প্রসূন আচার্য

ভীমরুলকে গ্রেফতার করে কী হবে?
মূল মাথা তো বালি, পাথর, কয়লা খাদান থেকে কোটি কোটি টাকা তোলা, মাটির দেবীকে সোনায় মুড়ে দেওয়া কাতলা মাছের মাথাটা। বীর ভূমিতে তার ইশারা ছাড়া কোনও রাজনৈতিক খুন হয় কি? আল্লাহ থেকে তারাপীঠের মা কালী, কে জানেন না সে কথা !
****
ঠিক কী হয়েছিল ?
খাদান থেকে লরি পিছু তোলা আদায়ের লাখ লাখ টাকা ইদানিং দিতে ত্যানডাই-ম্যানডাই করছিল ভাদুম। ১০ বছর আগেও সিপিএম করা, রাজমিস্ত্রির কাজ করা, পথের ধারে মুরগি কেটে বিক্রি করা সেই ভাদুম! যে দু’বেলা ঠিক মতো খেতে পেত না। কিন্তু কাতলা মাথা তার জীবনটাই বদলে দিয়েছিল। জেলায় ছড়িয়ে থাকা তোলাবাজির কোটি কোটি টাকা তুলে মাস পয়লায় নির্দিষ্ট ঠিকানায় পৌঁছে দেওয়া শতাধিক এজেন্টের মধ্যে ভাদুমও ছিল একজন। বিশ্বস্ত। নতজানু।
কিন্তু সম্প্রতি নিজেকে কেউকেটা ভাবতে শুরু করেছিল ভাদুম। দোষটা তার নয়। স্বপ্নের দোষ। রাতারাতি বড়লোক হওয়ার স্বপ্ন। যা আমরা সবাই দেখি। তিনতলা পেল্লাই বাড়ি বানিয়ে ইদানিং ভাদুমের ডানা গজিয়েছিল। বড্ড বাড় বেড়েছিল। কাতলা মাথার দাপটকে অস্বীকার করায় প্রথমে ভাদুম মরল। ওঁর বউটা শোকে কাঁদতে কাঁদতে একদম হক কথা বলেছে।
কী বলেছে?
ভিডিয়োটা শোনেননি?
“ও তো সবাইকে দিয়ে খেত। একা খেত না। তবু লোকটাকে মরতে হল।”
অভাগা বিধবা জানত না, ইদানিং ভাদুম আর মাথায় কম অক্সিজেন যাওয়া লোকটাকে বিশেষ পাত্তা দিচ্ছিলেন না। তোলাবাজির সিংহভাগ টাকাও দিচ্ছিল না। রাতারাতি বড়লোক হওয়ায় নেশায়, নিজেই খাদানের ব্যবসা করার স্বপ্নে মশগুল ভাদুম প্রায় সব টাকাই নিজের পকেটে ভরছিল। বাড়াচ্ছিল ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স। ক্রমেই খেপছিল কাতলা মাথা। একাধিক বার সাবধানও করেছিল। কিন্তু কথা কানে তোলেনি। তাই শেষে খুন হতে হল ভাদুমকে।
পরে সাক্ষী লোপাট করতে ভাদুমের হত্যাকারীদের মারতে আর এক দল লোক পাঠাল কাতলা মাথা। ওই রাতেই। ভাদুম খুন হয়েছে রাত সাড়ে ৮টা নাগাদ। ফলে গ্রামে পুলিশ ছিল। রিপোর্টাররাও ছিল কাছেই। তাদের মধ্যে অনেককেই কার্যত বাধ্য হয়েই কাতলা মাথার বদান্যতায় বাঁচতে হয়। ফলে সেই রাতে সবাই চোখ বুজে থাকল। বোধহয় আগুন লাগানোর আগে রিপোর্টারদের ওই গ্রাম ছেড়ে চলে যেতেও বলা হয়। কিন্তু পুলিশ যায়নি। গ্রামেই ছিল।
ভাদুমের হত্যাকারীরা কাতলা মাথার এই পুরনো ছকের কথা জানত। প্রথমে একজনকে খুন করো। তারপরে সাক্ষী-প্রমাণ লোপাট করতে তার খুনীদেরও ধরাধাম থেকে সরিয়ে দাও। সত্তর, আশির দশকে অমিতাভের অনেক সিনেমায় এমন দৃশ্য আছে।
তাই হামলা হতে পারে এই আশঙ্কায় গ্রামে না থেকে বাড়ি ফেলে পালিয়ে যায় হত্যাকারীদের দলবল। যাওয়ার আগে তারা ভীমরুলকে ফোন করে বলে, ভাই বাড়ির বউ বাচ্চারা রইলো। প্রোটেকশন দাও। পুলিশকে বলো।
