দেবজ্যোতি কর্মকার

বেশ কিছুদিন আগে একটি ব্যঙ্গচিত্র দেশজুড়ে ভাইরাল হয়েছিল। ব্যঙ্গচিত্রটিতে দেখানো হয়েছিল জাতীয় কংগ্রেসের ‘হাত’ চিহ্নটি কী ভাবে ক্রমাগত ক্ষয়িষ্ণু হতে হতে শেষে আম আদমি পার্টির ‘ঝাঁটা’য় পরিণত হয়েছে। ওই চিত্রটির প্রধান উপজীব্যই ছিল কংগ্রেসের ‘হাত’ ধীরে ধীরে অব্যবহৃত অবস্থায় থেকে পচন ধরে। পরে একসময় তার মাংস খসে যায় এবং হাতের অবশিষ্ট অস্থিই আবার নিজেদের তাগিদে লড়াই করতে একত্রিত হয়ে জমাট বাঁধা ‘ঝাঁটা’য় পরিণত হয়। এটি ভাইরাল হয়েছিল ‘আপ’-এর দিল্লিতে ২০২০ সালে তৃতীয় বার ক্ষমতা দখলের ঠিক পরেই। উল্লেখ্য, ২০২০ সালে দিল্লি বিধানসভায় ৭০টি আসনের মধ্যে ৬২টিতে আপ-এর জয়লাভ এবং তার আগে ২০১৯ সালে লোকসভা নির্বাচনে ‘হাত’ চিহ্নের ভরাডুবির ফলেই ‘হাত’-এর রূপ বদলে ‘ঝাঁটা’য় পরিণত হওয়ার এই ব্যঙ্গচিত্রটি যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণও বটে।
এ তো গেল ‘আপ’কে নিয়ে ব্যঙ্গচিত্র উপস্থাপনে কার্টুনিস্টদের শিল্পবোধের পরিচয়। কিন্তু এই ২০২২ সালে উত্তরপ্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, মণিপুর, গোয়া ও পাঞ্জাব এই পাঁচ রাজ্যের মধ্যে চার রাজ্যেই বিজেপির অভাবনীয় জয়ের মধ্যেও পাঞ্জাবে আম আদমি পার্টির অভূতপূর্ব উত্থান এবং তার পরবর্তীতে বাংলায় ‘পদার্পণ যাত্রা’ ঘিরে জনমানসে কতটা আগ্রহ তৈরি হল তা অবশ্যই দেখার সময় এসেছে।
আসলে, আম আদমি পার্টির অভূতপূর্ব উত্থান এবং তার পরবর্তীতে যে রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে আমরা ব্যস্ত আছি তার মধ্যে জটিল এক রহস্য লুকিয়ে আছে কিনা সেটা দেখার আছে। যেহেতু এই সমীকরণের ডান দিকে স্থির হয়ে বসে আছে ‘২০২৪’! সুতরাং বাঁ দিকের উপাদানসমূহ ও তার যোগ বিয়োগ নিয়েই আমাদের যত মাথাব্যথা। খুব স্বাভাবিক ভাবেই বিজেপি চার রাজ্যের সাফল্য দিয়ে এখন থেকেই ‘২০২৪’ এর জয়ের ঢাকে কাঠি বাজিয়ে রাখতে চাইছে। বিরোধীদের প্রতি এও এক রাজনৈতিক কৌশল ছুড়ে দেওয়া। আর বিজেপির দোর্দণ্ডপ্রতাপ রাজনৈতিক নেতাদের মস্তিষ্কপ্রসূত এমন কৌশল যে বেরোবে সেটাই স্বাভাবিক।
এমনিতেই বিজেপির দীর্ঘদিনের টার্গেটই ছিল কংগ্রেসের কঙ্কালসার রূপটি জনসমক্ষে তুলে ধরে, বিজেপি বিরোধী প্রধান শক্তির অভাবটিকে দেখিয়ে তাঁদের জয়ের ধারা অব্যাহত রাখা। সাম্প্রতিক পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনেও কংগ্রেসের প্রাপ্ত ভোটের চিত্রও একই কথা বলছে। উত্তরপ্রদেশে যেমন ৪০৩ টি আসনের মধ্যে কংগ্রেসের প্রাপ্তি মাত্র ২টি আসন! উত্তরাখণ্ডে ৭০ টির মধ্যে ১৯টি, গোয়ায় ৪০ টির মধ্যে ১১টি, মণিপুরে ৬০টির মধ্যে ৫টি এবং ক্ষমতায় থাকা পাঞ্জাব রাজ্য থেকে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে (২০১৭ সালে ৭৭টি আসন পেয়ে কংগ্রেস ক্ষমতায় এসেছিল) ১১৭ টি আসনের মধ্যে কংগ্রেসের প্রাপ্তি মাত্র ১৮! ইতিমধ্যেই ‘পরিবারতন্ত্র’ নিয়ে বিজেপির নিক্ষেপ করা বাক্যবাণও এ বার কংগ্রেসের একেবারে অন্দরমহলে প্রবেশ করেছে। বিস্তর