প্রসূন আচার্য

এ বঙ্গের বাঙালি সামান্য ব্যাপারেই বড় উদ্বেল হয়। কিছুটা আমোদগেঁড়েও বটে! আপনারা আর কবে বুঝবেন মাননীয়ার বিরাট মনের উদারতার ‘গোপন’ কথাটি। সাড়ে ১০ বছর তো হয়ে গেল!
বিধানসভার উপ-নির্বাচনে বিজেপির প্রার্থী হয়ে তৃণমূলকর্মীদের কাছে লাথি খেয়ে কচুবনে লুটিয়ে পড়া জয়প্রকাশ মজুমদার আজ তৃণমূলে যোগ দেওয়ায় তাঁকে নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক খিল্লি হচ্ছে। জয়প্রকাশবাবুর ওই লাথি খাওয়ার ছবি ভাইরাল হয়েছে। মোবাইলে মোবাইলে ঘুরছে। আবার দেখলাম, তথাগত রায় বলছেন, লোক ‘ফিট’ করে পয়সা দিয়ে ও, মানে জয়প্রকাশবাবু লাথিটা নিজেই মারিয়ে ছিলেন! হিন্দি সিনেমায় দেখেছি, ভোটে পাবলিক সেন্টিমেন্ট পেতে দুষ্টু মন্ত্রী লোক ‘ফিট’ করে নিজের পায়ে বা সামনের টেবিলে গুলি মারায়। ব্যাপারটা যেন তেমন আর কি!
আমার কিন্তু মনে হয় তা নয়। সেদিন সত্যি সত্যিই তৃণমূলের কর্মীরা কষে লাথি মেরেছিলেন জয়প্রকাশকে। কিন্তু দলে কোণঠাসা জয়প্রকাশবাবু আর কী-ই বা করতেন? ঠিকই করেছেন। তৃণমূলে গিয়ে পাঁচ মিনিটে পদও পেলেন!
আচ্ছা, এত বড় বড় কথা বলে ভোটে দিদিমণি আর তাঁর ভাইপোর বিরোধিতা করে যদি সব্যসাচী দত্ত, রাজীব ব্যানার্জি, এমনকি মুকুলবাবুও আবার নতজানু হয়ে তৃণমূলে ফিরতে পারেন, কোন যুক্তিতে জয়প্রকাশবাবু তৃণমূলে যেতে পারবেন না, বলতে পারেন ?
আপনারা ঋতব্রতর কথা ভুলে গেলেন? আমি নিজে কানে কালীঘাটের বাড়ির কাছে তাঁর চোখা চোখা বাক্যবাণ শুনেছি। তিনি তখন সিপিএমের ফায়ার ব্র্যান্ড ছাত্র নেতা। বুদ্ধ ভট্টাচার্য, সীতারামের চোখের মণি ঋত শুধু অল্প বয়সে রাজ্যসভায় গেলেন তাই নয়, দিল্লিতে অমিত মিত্রর ধুতি একটানে খুলে দিলেন! তাই নিয়ে বাংলায় কী উত্তাপ! সেই উত্তাপে সিপিএমের বহু পার্টি অফিস পুড়লো। কত লোক মার খেল। তারপরে বালিশ চাটা কেস। ঋতর বিরুদ্ধে কলকাতায় তৃণমূলের মিছিল। শেষ অব্দি মান বাঁচাতে ঋতকে বহিষ্কার। এই দুর্মূল্যের বাজারে সিপিএমের একটা এমপি গেল!
কিন্তু … কিন্তু কী অদ্ভুত দেখুন। সেই ঋত এখন তৃণমূলের সম্পদ। শ্রমিক ইউনিয়নের প্রধান কাণ্ডারী। আবার দেখুন মানস ভুঁইয়া। ২০১৬ সাল‌ে ভোটের সময় থেকেই তাঁর বিরুদ্ধে খুনের কেস! প্রথমে পালিয়ে বেড়ানো। কী নিন্দা-মন্দা দিদির বিরুদ্ধে। কানে নেওয়া যায় না! শেষ অব্দি মানসবাবু বালিশ তাকিয়া নিয়ে ঘাঁটি গাড়লেন কলকাতায় গাঁধী বাবার চরণতলে। মশার কামড় খেলেন। চোঙা ফুঁকলেন বাংলায় গণতন্ত্র ধর্ষণ হচ্ছে বলে। কিন্তু কোনও ভাবেই ইজ্জত খোয়াবেন না। কারণ, মানসবাবুর বাবা মারা যাওয়ার সময় তাঁকে বলে গিয়েছিলেন, ‘‘কংগ্রেস পার্টি হচ্ছে মায়ের মতো। কোনও দিন তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করিস না রে মানস..!’’
