রোকেয়া ইসলাম

রোজার প্রথম দিনেই আব্বা আমাদের ভাইবোনদের নিয়ে যেতেন কাপড়ের দোকানে। তখন আজকের মতো এত সুপার-শপের আধিক্য ছিল না। এত মার্কেটের আধিক্য ছিল না, পোশাকেরও এত চাহিদাও ছিল না, মানুষ ছিল অল্পেই তুষ্ট।
টাঙ্গাইল শহরে নিউ মার্কেটে আব্বা তার চেনা দোকানে নিয়ে যেত। আমরা বড় দু’বোন নিজেদের পছন্দে জামার কাপড় কিনতে পারতাম। ছোটদের কাপড় আব্বা পছন্দ করে দিতেন। তারপরে শাহজাহান দর্জির কাছে মাপ দেওয়ার জন্য গেলে আমার জামার কাপড় থেকে একটু টুকরো কাপড় কেটে আনতাম। বাটার দোকানে গিয়ে কালো জুতো, সাদা মোজা এবং একজোড়া স্পঞ্জের স্যান্ডেল কিনে নিরালা হোটেল থেকে কিসমিস দেওয়া ছানার সন্দেশ হাতে ধরিয়ে আব্বা রিকশায় তুলে দিতেন আমাদের।
এত বছর পরে ভাবি, ছয় ভাইবোনের কী করে একটা রিকশায় জায়গা হতো? বাসায় ফিরে বইয়ের ভিতরে কাটা কাপড়ের টুকরোটা সযত্নে রেখে দিতাম,  দিনের মধ্যে কত বার যে দেখতাম তার ইয়ত্তা নেই। এখনকার অনলাইন শপিংয়ের মতো তখন ছিল ফেরিওয়ালা। লেসফিতাওয়ালা। ওদের ডাকাডাকি শুনে ডেকে আনতাম। মায়ের পছন্দে চুড়ি, ফিতে, ক্লিপ কেনা হতো।
আমরা ঈদের পোশাক লুকিয়ে রাখতাম, যদি কেউ দেখে ফেলে! তা হলে তো সেটা পুরনো হয়ে যেত। একবার ঈদের বেশ আগে দর্জি দোকান থেকে আমাদের তৈরি জামাকাপড় চলে আসে। সব ভাইবোনেরা পরে পরে দেখছিল। তখন পাশের বাসার খেলার সঙ্গী আমার নতুন জামা দেখে ফেলে। আমিও কান্না জুড়ে দিই,  আবার নতুন জামা তৈরি করার জন্য। দেখে ফেলা জামা পুরনো হয়ে গিয়েছে, ঈদ হবে না ওই জামা দিয়ে। আমার মা ছিলেন খুব কড়া। তিনি তো নতুন জামা আর কিনে দেবেন না। আমি ঘোষণা দিয়ে দিই, ঈদের দিন আমি বিছানা ছেড়ে উঠব না। সেমুই খাব না। গোসলও করব না।
আব্বা তার জেদী মেয়েটার জেদ ধরতে পেরেছিলেন। তিনি একদিন নিয়ে গিয়ে আবার কাপড় কিনে ঈদের আগেই জামা তৈরি করে দেন। এরপর থেকে দর্জির দোকান থেকে আর নতুন জামা আগে আনা হতো না। আব্বা ঈদের আগের রাতে নিয়ে আসতেন। কেউ দেখতে পেত না। ঈদের সকালে নতুন লাক্স অথবা রেক্সোনা সাবান নিয়ে পুকুর পাড়ে যেতাম। আব্বা সাবান মেখে আমাদের গোসল করিয়ে দিতেন। পাড়ার সবাই আসতো পুকুরে গোসল করতে। সে এক মিলনমেলা।
খুব ভোরে মা মিষ্টি তৈরি করতেন। মুরগির কোরমা, খাসির রেজালা, গরুর ঝাল মাংস রাতেই রেঁধে রাখতেন। খিচুড়ি, পোলাও, পায়েস, সেমুই সকালে রান্না করতেন। মা সকালে গোসল সেরে রান্নার আয়োজনে বসে যেতেন। ঈদের বেশ কয়েকদিন আগে থেকেই ঘরদোর পরিষ্কার, পরিচ্ছন্ন করার জন্য লেগে যেত পরিবারের মহিলারা। কত ডিজাইনের চাদর দিয়ে টেবিল ক্লথ বানানো হতো!
