মলয় দে তাহেরপুর

‌দুধসাদা গাড়ি রয়েছে তাঁর অপেক্ষায়। অপেক্ষায় আছেন চালক। তৈরি আছেন নিরাপত্তারক্ষীও। কিন্তু যাঁর জন্য এত তোড়জোড়, তিনি এলেন, সাইকেল নিলেন এবং শুরু হল যাত্রা। চালক থ। নিরাপত্তারক্ষী কিংকর্তব্যবিমূঢ়। বাকিরা একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করছেন।
কিছুক্ষণের মধ্যে নিরাপত্তারক্ষীও সাইকেলে উঠে তাঁর পিছু নিলেন। তিনি কিন্তু মনের আনন্দে চাপ দিয়ে চলেছেন সাইকেলের প্যাডেলে। রাস্তায় কারও সঙ্গে দেখা হলে চলতে চলতেই কথা বলছেন। বসন্তের হাওয়ায় দুলছে সামনের ঝুড়িতে রাখা লালরঙা ব্যাগের হাতল। মিনিট কয়েকের মধ্যেই সাইকেল পৌঁছল তাহেরপুর পুরসভায়। পিছু পিছু পৌঁছলেন নিরাপত্তারক্ষীও।
তিনি উত্তমানন্দ দাস। নদিয়ার তাহেরপুর পুরসভার পুরপ্রধান। আজ্ঞে হ্যাঁ, গাড়ি নয়, উত্তমানন্দ বাহন হিসেবে বেছে নিয়েছেন পরিবেশবান্ধব দ্বিচক্রযানকেই! প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, তাহেরপুর হচ্ছে রাজ্যের সেই ব্যতিক্রমী পুরসভা যেখানে সবুজ ঝড়েও পলাশ কুড়িয়েছে বামফ্রন্ট। ফলে তৃণমূলের কেউ কেউ পুরপ্রধানের সাইকেল অভিযানকে কটাক্ষ করে ‘লোকদেখানো’ বললেও তাহেরপুরের আমজনতাদের অনেকেই কিন্তু বলছেন, ‘‘এটাই অন্যেরা একবার করে দেখাক না!’’
তাহেরপুর শহর তৃণমূলের সভাপতি পরিতোষ ঘোষের কটাক্ষ, ‘‘এ সব লোকদেখানো ছাড়া আর কিছুই নয়। এই তো সদ্য তিনি শপথ নিলেন। কিছুদিন অপেক্ষা করুন। তারপরেই বোঝা যাবে তিনি ঠিক কী উদ্দেশ্যে সাইকেল চালাচ্ছেন!’’
উত্তমানন্দ দাস অবশ্য হাসতে হাসতে বলছেন, ‘‘আমি সেই ২০০০ সাল থেকে জনপ্রতিনিধি। এই বাইশটা বছর সাইকেলই আমার বাহন এবং সঙ্গী। তাছাড়া বাক্সবন্দি গাড়িতে যাতায়াত করলে তো পথেঘাটে কারও সঙ্গে ঠিকমতো কথা বলা যায় না। সেই জন্য সাইকেলই ভালো।’’
বামপন্থী এই নেতার সংযোজন, ‘‘তাহেরপুর ছোট পুরসভা। অর্থভান্ডারের অবস্থাও ভালো নয়। তেলের দামও আকাশছোঁয়া। আমার যাতায়াতের জন্য বরাদ্দ তেলের খরচ বাঁচিয়ে সেই টাকায় এলাকার উন্নয়ন করব। পুরকর্মীদেরও বলে দিয়েছি, কেউ যেন অপ্রয়োজনীয় গাড়ি ব্যবহার না করেন।’’
উত্তমানন্দের এই সাইকেল চালানোর বিষয়ে কেউ কেউ আবার নেদারল্যান্ডসের প্রধানমন্ত্রী মার্ক রুট কিংবা গোয়ার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী প্রয়াত মনোহর পারিক্করের প্রসঙ্গও টেনে আনছেন। সাইকেল নেদারল্যান্ডের সবচেয়ে জনপ্রিয় বাহন। কিন্তু দেশের প্রধানমন্ত্রী কোনও প্রোটোকল ও নিরাপত্তারক্ষী ছাড়া সাইকেলে যাচ্ছেন, এমনটা সচরাচর দেখা যায় না। কিন্তু মার্ক রুট সেটাই দিনের পর দিন করে দেখিয়েছেন। একই কথা প্রযোজ্য মনোহরের ক্ষেত্রেও।
সম্প্রতি এ বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও তাঁর দলের সাংসদ, বিধায়ক, নেতানেত্রীদের সাইকেল, মোটরসাইকেল, রিকশায় যাতায়াত করার পরামর্শ দিয়েছেন। তাতে জনসংযোগ ভালো হয়। কিন্তু তৃণমূলেরই অনেকে বলছেন, ‘‘সাংসদ বিধায়কদের কথা ছেড়েই দিন, প্রধান কিংবা পঞ্চায়েত সদস্যের স্বামী পর্যন্ত দামি গাড়ি ছাড়া ঘোরেন না! ফলে, দলনেত্রীর কথা কে কতটা শোনেন তা সময় বলবে!’’
পুরসভার গাড়িচালক শঙ্কর দাস বলছেন, ‘‘চেয়ারম্যান সাহেব তো প্রথম দিন থেকেই সাইকেলেই যাতায়াত করছেন। এমন চেয়ারম্যান আগে কখনও দেখিনি মশাই।’’ আর পুরপ্রধানের নিরাপত্তারক্ষী মুচকি হেসে বলছেন, ‘‘পুরপ্রধানের সঙ্গে সঙ্গে আমিও সাইকেলেই ঘুরছি। এতে শরীর ও মন দুই-ই ভালো থাকছে।’’
পুরপ্রধান অবশ্য এতশত ভাবতে নারাজ। চেনা পিচপথে ছুটছে তাঁর সাইকেল। দূর থেকে শোনা যাচ্ছে ঘণ্টি— টিং…টং…