আলোচনা, ঝড়ের পূর্বাভাস সত্ত্বেও আপাতত কোণঠাসা কংগ্রেসের সংসারে নীরবতা পালন পর্ব চলছে। ‘পরিবারতন্ত্র’ এবং ‘ক্ষয়িষ্ণু’ কংগ্রেস নিয়ে বিজেপির দীর্ঘদিনের প্রচার যে প্রায় সফল তা বলাই যায়। এবং এখানেই ‘২০২৪’ কে ঘিরে যাবতীয় রাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত আছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে ২০২৪ সালের সমীকরণ মেলাবার সূত্র কী হবে?  আর এই দ্বন্দ্বটি আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে হঠাৎ করেই আম আদমি পার্টির পাঞ্জাব জয়ে। এবং আগুনে ঘৃতাহুতি দিতে শুরু করেছে গত ১৩ই মার্চ কলকাতার বুকে আম আদমি পার্টির ‘পদার্পণ যাত্রা’ ঘিরে। বাংলায় রাজনৈতিক স্বচ্ছতা আনার বিষয়টিকে সামনে রেখে গিরীশ পার্ক থেকে ধর্মতলা পর্যন্ত আম আদমি পার্টির মিছিল তাই এই মুহূর্তে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
আপ বাংলায় ‘পদার্পণ যাত্রা’ করে ইতিমধ্যেই পশ্চিমবঙ্গে ২০২৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার বার্তা দিয়েছে। একটি নির্দিষ্ট নম্বরে মিসড কল দিয়ে আপ-এর সদস্য হওয়ার পোস্টার ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে রাজ্যের শাসক দলের মাথাব্যথা আদৌ আছে কি না জানা না থাকলেও তৃণমূলের বাহ্যিক ছবিতেই স্পষ্ট যে তারা এ বিষয়ে গুরুত্ব দিতে নারাজ। কিন্তু জাতীয় রাজনীতি নিয়ে তৃণমূলের অন্দরমহলের ছবিটি অবশ্যই ভিন্ন সুরে বাজছে। বিশেষ করে অতি সম্প্রতি পাঁচটি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলে তৃণমূলের আশা ক্ষীণতর হওয়ায় সে সুর যে অন্যরকম হবে এটাই স্বাভাবিক। উত্তরপ্রদেশে তারা প্রার্থী না দিলেও গোয়া বিধানসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সময় যে পরিমাণ শক্তি ব্যয় তৃণমূল করেছিল এবং সরকার গঠনের নির্ণায়ক ভূমিকা নেওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন তৃণমূলের নেতারা তা যে এত তাড়াতাড়ি বেসুরো বাজবে তা তাঁরা ভাবতেও পারেননি। কারণ গোয়াতে যেখানে এত নেতা মন্ত্রী গিয়েও তৃণমূলের প্রাপ্তি মাত্র ৫.২২ শতাংশ ভোট! সেখানে আম আদমি পার্টির প্রাপ্ত ভোট ৬.৮ শতাংশ! আবার তৃণমূল যেখানে একটি আসনেও জিততে পারেনি সেখানে আপ দুটো আসনে জয়ের মুখ দেখেছে। যে কারণেই তৃণমূলের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল আম আদমি পার্টি। যে পার্টিই আবার কেন্দ্রে বিজেপি বিরোধী মঞ্চে তৃণমূলেরই দোসর! কিন্তু সেই দোসরই কিনা এ রাজ্যে ‘রাজনৈতিক অস্বচ্ছতা’র অভিযোগ তুলে ‘নোংরা’ পরিষ্কারের তত্ত্ব এনে ‘ঝাঁটা’র প্রয়োজনীয়তার কথাটি স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে! এই দাবি যে তৃণমূলের পক্ষে খুব স্বস্তির নয় তা সব মহলের কাছেই স্পষ্ট।