আমার মায়ের ছিল পড়ার বাতিক, ঈদ সংখ্যা কেনা হতো। ‘বেগম’ পত্রিকার নামটা আমার আজও মনে আছে। তখন মানুষের হাতে আজকের মতো টাকাপয়সা ছিল না। সব বাড়িতে নতুন কাপড়ের বাহারও ছিল না। সেট সেট পোশাক তো চিন্তার বাইরে। কারও জামা হলে জুতো হতো না, চুড়ি, ফিতা, ক্লিপ যে নতুনই হতে হবে এমনটাও নয়।
তবুও সামান্য প্রাপ্তিতে কী অপার আনন্দ! কী অনন্য গৌরব! কাউকেই ছোট দৃষ্টিতে দেখা হতো না। কার কী আছে, কার কী নেই, এই বিভাজনও তৈরি হয়নি তখন। জাত, ভেদ, ধর্ম, বৈষম্যের তো প্রশ্নই ওঠে না। যে পুকুরে পাড়ার মুসলমানরা সকালে ঈদের গোসল করত, সেই পুকুরে, সেই পানিতেই পাড়ার হিন্দু সম্প্রদায় খুব ভোরে সূর্যপ্রণামও করত।
কোনও সংঘাত নয়, সহাবস্থানই ছিল। ইফতারিতে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী অনেকেই আসত। সেহরি শেষরাতের খাবার। তাই ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও তাতে যোগ দিতে পারতো না অনেকেই। আব্বা পরিবারের বড় সন্তান। রোজা এবং ঈদকে ঘিরে তার দায়িত্ব ছিল অনেক। হাসিমুখেই মা এবং আব্বা পালন করতেন সেগুলো। নিয়মিত জাকাত আদায় করতেন। জাকাত ধনীর সম্পদে দরিদ্রের অংশ বা হক। সম্পদের সঠিক হিসেবেই আব্বা সেটা দিতেন। ফেতরা আদায় করতেন। এগুলোও ইবাদতের অংশ।
আজকের মতো এতো চ্যানেল ছিল না। টিভিই তো ছিল না আমাদের পাড়ায়। সেটার অভাবও অনুভব করিনি কখনও। রোজার একদিন আগে থেকেই স্কুল বন্ধ হয়ে যেত। খুলত ঈদের কয়েকদিন পরে। ঈদের দিন বন্ধুদের সঙ্গে সারাদিন ঘোরাঘুরি, খাওয়া-দাওয়ার জম্পেশ আয়োজন। পরের দিন থেকে আত্মীয়-স্বজনেরা আসত আমাদের বাড়ি। নইলে আমরা যেতাম তাদের বাড়ি।
আমাদের সময়ে ঈদি দেওয়ার প্রথা প্রকট ছিল না। মানুষের হাতে টাকা ছিল না। অনেকেই বহু কষ্টে ঈদের খরচ জোগাড় করতে পারত। সব বাড়িতে পোলাও রান্না হতো না, শুধু সম্পন্ন বাড়িতেই পোলাও রান্না হতো। টাকায় নয়, দোয়ায় ঈদি দেওয়া হতো।
তারপরে কেটে গিয়েছে বহু বছর। প্রথমে বালিকা, তারপরে মা আর এখন আমি দাদি-নানি। তবে আমি এখনও মোড়কখোলা সাবানে ঈদের গোসল সারি, নতুন তাঁতের শাড়ি পরে দিন শুরু করি। যেমন করত আমার মা। তবে সময়ের ব্যবধানে বদলে গিয়েছে অনেক কিছু। আজ ঈদের কেনাকাটায় জৌলুস আছে। প্রাণ নেই।
আজও আমার কাছে ঈদ আসে খুশি নিয়ে, আনন্দ নিয়ে, দায়িত্ব, কর্তব্য নিয়ে। মায়ের মতো বেশ কয়েকটি ঈদ সংখ্যা কেনার বাজেট থাকে। হৃদয় দিয়ে অনুভব করি, ঈদের আনন্দ খুশির সঙ্গে নিয়ে আসে শিক্ষা- দীক্ষা। ঈদের খুশিতে মিশে আছে বিভাজন ভুলে যাওয়ার দীক্ষা। পারষ্পরিক ধর্মের প্রতি নিষ্ঠা, আস্থা, সহিষ্ণুতা। ধনীর সম্পদে দরিদ্রের অংশীদারিত্ব। দানের অপার মহিমা গ্রহণের চেয়ে অনেক বেশি।
তাই শুধু নিজেকে নিয়ে নয়, সবার মাঝে আনন্দ বিলিয়ে ঈদের প্রকৃত আনন্দ উপভোগ করা যেতে পারে। অন্যকে ক্ষমা করে দিয়ে ভারমুক্ত হওয়া যায় ঈদের খুশিতে। ধন নয়, অহঙ্কার নয়, অন্য কিছু নয়, আজও স্রেফ মনের আনন্দেই উপভোগ করি ঈদ।

(মতামত লেখকের ব্যক্তিগত। ফিচার ছবি ইন্টারনেট থেকে নেওয়া)