এখন ভীমরুল কোন দিকে যায়? পুলিশ তো গ্রামেই রয়েছে। ফলে ভাদুমের লোকেরা যখন প্রতিশোধ নিতে ঝাঁপিয়ে পড়ল, একের পর এক ঘরে আগুন দিল, তখন রাত ১২টাও বাজেনি। পুলিশ সব দেখেও অদৃশ্য কারও নির্দেশে বোবা দর্শক হয়ে রইল, রিভলবার পিছনে গুঁজে।
যে দুই একজন বেঁচেছে, তারা ঠিকই বলেছে— “পুলিশের সামনেই সব হয়েছে। ওদের বার বার বলেছি। কিন্তু ওরা বাঁচায়নি।” সেই অভিশপ্ত রাতে ঘরে আশ্রয় নেওয়া নিরাপরাধ মহিলা ও শিশুদের জীবন্ত জ্বালিয়ে দেওয়া হলো। মারা গেল সদ্য বিবাহিত দম্পতিও। সব মিলিয়ে ১২ জন।
কাহিনি এখানেই শেষ।
****
এর পরে সবাই ১২ ঘণ্টা বাদে টিভিতে দেখেছে। শুনেছে কাতলা মাথার কথা। ফোনো বা বাইট যাকে বলে টিভির লোকেরা। এখন পাবলিকও এই ভাষা শিখে গিয়েছে। কী বলেছে লোকটা? যার মাথায় কম অক্সিজেন যায়? লোকটা বলেছে, “শর্ট সার্কিট থেকে টিভিতে আগুন লাগে। টিভি বার্স্ট করে ঘরে আগুন ধরে যায়। তাতেই সব পুড়ে মরেছে। এটা দুর্ঘটনা। দমকল গিয়ে কয়েক জনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছে।”
শুধু আমি নয়, বাংলার কোটি কোটি মানুষ এই মিথ্যাচার শুনেছে। মাননীয়ার কাছে প্রশ্ন, তা হলে কেন শাস্তি হবে না মাথায় অক্সিজেন কম যাওয়া এই বিপুল উদর কাতলা মাথার লোকটার? জেলার মন্ত্রী থেকে সাংসদ, প্রতিটি থানা, জেলার ডিএম, এসপি সবাই জানে, যার কথা মানেই শেষ কথা। চূড়ান্ত নির্দেশ। সেই নির্দেশ অমান্য করা মানে মাথা কেটে যাওয়া।
মাননীয়া, আপনি তো সিপিএম আমলে অনেক খুন দেখেছেন। গোটা রাজ্যে দৌড়ে বেড়িয়েছেন। এমন কথা যদি গণহত্যার ১২ ঘণ্টার মধ্যে বাম আমলে সিপিআইএমের কোনও জেলা সম্পাদক বলত, আপনি তার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থার দাবি জানাতেন? কলকাতায় ফিরে প্রেসকে কী বলতেন? বড্ড জানতে ইচ্ছে করে। কারণ, আপনাকে তো খুব কাছ থেকে তিন দশক ধরে দেখছি।
***
কাতলা মাথার কিছু অমৃতবাণী উল্লেখ করলাম—
১) “আমি বলছি, পুলিশকে লক্ষ্য করে বোমা মারুন।”
২) “শোনো ওসি, তোমাকে এক ঘণ্টা টাইম দিচ্ছি। তার মধ্যে যদি সব কটা বাইককে ধরে থানায় ঢোকাতে না পারো, আমি রাত ৯টার পরে গ্রামে ঢুকবো। সব জ্বালিয়ে দেব। কেউ বাঁচবে না।”
একটা ক্ষেত্রেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্টে সাফাই দেওয়া হয়েছে— ওর মাথায় অক্সিজেন কম যায়। সত্যি কি কম যায় ?
***
এই মানুষটি সম্প্রতি কলকাতা বইমেলার ঠিক আগে তার আত্মজীবনীমূলক বই প্রকাশ করে। খেলা হবে। রাজ্যের সব থেকে সাংস্কৃতিমনস্ক, নাট্যকার মন্ত্রী মানুষটি তার বইয়ের উদ্বোধনে বীর ভূমি অব্দি ছুটে গিয়েছিলেন। আসলে ক্যামাক স্ট্রিটের আশীর্বাদধন্য এই মানুষটি ঠিক কত কোটি টাকার মালিক বোধহয় সে নিজেও জানে না! শুনেছি হলদিয়ার লক্ষণ শেঠের মতো একটা প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজ করছে।
আর কে না জানে, জগতে টাকাই শেষ কথা বলে।
রুপিয়া বোলতা হ্যায়।
(লেখাটি ফেসবুক থেকে নেওয়া। মতামত লেখকের ব্যক্তিগত)