স্বর্ভানু সান্যাল ● শিকাগো

 

 

বাড়ি আসছেন গৌরী। যিনি স্বয়ং “বিশ্বস্য বীজং পরমাসি মায়া”, তিনিই আবার আমাদের বাড়ির মেয়ে উমা। সম্বচ্ছরের মতো ঘরে ফিরছে বাড়ির মেয়ে। অন্য বছর এই সময় নিউ ইয়র্ক থেকে নভি মুম্বই, শিকাগো থেকে কলকাতা অপূর্ব কর্মপ্রেরণায় মেতে উঠত। মাতৃ আরাধনার আয়োজনে প্রাণপাত করত বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা আপামর বাঙালি। কিন্তু এ বছর সে আড়ম্বর নেই। সভ্যতার জয়রথের গৌরবে অন্ধ কপিধ্বজার গতি প্রতিহত করেছে দর্পহারী অদৃশ্য এক জীবাণু। স্বেচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায়, সকলেই মেনে নিয়েছেন এই নব্য স্বাভাবিক অবস্থান। কিন্তু তা বলে কি বাঙালি হাত গুটিয়ে বসে থাকবে? যিনি সমস্ত জগত সংসারে প্রাণসঞ্চার করেন সেই শক্তিভূতা সনাতনী আমাদের সহায়। অতএব নিরাপত্তাবিধি মেনেই এ বারের পুজো আমাদের শিকাগোয়। এবার পুজো ভার্চুয়াল। করোনা সংক্রমণের সম্ভাবনাকে কাঁচকলা দেখিয়ে শিকাগোর বাঙালি যাতে পুজোর স্বাদ নিতে পারে, তার জোরদার প্রস্তুতি চলছে।

বাঙালি-প্রাণে ছুটির ঢাক-কুড়কুড় বাদ্যি বেজে ওঠে মহালয়ার দিন থেকে। মায়ের আগমন বার্তায় সমুজ্জ্বল হয়ে ওঠে বাংলার মুখ। বেঙ্গলি অ্যাসোশিয়েশান অফ গ্রেটার শিকাগো গত চল্লিশ বছর ধরে লাইভ মঞ্চস্থ করে আসছে মহালয়া অনুষ্ঠান। সুব্রত মুখার্জীদার উদাত্ত গলায় চণ্ডীপাঠ বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কথা মনে করিয়ে দেয়। এতদিনের ঐতিহ্য বন্ধ হতে দেওয়া যায় না। বয়স্ক মানুষগুলিকে ফিজিকালি মিট করানো প্রশ্নাতীত। এ দিকে জুম মিটিং করে কোরাস গান রেকর্ড করলে ইন্টারনেট ল্যাগের জন্য তার গুণগত মান ঠিক হবে না। অতএব ঠিক করা হল, প্রথমে কিবোর্ডে ট্র্যাক প্রডিউস করা হবে। তবলার ট্র্যাকও আলাদা করে রেকর্ড করা হবে। সেই মার্জড ট্র্যাক পাঠানো হবে সকল গায়ক গায়িকাকে। প্রত্যেক গায়ক গায়িকা ট্র্যাক কানে শুনে ইন্ডিভিজুয়াল ভয়েস রেকর্ডিং পাঠাবেন। সাউন্ড মিক্সিং, মাস্টারিং করবে বিএজিসি পরিবারেরই সদস্য সত্য। তারপর জুম মিটিং করে রেকর্ড করা হবে প্রতিটা গানের লন-সিঙ্ক ভিডিয়ো। তারপরে জোড়া হবে সেই লিপ-সিঙ্ক ভিডিয়ো আর মাস্টারড অডিও স্ট্রিম। সঙ্গে থাকবে ভিডিয়ো এফেক্ট।

ভিডিয়ো এডিটিং করবে বিএজিসি পরিবারের সদস্য ভাস্কর চক্রবর্তী। প্রজেক্টটির জটিলতা বা কম্লেক্সিটি সহজেই অনুমেয়। কিন্তু স্বয়ং মা সহায়। চিন্তা কী? অনেক বাধা বিঘ্ন পেরিয়ে অবশেষে প্রোডিউস হল সেই ভিডিয়ো মহালয়া অনুষ্ঠান। অন্য মহালয়া ভিডিয়ো প্রোডাকশানের সঙ্গে এর পার্থক্য হল, এটি শতকরা একশো ভাগ ঘরের মানুষদের নিয়ে। ভাষ্য এবং মন্ত্রপাঠ করেছেন বিএজিসির ফাউন্ডিং মেম্বার সুব্রত দা। গান করছেন শিকাগোর বহুদিনের বাসিন্দা বাচ্চুদা, পাপড়িদি, মল্লিকাদি, দীপালিদি, সুপ্রিয়দা, সোমাদি। কিবোর্ডে সত্য আর তবলায় মানবদা। সেই অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচারিত হল বিএজিসি লাইভ ইউটিউব চ্যানেল আর ফেসবুক লাইভে।