কিন্তু মান্নান-অধীররা নিজেদের মধ্যে কী খেলা খেললেন! (মান্নান অবশ্য বলেছিলেন, ‘ওটা সনিয়া গাঁধীর সিদ্ধান্ত’) বিধানসভায় পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির (পিএসি)-র চেয়ারম্যান হতে দিলেন না মানসকে। সেই মানসকে, যিনি দিন রাত বিধানসভার আড্ডায়, টেলিফোনে তাঁর বিরুদ্ধে অমৃতভাষণ বর্ষণ করেন, কাছে টেনে নিলেন মাননীয়া। করে দিলেন পিএসির চেয়ারম্যান। এ বার যেমনটি মুকুলকে করেছেন। ব্যাস। বাপের কাছে দেওয়া কথা ভুলে গিয়ে তিনি মাননীয়াকে কথা দিলেন। সাংসদ হলেন। স্ত্রী বিধায়ক। আবার বিধায়ক। মন্ত্রী। কী নয়…!
বাবুলকে যেদিন যাদবপুরের বাচ্চা ছেলেটা চুলের মুঠি ধরে মেরেছিল, সেদিন সেই অর্বাচীন যুবক বা যারা মিছিল করে, টায়ার জ্বালিয়ে বাবুলের বাপবাপন্ত করেছিল, তারা কি জানতো, এই বাবুলও একদিন তৃণমূলের সম্পদ হবে! মোদী ছেড়ে দিদিকেই মেনে নেবেন! বা ধরুন মুর্শিদাবাদের আবু তাহেরের কথা। কংগ্রেসের বিধায়ক থাকার সময় তৃণমূলের আশ্রিত দুষ্কৃতীরা যে ভাবে মেরে তাঁর মাথা দু’ভাগ করে দিয়েছিল (এফআইআর-এ তাই বলা হয়েছিল), আবু তাহের আমাকে বলেছিলেন, ‘‘আল্লার দয়ায় বেঁচে গিয়েছি দাদা।’’ তারপরে তাঁকে নিয়ে অধীরের কী দৌড়াদৌড়ি। সেই আবু তাহের এখন ওই মুর্শিদাবাদ জেলা থেকেই তৃণমূলের সাংসদ। আবার দেখুন ওই জেলারই ডেভিডকে। অধীর মিছিল করে ঘেমে গেলে ঘামে ভেজা গেঞ্জি যাঁর হাতে ধরিয়ে দিতেন তাঁর নাম ডেভিড। কথায় কথায় বলতেন, ‘‘বাবাকে ছাড়তে পারি। অধীরদাকে নয়।’’ তাঁর বিরুদ্ধে কত কেস! ডেভিডের কী রাগ মাননীয়ার বিরুদ্ধে। এখন সব গলে জল হয়ে গিয়েছে!
এই তালিকা ক্রমেই বাড়ছে। তৃণমূলের হয়ে এখন যিনি টিভিতে কথায় কথায় ফোনো দেন, তিনি যখন জেলে ছিলেন, কী না বলতেন মাননীয়ার নামে। সব কথা যাতে না শোনা যায়, টিন পেটাত পুলিশ। কিন্তু আজ দেখুন….
আসলে মাননীয়ার এই উদারতাই লাথি খাওয়া জয়প্রকাশকেও আজ কাছে টেনে নিল। আপনারা বিষয়টা উল্টো দিক থেকে দেখে খিল্লি করছেন। অবিলম্বে জয়প্রকাশের লাথি খাওয়ার ছবি পোস্ট করা ব্যান হওয়া উচিত।
(লেখাটি ফেসবুক থেকে নেওয়া। মতামত লেখকের ব্যক্তিগত। ফিচার ছবি গুগল থেকে নেওয়া)