কেউ ছবি আঁকতে ভালবাসে, কারও ভালবাসা ফুটবল কিংবা ক্রিকেট, কেউ আবার সময় পেলে রান্নাও করে। করোনা-মরসুমে উচ্চ মাধ্যমিকে মুর্শিদাবাদ জেলার কৃতীদের সঙ্গে কথা বললেন সুদীপ জোয়ারদার

 

গান শিখত একসময়, আবৃত্তি করত, আঁকত ছবিও। কিন্তু পড়াশোনার চাপে গান শেখা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু স্বাগতা দাসের ছবি আঁকার নেশাটা এখনও রয়েছে। রয়ে গিয়েছে আবৃত্তি-চর্চাও। ‘গল্পের বই পড়ো?’ স্বাগতা জানাল, শরৎচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথের লেখা পড়তে ভাল লাগে, ভাল লাগে নারায়ন সান্যাল, সুচিত্রা ভট্টাচার্যের লেখাও।

স্বাগতা দাস

৪৯৪ নম্বর পেয়ে এ বারের উচ্চ মাধ্যমিকে রাজ্যে ষষ্ঠ এবং মুর্শিদাবাদ জেলায় প্রথম হওয়া মেধাবী মেয়েটি কিন্তু ডাক্তারি বা ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়তে আগ্রহী নয়। ভবিষ্যতে অঙ্ক নিয়ে গবেষণা স্বাগতার লক্ষ্য। সেজন্য অঙ্ক নিয়ে ভর্তি হয়েছে প্রেসিডেন্সিতে।

জোতকমল হাইস্কুলের কৃতী ছাত্রীটি সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছে সাগরদিঘি থার্মাল পাওয়ার স্কুলে। সেই সময় একই ক্লাসে পড়ত এ বারের আর এক কৃতী, উচ্চমাধ্যমিকে অষ্টম।

মাহফুজুল হক

মাহফুজুল অবশ্য উচ্চ মাধ্যমিক পড়েছে বহরমপুরের আইসিআই স্কুলে।উচ্চ মাধ্যমিকের আগে পর্যন্ত চুটিয়ে ফুটবল খেলেছে, জানাল মাহফুজুল (৪৯২)। পাঠ্য বিষয়ের মধ্যে ফিজিক্স ওর প্রাণ। এগোতে চায় ফিজিক্স নিয়েই। ওয়েস্টবেঙ্গল জয়েন্ট অবশ্য দিয়েছিল। র‍্যাঙ্ক খারাপ হয়নি, সত্তর। কিন্তু মাহফুজুলের লক্ষ্য ফিজিক্স নিয়ে পড়াশোনা, গবেষণা। কেভিপিওয়াই দিয়ে ভাল র‍্যাঙ্ক করে ও এখন অপেক্ষা করছে কাউন্সেলিংয়ের। করোনায় আপতত গৃহবন্দি মাহফুজুল খুব মিস করছে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা।

একই অবস্থা ওর সহপাঠী সৌভিক বিশ্বাসেরও। সৌভিকও ৪৯২ পেয়ে একই সঙ্গে রাজ্যে অষ্টম হয়েছে। সেও আইসিআই স্কুলেরই ছাত্র। সৌভিকের লক্ষ্য ডাক্তারি পড়া। এ বছর নিট দিলেও ভাল ফলের আশা নেই, জানাল সৌভিক। আগামী নিটের জন্যই ও নিজেকে তৈরি করছে। মাহফুজুল ফুটবল খেলে, কিন্তু সৌভিকের প্রিয় খেলা ক্রিকেট। মাহফুজুলের মতো সৌভিকও আইসিআই স্কুলে এসেছে একাদশ শ্রেণিতে। মাধ্যমিক দিয়েছিল নওদা ব্লকের ঝাউবোনা হাইস্কুল থেকে। এখন বহরমপুরের সুতির মাঠে থাকলেও সৌভিকদের আসল বাড়ি ওই নওদা ব্লকেই। রামনগর গ্রামে। পড়াশোনার পাশাপাশি সৌভিকের নেশা ছবি আঁকা।

সৌভিক বিশ্বাস

সৌভিকদের সঙ্গে রাজ্যে অষ্টম স্থানে রয়েছে এ জেলার আর এক কৃতী, আমতলা হাইস্কুলের সায়ন্তন চট্টোপাধ্যায় (৪৯২)। সায়ন্তন আবার সৌভিকের ছোটবেলার বন্ধু। মাধ্যমিকের আগে টিউশন পড়ত একই স্যরের কাছে। সায়ন্তনের জন্ম এখানে নয়, নাগাল্যান্ডে। পড়াশোনা শুরুও ওখানের সেন্ট জনস স্কুলে। ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে প্রাথমিকের পাঠ শেষ না হতেই ২০১০ সালে অকস্মাৎ মাতৃবিয়োগ। সায়ন্তন এসে ভর্তি হল পিতৃভূমি মুর্শিদাবাদের আমতলার বিবেকানন্দ শিশুনিকেতন স্কুলে। তখন এক বর্ণ বাংলা পড়তে পারে না, লিখতে তো নয়ই। চতুর্থ, পঞ্চম শ্রেণি শিশুনিকেতনে ব্যাপক সমস্যায় পার করে যখন এল আমতলা হাইস্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণিতে তখনও বাংলা লেখা বা পড়ার উন্নতি তেমন বলার মতো নয়।

