ শেষ জীবনটা কাটিয়েছেন করিমপুরের বাড়িতে। আমার শিক্ষকের সঙ্গে সারাজীবন একটা ফেব্রুয়ারি-যোগ ছিল। জন্ম ১২ ফেব্রুয়ারি। প্রধান শিক্ষক হিসেবে স্কুলে যোগ দেন ৪ ফেব্রুয়ারি। স্কুল থেকে অবসর নেন ৪ ফেব্রুয়ারি। এবং পৃথিবী থেকে অবসর নেন ২০০৪ সালে। তারিখ? ৪ ফেব্রুয়ারি!
(কৃতজ্ঞতা— উর্বি সান্যাল)