সুদীপ্তকুমার চক্রবর্তী

 

 

একজন তথাকথিত বিদ্বান মানুষের পাণ্ডিত্যে সন্দেহ প্রকাশ করায় লকডাউন-এর অখণ্ড অবসরে হোয়াটসঅ্যাপের একটি গ্রুপে জোর লড়াই জমে উঠেছে। কেউ কাউকে এক ইঞ্চি জমি ছাড়ছেন না এবং পরস্পরকে বিদ্ধ করছেন তির্যক বাক্যবাণে। করোনার আতঙ্কে যখন আমাদের অস্তিত্বই সঙ্কটাপন্ন, তখনও দেখছি অহং-এর কিছুমাত্র নাশ হয়নি আমাদের। অহং হল সেই ক্ষুদ্র, নিকৃষ্ট ‘আমি’ যে সর্বাবস্থাতেই মান অপমানের দ্বন্দ্বের দোলায় দোলায়মান। ‘দেখো আমি কত জানি’ আর ‘আমিই বা কম কিসের’ লড়াই প্রতি পদে পদে। অথচ সত্যিকারের জ্ঞানী ব্যক্তিরা প্রত্যেকেই যেন অহংশুন্যতার জীবন্ত বিগ্রহ।

একটি ঘটনার কথা বলি। রামকৃষ্ণ মিশনের প্রথম প্রকাশ্য সেবা কার্যের কাণ্ডারী, শ্রীরামকৃষ্ণের অন্যতম সন্ন্যাসী শিষ্য স্বামী অখণ্ডানন্দ একবার কলকাতার খাদি ভান্ডার দেখতে গিয়েছিলেন। খাদি ভান্ডার ছিল তখন অ্যালবার্ট হলের নীচের তলায় একটি ঘরে। স্যর পি সি রায় তখন সেখানে হাজির। খাদি প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলছিলেন তিনি । কথা বলার সময় স্যর পি সি রায় মাঝে মাঝে ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করছিলেন। বাংলার মাঝে মাঝে ইংরেজি বলা পূজনীয় মহারাজ পছন্দ করতেন না। কিছুক্ষণ পি সি রায়ের কথা শোনার পরে মহারাজ বললেন, “রায়মশাই আপনার ভাষাটাকে একটু খদ্দর করে ফেলুন।” এতটুকু বিরক্ত হলেন না স্যর পি সি রায়। অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বললেন,” স্বামীজি, আপনি যা বলছেন তা ঠিক কথাই। আমাদের ইংরেজিতে পড়িয়ে পড়িয়ে বাংলা বলার সময়ও মাঝে মাঝে ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করার এই অভ্যাসটি রয়ে গেছে।” কতদূর অহংশূন্য হলে অত উঁচু পর্যায়ে অবস্থান সত্ত্বেও এমন অকপট হওয়া যায়, ভাবলেই চমকে উঠি।

অহং যেন এক অদৃশ্য ভাইরাস যাকে যথাকালে বিনাশ করতে না পারলে মানুষকে সে দগ্ধ করে পলে পলে। অহর্নিশি তীব্র দহন জ্বালায় জ্বলতে জ্বলতে অহঙ্কারী মানুষ শান্তি পায় না এক মুহূর্তের জন্যেও। অন্য মানুষের সঙ্গে দূরত্ব বেড়ে যায় কয়েক যোজন, ‘সোশ্যাল ডিস্টান্সিং’ এর জন্য আর ভিন্ন করে চেষ্টা করতে হয় না। অথচ যাঁরা প্রকৃতই উঁচুদরের মানুষ, এই বিষম ব্যাধি তাঁদের গ্রাস করতে পারে না। তাঁরা কাজ করেন অন্তরের তাগিদে, যেমনটি করেছিলেন অপরাজেয় কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। স্বামী অখণ্ডানন্দ ছিলেন সারগাছি আশ্রমের রূপকার। বলতেন, “সারগাছি আমার প্রাণ।” মানুষ-ভগবানের সেবা-পূজায় নিজেকে তিল তিল করে নিবেদন করতে করতে ১৯১৭ সালে অত্যন্ত অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। চিকিৎসার জন্য তাঁকে জোর করে সারগাছি আশ্রম থেকে কলকাতার বলরাম ভবনে এনে রাখা হয়। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের খ্যাতি তখন মধ্যগগনে। অসুস্থ সন্ন্যাসীকে দেখার জন্য স্বয়ং তিনি বলরাম ভবন এসে হাজির। পূজনীয় মহারাজকে দেখার পরে তিনি বললেন,” দেখুন, আমি সাধু-সন্ন্যাসী দেখতে আসিনি। শুনেছি, আপনি মানুষকে ভালবাসেন, চাষার কুটিরে কুটিরে গিয়ে তাদের সেবা করেন, লেখাপড়া শেখান। তাই আপনাকে দেখতে এসেছি।” কী অসাধারণ ঔদার্য! কী অপূর্ব অহমশূন্যতা ।

