শেলী সেনগুপ্ত

প্রতিবছর বাংলাদেশের লোকজন ঈদের সময় মাটির টানে উৎসে ফেরে, ফিরে আসে মূলে। উদ্দেশ্য আত্মীয়-পরিজন নিয়ে ঈদের আনন্দ উপভোগ করা। পরিবারের সঙ্গে ঈদের আনন্দ উপভোগ করা। পরিবার পরিজন ছাড়াও গ্রামের সঙ্গে, গ্রামের মানুষের সঙ্গে, এখনও এ দেশের মানুষের আত্মার সম্পর্ক অটুট। এই বন্ধন আমাদের সামাজিক সংহতিকেও অনেক নিবিড় ও সুদৃঢ় করেছে।
তার উপরে আছে পরিবার, পরিজন। এ দেশের বেশিরভাগ পরিবারের কেউ না কেউ এখনও গ্রামে থাকে। বেশিরভাগ মানুষের জন্মনাড়ি পোঁতা আছে গ্রামের মাটিতে। সে নাড়ি প্রতিনিয়ত রাখালিয়া বাঁশি শোনে, শোনে নদীর কলকল ধ্বনি, শোনে দূরে অবস্থান করা সন্তানটির জন্য মায়ের আহাজারি। দেখে সকাল সন্ধ্যা সন্তানের মঙ্গল কামনায় আকাশপানে তোলা মায়ের দু’টি হাত, দেখে সন্তানের প্রিয় খাবারগুলো মা আর মুখেও তোলে না। তাই সে নাড়ি মানুষকে আহ্বান করে মূলে ফেরার। বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় তার ফেলে আসা দিনগুলোর কথা, অপেক্ষায় থাকা মানুষগুলোর কথা। বাড়ির ফেরার পথে হাটের পাশে অগণন বয়সের বটবৃক্ষের কথা, তার সঙ্গে মনে করিয়ে দেয় ছেলেবেলার বন্ধুদের অকৃত্রিম ভালোবাসার কথা। বন্ধুরা পথ চেয়ে আছে, কখন ফিরবে শহরে কর্মরত বন্ধুটি। ফিরলেই ভরিয়ে দেবে ভালোবাসায়, আনন্দে আর গল্পকথায়। কত কথা জমা হয়ে আছে বুকের অলিন্দে।
আনন্দের দিনগুলো তাদের সঙ্গে কাটানোর এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা মানুষকে ঘরমুখো করে। তাই তো পথের সব বাধা-বিপত্তি কাটিয়ে মানুষ বাড়ি ফেরে। তিলতিল করে অর্থ জমায়, আর প্রিয়জনের জন্য কিনে আনে সাধ্য মতো উপহার। উপহার পাওয়া প্রিয়মুখের হাসি এবং প্রিয়জনের সান্নিধ্য মুহূর্তেই ভুলিয়ে দেয় সব কষ্ট-যাতনা। একটি আনন্দঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয় গ্রামের বাড়িতে। নির্ধারিত ছুটির মধ্যে আত্মীয়-স্বজনের সাক্ষাৎ যেন স্বর্গীয় অনুভূতি এনে দেয়। কর্মব্যস্ত মানুষগুলো হয়ে ওঠে হাস্যোজ্জ্বল, শিশুর মতো চঞ্চল। আনন্দ যেন আনন্দ হয়েই ধরা দেয় মানুষের মাঝে। ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানে উচ্ছ্বাস। ঈদের আনন্দ বহুগুণে বৃদ্ধি পায় যখন পরম আত্মীয়ের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগ করে নেওয়া যায়।
কোনও কোনও পরিবারের প্রধান ব্যক্তিটি শহরে কাজ করে, তার সন্তান অপেক্ষা করে বাবা আসবে, সঙ্গে থাকবে খেলনা, নতুন জামা। সন্তানটি নিজেও জানে না, বাবার কাছ থেকে তার নতুন জামার কাঙ্ক্ষার নেপথ্যে থাকে বাবার উষ্ণ বুকে মাথার রাখার প্রবল ইচ্ছে। বাবারও দীর্ঘ সময়ের প্রতীক্ষা থাকে সন্তানকে বুকে জড়ানোর তীব্র তৃষ্ণা। থাকে প্রেয়সীর কোমল বুকে মুখ গুঁজে পথের ক্লান্তি দূর করার অদম্য ইচ্ছে।
গ্রামে থাকা বাবা, মা-ও অপেক্ষা করে সন্তান আসবে। কড়া নেড়ে বলবে, ‘আমি এসেছি’। একরাশ আনন্দের শীতল বায়ু নিয়ে সন্তান আসবে। পলিমাটি বিধৌত বাংলাদেশের মানুষের মন পলির মতো কোমল। এখানে শুধুই জন্মে নিবিড় ভালোবাসা। এ দেশের মানুষ প্রাণভরে ভালোবাসতে জানে। তাই পাশের বাড়ির পড়শির সঙ্গেও গড়ে ওঠে প্রাণের সম্পর্ক। এ ভাবেই নাড়ির টান প্রতিনিয়তই শানিত হয় কোমল মনে। আর তাতে জল সিঞ্চন করে এ দেশের ঋতুবৈচিত্র।
তাই পবিত্র সংযমের মাস এলেই বাংলাদেশের মানুষের মনের মধ্যে যে গানটা তার মনের কথা হয়ে গুণগুণ করে বাজে তা হলো, ‘ফিরে চল, ফিরে চল, মাটির টানে / যে মাটি আঁচল পেতে চেয়ে আছে মুখের পানে,’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মাটিছোঁয়া মানুষের প্রাণের কথাটা বুঝতে পেরেছিলেন, তাই বুঝি নিজের প্রাণে সুর তুলেছেন সবার কথা বলে।
এ দেশের মানুষ জানে, মানুষ মানুষের জন্য। জানে, ভালোবাসা দিলে ভালোবাসা মেলে। আনন্দ ভাগ করে নিলে তা বহুগুণে বৃদ্ধি পায়, কষ্ট ভাগ করলে তা অর্ধেক হয়ে যায়। তাই সুযোগ পেলেই আনন্দ বিতরণ করে। এমনও দেখা যায় বাড়ি ফেরার তাগিদে মানুষ যাত্রার কষ্ট ভাগ করে নেয়, আনন্দ ছড়িয়ে দেয়।
এ দেশে ঈদের আনন্দ শুধু ঈদে নয়, ঈদের অনেক আগে থেকেই উপভোগ করে। আনন্দ অনাবিল, উজ্জ্বল হয় যখন ঈদের প্রস্তুতি শুরু হয়। তাই ঘরে ফেরা মানুষের বুকের মধ্যে বাজতে থাকে নদীর কলতান, পাখির কলরব আর জমাট হাটের হুম হুম ধ্বনি। এ ভাবেই মানুষের ঘরে ফেরার তীব্র তৃষ্ণা থাকুক, তা হলেই বাংলার ঘরে ঘরে ঘরগুলো বাড়ি হয়ে উঠবে, পরিবার হয়ে উঠবে তীর্থভূমি।
ভালোবাসায় উচ্ছ্বল মানুষের জয় হোক।

(মতামত লেখকের ব্যক্তিগত। ফিচার ছবি ইন্টারনেট থেকে নেওয়া)