কেন্দ্রে বিজেপি বিরোধী মঞ্চে একসঙ্গে বসা দুটো দলই কিন্তু এই মুহূর্তে বিজেপির প্রধানতম বিরোধী মুখ হওয়ার দৌড়ে শামিল। বিশেষ করে একের পর এক রাজ্যের নির্বাচনে পরাজয়ের ফলে কংগ্রেসের ক্রমাগত শক্তি ক্ষয়ই এই সত্যটিকেই সামনে এনে দিয়েছে। কিন্তু বিজেপির মূল এবং প্রধানতম বিরোধী দল কোনটি হবে তা নিয়েই এখন চর্চা অব্যাহত। কারণ ক্ষয়ে ক্ষীণ কংগ্রেসকে নিয়ে সে আশা নেই বললেই চলে। তৃণমূল সুপ্রিমো বিজেপি বিরোধী মুখ হিসেবে তুলে ধরতে চেয়ে ত্রিপুরা, গোয়ার মতো রাজ্যের নির্বাচনে যেমন লড়াইয়ে নেমে ব্যর্থ হয়েছেন অপরদিকে, আপ-এর প্রধান নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল ইতিমধ্যেই দিল্লিতে তৃতীয় বার ক্ষমতায় আসা ছাড়াও পাঞ্জাবে ক্ষমতা দখল এবং গোয়ায় সামান্য হলেও প্রভাব বিস্তার করতে পেরে কিছুটা হলেও সফল হয়েছেন। আপ-এর দিল্লির নেতা রাঘব চড্ডা আবার সেই বিষয়টিকেই উসকে দিয়ে বলেছেন, ”আগামী দিনে কংগ্রেসের বিকল্প হিসেবে কেজরিওয়াল দেশকে নেতৃত্ব দেবেন।” কারণ হিসেবে তাঁর যুক্তি, ২০১২ সালে তৈরি হওয়া একটা দল মাত্র দশ বছরেই দুটো রাজ্যের ক্ষমতা দখল করে গোটা দেশে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। এমনকি বিজেপিও যে ইতিহাস ছুঁয়ে দেখতে পারেনি। পারেনি তৃণমূল কিংবা সপা-র মতো দলগুলিও। খুব স্বাভাবিক ভাবেই আপ তাদের পাঞ্জাব জয়ের মধ্য দিয়ে তাদের আঞ্চলিক দলের তকমা মুছে ফেলতে চাইবে। আবার গুজরাটের বিধানসভা নির্বাচনেও তারা লড়াই করার জন্য মনস্থির করেই ফেলেছে। সেখানেও কংগ্রেসের শক্তিহীনতাকে কাজে লাগাতে চাইবে আপ। সে কারণেই গোয়ায় দুটো আসনে জয়লাভের পরেই বাংলাতেও আপ-এর ‘পদার্পণ যাত্রা’র আয়োজন। এবং এই আয়োজনে বাংলার একটা অংশের মানুষ যে উজ্জীবিত হবেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বিশেষত পশ্চিমবঙ্গের ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পরে বিজেপির ক্রমাগত শক্তিক্ষয়ের কারণে সেই ভোট যাতে বামপন্থীদের অক্সিজেন না দেয় সেই অঙ্কটিই আপ এবং বিজেপি নেতারা নিশ্চয়ই মাথায় রাখবেন।
পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে তৃণমূল বিরোধী রাজনীতি একরকম আবার অন্যদিকে জাতীয় স্তরে বিজেপি বিরোধী রাজনীতি অন্যরকম। সেটা আপ-এর সমস্ত নেতাই জানেন। বিজেপি যেমন বাংলায় ব্যর্থ হয়েছে, সেদিকে তাকিয়ে দেখলে আপ-এর সঙ্গে তৃণমূলের লড়াই এখন বিজেপি উপভোগ করতে চাইবে। ঠিক যেভাবে জাতীয় স্তরে কংগ্রেসের সঙ্গে আপ-এর লড়াইয়ের ফলে কংগ্রেস কোণঠাসা হয়ে পড়েছে এবং এতে আখেরে বিজেপির প্রবল লাভ, ঠিক সে ভাবেই তৃণমূল বনাম আপ কিংবা সপা বনাম আপ রাজনৈতিক লড়াইয়ে যে ভোট ভাগাভাগিতে বিজেপিরই লাভ তা বিজেপি ভাল করেই জানে।
আবার রাজ্যসভাতেও বিজেপির ১০০ আসন পূর্ণ হওয়ার পাশাপাশি কংগ্রেসও ন্যূনতম বিরোধী দলের আসনটিও হারানোর আশঙ্কায় দাঁড়িয়ে! সুতরাং এখন জাতীয় স্তরে দুর্বল কংগ্রেস ও দুর্বল তৃণমূল নিয়ে ফাঁকা মাঠে বিজেপির গোল দেওয়ার স্বপ্ন ২০২৪ সালে কতটা সফল হবে তা সময়ই উত্তর দেবে। ততদিনে বিজেপির এই সূক্ষ্ম রাজনীতির সঙ্গে বিরোধীরা কতটা ঠান্ডা মাথার লড়াই করতে পারেন, সেটাও দেখার।

(মতামত লেখকের ব্যক্তিগত। ফিচার ছবি গুগল থেকে নেওয়া)