সায়ন্তন চট্টোপাধ্যায়

সপ্তম শ্রেণি থেকেই শুরু হল জেদি ছেলেটির ঘুরে দাঁড়ানো। একটা হাত জন্ম থেকেই অকেজো। মা নেই, বাবাও ভিনরাজ্যে। কিন্তু তাতে কী! পড়াশোনাতেই মেধাবী ছেলেটি খুঁজতে চাইল আনন্দ ও আশ্রয়। এর পরের ইতিহাস স্বাভাবিকভাবেই ক্রমোত্তরণের। নবম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণীতে সায়ন্তন উঠল প্রথম হয়ে। এক নম্বর হওয়ার স্বাদ আমতলা হাইস্কুলে সে বারই প্রথম।

কেমিস্ট্রি সায়ন্তনের প্রিয় বিষয়। কেমিস্ট্রি নিয়ে ও ইতিমধ্যেই বেলুড়ে ভর্তি হয়ে গিয়েছে। করোনার এই পর্বে সায়ন্তন আপাতত সকলের মতোই গৃহবন্দি। রেজাল্ট নিয়ে মৃদু অসন্তুষ্টি রয়েছে সায়ন্তনের। বিশেষ করে বাংলায় পঁচাশি নম্বর দেখে ও অবাক হয়েছিল।

৪৯১ নম্বর পেয়ে এ বার রাজ্যের নবম স্থানে রয়েছে এ জেলারই আর এক কৃতী, অন্বেষদীপ ঘোষ। আইসিআই স্কুলের ছাত্র অন্বেষদীপের আসল বাড়ি উত্তরবঙ্গে। বাবা কেন্দ্র সরকারের চাকরি করেন। তিনি কর্মসূত্রে থাকেন শিলংয়ে। মা-ও কর্মরতা। বহরমপুরে মায়ের সঙ্গে থাকে অন্বেষদীপ।

অন্বেষদীপ ঘোষ

অন্বেষদীপ ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়বে। ওয়েস্টবেঙ্গল জয়েন্ট দিয়েছিল। ওর র‍্যাঙ্ক হয়েছে ১০৮৩। যাদবপুরে সিভিল পেয়েছে। তবে এটাই চূড়ান্ত নয়। সর্বভারতীয় র‍্যাঙ্কে যদি শিবপুরে পেয়ে যায়, তবে চলে যাবে ওখানেই। অন্বেষদীপও সায়ন্তনের মতো কুইজ ভালবাসে। ভালবাসে আবৃত্তি করতে। এছাড়া লেখালেখির চর্চাও রয়েছে। ঘরের কাজকর্মে সে মাকে সাহায্যও করে।

জিয়াগঞ্জ থেকে উচ্চ মাধ্যমিকে এ জেলার আরেক কৃতী আবির রায়। আবিরের সঙ্গে কথা হচ্ছিল এ বারের ফল নিয়ে। ‘এই ফলে তুমি কি খুশি?’ ওর কথায় জানা গেল, বাংলার নম্বরে সায়ন্তনের মতো অবাক হয়েছে সে-ও। গল্পের বইয়ের পোকা, আবির বাংলাতে বরাবরই ভাল। কিন্তু বাংলাতে ৯৩ ওকে কিছুটা হলেও হতাশ করেছে। মাধ্যমিকে জেলায় যখন প্রথম হয় তখনই জানা গিয়েছিল, আবির অবসর সময়ে রান্না করতে ভালবাসে। এ বার করোনায় দীর্ঘদিন ঘরবন্দি। ‘এর মধ্যে কী রান্না করলে আবির?’ ৪৯০ পেয়ে উচ্চ মাধ্যমিকে রাজ্যে দশম হওয়া আবির হেসে ফেলল। বলল-‘একদিন বিরিয়ানি করেছিলাম।’

আবির রায়

আবিরের বাবা, মা দুজনেই শিক্ষক। আবিরের মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক একই স্কুল। জিয়াগঞ্জের রাজা বিজয় সিংহ বিদ্যামন্দির। আবিরের লক্ষ্য আইআইটিতে বি.টেক পড়া। তার পরে ইন্ডিয়ান ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিসে বসা। আপাতত পরের বছরের আইআইটি এনট্রান্সের জন্যই আবির নিজেকে প্রস্তুত করতে ব্যস্ত। ‘বাড়িতে বন্দি থাকতে অসুবিধা হচ্ছে না?’ ফের হাসছে আবির, ‘বাইরে এমনিতেই তো আমি কম বেরোই।’ আবিরের বাবার মুখে জানা গেল, গল্পের বই, রান্নায় মাকে টুকিটাকি সাহায্য আর আইআইটির প্রস্তুতি নিয়ে সে নাকি দিব্যি আছে।