আমিত্বের থাবা সর্বত্র প্রসারিত, এমনকি সেবা ক্ষেত্রেও। সেখানে আমিত্ব দেখা দেয় আত্মপ্রচার রূপে। কিন্তু সেই সেবা যদি পূজা মূর্তি ধরে তখন আর সমস্যা থাকে না। ঠিক এই কারণেই স্বামী অখণ্ডানন্দ রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের তৃতীয় অধ্যক্ষ রূপে নির্বাচিত হওয়ার পরে যখন কলকাতার তাবড় তাবড় সংবাদপত্রগুলি তাঁর সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্য বেলুড়মঠে ভিড় জমায়, তিনি কিছুতেই সাক্ষাৎকার না দিয়ে বলেছিলেন, ” তোমরা কি বিজ্ঞাপন দিয়ে পূজা করতে বস?” সেবা আর পূজা সমার্থক হলেই সম্ভব হয় এমন অহঙ্কারশূন্যতা।

ক্ষুদ্র আমিত্ব নাশ হলে ভেদবুদ্ধি দূর হয়ে যায়, ঘুঁচে যায় সংকীর্ণ ভাবগুলো আর বহুর মধ্যে তখন এক-এর সন্ধান পাওয়া যায়। ডাক্তার আব্দুল্লাহ সুরাবর্দীর একটি মন্তব্যই এর প্রমাণ। স্যর আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতে স্বামী অখণ্ডানন্দের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল ডা. সুরাবর্দীর। একসঙ্গে ফেরার পথে ডা. সুরাবর্দী স্বামী অখণ্ডানন্দকে বলেন, “আপনাদের ঠাকুর এসেছিলেন এবং স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর উদার সর্বধর্ম সমন্বয় প্রচার করেছেন বলেই আজ মুসলমান হয়েও আমার মন্দির ও মসজিদের ভেদবুদ্ধি ঘুঁচে গিয়েছে।” কী অনন্য উদারতা! শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে যায়।

অথচ এই মাথা নত করতে বললেই বড় গোল লেগে যায়। বাধা হয়ে এসে দাঁড়ায় প্রবল আত্মম্ভরিতা। জানি অহঙ্কার ভালো নয়, তবু মাথা নিচু করতে বড় বাধে, তবু শিথিল হয়না মুষ্ঠি। তাই কদিন আগে মুদির দোকানের সামনে এক বয়স্ক মানুষের মানিব্যাগ থেকে কয়েকটি কয়েন পড়ে যাওয়ার পরে নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে থাকা আমরা কেউই নিচু হয়ে তাকে সাহায্য করতে পারিনি। মনের ভিতর কোথায় যেন একটা বাধা কাজ করছিল। এরই নাম অহঙ্কার।

অথচ বিশ্ববিজয় করে ফেরার পরে স্বামী বিবেকানন্দের মতো মানুষের এতটুকু সমস্যা হয়নি একটি নিতান্ত বালকের সামনে মাথা নিচু করতে। ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দ। স্বামী বিবেকানন্দ গিয়েছেন দেওঘরে হাওয়াবদলের জন্য। দেওঘর হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক যোগীন্দ্রনাথ বসু ছিলেন স্বামীজীর সহপাঠী। একদিন তাঁর ছাত্রদের ডেকে তিনি বললেন, ” বিশ্ববিশ্রুত স্বামী বিবেকানন্দ এখন দেওঘরে। যাও তাকে প্রণাম করে এসো। জীবন সার্থক হবে।” একদিন বিকেলে স্বামীজি হাঁটছেন দেওঘরের রাস্তায়। ছাত্ররা গেল তাঁকে প্রণাম করতে। সেই সময় স্বামীজি লক্ষ্য করলেন, একটি ছোট্ট ছেলের জুতোর ফিতেটি ঠিকমতো বাঁধা নেই। স্বামীজী তাকে ইশারায় জুতোর ফিতেটি ঠিকমতো বেঁধে নিতে বললেন। ছেলেটি জানাল তার অক্ষমতার কথা। স্বামীজী নিজেই তখন নিচু হয়ে বসে ছেলেটির জুতোর ফিতে বেঁধে দিলেন। একটি ছোট্ট স্কুলের বাচ্চার জুতোর ফিতে বেঁধে দিলেন বিশ্বজয়ী স্বামী বিবেকানন্দ। এরপরে আর কোনও কথা চলে না।

(লেখক সারগাছি রামকৃষ্ণ মিশন উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক)

তথ্য ঋণ:

১) স্বামী অখণ্ডানন্দ: স্বামী অন্নদানন্দ

২) স্বামী অখণ্ডানন্দের স্মৃতি: স্বামী বীরেশ্বরানন্দ

 

(ছবি গুগল থেকে নেওয়া)