এই মহালয়া টিমের অনেকেই এ দেশে এসেছেন ষাটের দশকের শেষের দিকে। সিক্সটি ফাইভের ইমিগ্রেশান অ্যাক্ট-এ “এক্সেপশানাল এবিলিটি ইন সায়েন্স টেকনোলজি অ্যান্ড মেডিসিন” করে এসেছেন। তখন এখনকার মতো বাঙালি হয়ে বাঁচার সুযোগ সুবিধে ছিল না। এখন যেমন সন্তোষী মা-র মূর্তি, তুলসী গাছ থেকে থেকে চ্যবনপ্রাশ সবই পাওয়া যায় বাড়ি থেকে পাঁচ মাইলের মধ্যে, তখন এমনটা ছিল না। সুব্রতদা গল্প করছিলেন, “তখন তো এখানে শাড়ি পাওয়া যেত না, এ দিকে আমার উনি শাড়ি ছাড়া কিছু পরবেন না। উলওয়ার্থ বলে একটি ফেব্রিকের দোকানে দেখলাম, ভাল ভাল ছিট পাওয়া যাচ্ছে। তখন তো আমরা মাত্র কয়েকজন বাঙালি। আমরা ঠিক করলাম, এই ছিট চার পাঁচ গজ করে কিনে নাও। তারপর দুটো পিস সেলাই করে শাড়ি বানিয়ে নাও।” গল্প বললেন প্যাটেল ব্রাদারস-এর, যে প্যাটেল ব্রাদারস কিনা উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ মিলিয়ে এখন থ্রি হান্ড্রেড মিলিয়ন ডলার ইন্ডিয়ান গ্রসারি স্টোর।

সত্তরের গোড়ার দিকে, ওঁরা দু চার জন বন্ধু ডেভন থেকে রজারস পার্কের দিকে যাচ্ছেন। হঠাত খাকি হাফ প্যান্ট আর গেঞ্জি পরা এক ভদ্রলোক বলছেন, ইধার আও ইধার আও। কী ব্যাপার? না তিনি একজন গুজরাটি এবং আফ্রিকান উদ্বাস্তু। কেনিয়া থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি আমেরিকা এসেছেন এবং এখানে গ্রসারি স্টোর খুলবেন। অর্ডার দিলে বাড়ি বাড়ি ঘুরে পৌঁছে দেবেন গ্রসারি সামগ্রী। সেই থেকে শুরু। এভরি গ্রেট ভেঞ্চার হ্যাজ এ হাম্বল বিগিনিং। আমেরিকায় বঙ্গ-জীবন শুরুর এই মানুষগুলি যেমন আমেরিকান মেইন স্ট্রিমে মেশার চেষ্টা করেছেন, তেমনি ধরে রেখেছেন নিজেদের ঐতিহ্যকে। তাই বছর বছর করেছেন লাইভ মহালয়া, দুর্গাপুজো। এখন শুধু শিকাগোর পুজোতেই তিন হাজার লোক হয়।

এ বছরের সম্পূর্ণ ডিজিটাল পুজোর শুভ সূচনা মহালয়া ডিজিটাল প্রোডাকশান দিয়ে। করোনার কটাক্ষকে উপেক্ষা করে এ প্রচেষ্টা আসলে মানবতার জয়গান। মানুষকে সংজ্ঞায়িত করে তার ঐতিহ্য। তাই ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরে থাকি আমরা। করোনার আক্রমণে পর্যুদস্ত আমাদের জনজীবন। সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় দ্বীপের মতো আমাদের অবস্থান আজ। সেই সত্যকে উপেক্ষা না করে, বয়স্ক মানুষগুলিকে বাড়ির বাইরে পা রাখতে না দিয়ে একটি প্রফেশানাল গ্রেড প্রোডাকশান করার মধ্যে মানুষের জীবনীশক্তি ও উদ্ভাবনী শক্তির যে স্পষ্ট প্রকাশ আছে তা বলে যায়, ঠিক যেমন “এই পৃথিবীর রণ, রক্ত, সফলতা সত্য; তবু শেষ সত্য নয়। কলকাতা একদিন কল্লোলিনী তিলোত্তমা হবে”, তেমনই এই ভাইরাস ও অতিমারি সত্য তবে শেষ সত্য নয়। একদিন জীবনের জয় হবে। হবেই। বিবেকানন্দের ঐতিহাসিক-শিকাগোয় আজকের বাঙালিরা সেই ব্রতেরই আরাধনা করছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here