সারথি বিশ্বাস

মেয়েদের বিরুদ্ধে কোথাও কোনও ঘটনা ঘটলেই সব শাসকের প্রথম এবং প্রধান চেষ্টা থাকে তাকে যথাসম্ভব ছোট করে দেখানো এবং এটা প্রমাণের যে, যারা এ সব তুলে ধরছে তারা সবাই মিথ্যাবাদী, চক্রান্তকারী। সেইজন্য মেয়েদের জেতা যায়, মারা যায়, তাকে বিবস্ত্র করা যায়, তার চুল কেটে মাথায় ঘোল ঢালা যায়, তাকে ধর্ষণ করা যায়, তার মুখে অ্যাসিড ছোড়া যায় এবং আরও অনেক কিছু করা যায়।
শুধু শিশুসাহিত্যই নয়, আমাদের বুড়োদের সমাজেও রাক্ষস কিন্তু আছে, অনেক বেশি সংখ্যায় আছে। হ্যাঁ, তাদের মুখের দু’দিকে দুটো বড় বড় দাঁত বেরিয়ে থাকে না, তাদের ধারালো নখ নেই, চোখ দিয়ে আগুনও বেরোয় না; তাদের না আছে রাবণের মতো দশটা মাথা, না তারা কবন্ধের মতো মুণ্ডহীন, আর না তো রাহুর মতো শুধুই মাথা। অথবা সবই আছে হয়তো, শুধু দেখা যায় না খালি চোখে। তারা আসে কখনও বন্ধুবেশে, কখনও প্রেমিক সেজে, কখনও প্রতিবেশী হয়ে। ‘হাঁউ মাঁউ খাঁউ মানুষের গন্ধ পাঁউ’ বলে না তারা, তারা বলে ‘হাঁউ মাঁউ খাঁউ, নারীর গন্ধ পাঁউ’। কিন্তু সে শব্দ শোনা যায় না খালি কানে। তারা নারীকে ক্রিয়াহীন, ক্ষমতাহীন, ইচ্ছেহীন একদলা মাংসপিণ্ড ভাবে। নারীকে ‘পণ্য’ বলে, তাকে হাটে বেচে, বাজারে কেনে; তাকে ধর্ষণ করে, তার মুখে অ্যাসিড ছোড়ে। কারণ, আজও, সমাজ এমনকি মেয়েরাও, কোনও মেয়েকে বিচার করার সময় তার রূপকেই একমাত্র মানদণ্ড করে। তার কোনও রকম বৌদ্ধিক অথবা প্রতিভাগত যোগ্যতা আছে কি নেই, সেটা ধর্তব্যের মধ্যেই আনে না; নারীর রূপই তার সর্বস্ব এবং একমাত্র পুরুষের ভোগে লাগাই যেন তার উপযোগিতা!
আমাদের সমাজে পুরুষ ও নারীর মধ্যে এইরকম একটা খাদ্যশৃঙ্খল আছে, এখানে পুরুষ খাদক আর নারী খাদ্য যেন! আমরা সবাই ভেতরে এবং বাইরে লালন করি এই শৃঙ্খল, যত্নে গড়ি তাকে। তাই তো আমাদের সমাজে ধর্ষকের বিয়ে হয়ে যায় খাতিরের সঙ্গে, পাত্র জোটে না নির্যাতিতার। অ্যাসিড আক্রমণকারী বাইকের পিছনে বউ নিয়ে তারই হাতে ঝলসে যাওয়া মেয়েটাকে নিয়ে কটূক্তি করতে করতে চলে যায়, আমরা তাই দেখে বিগলিত হাসি হাসি। আমরা ধর্ষককে খুব সহজেই আপন করে নিই, দু-চার দিনেই ভুলে যাই অ্যাসিড আক্রামণকারীর নৃশংসতা। কিন্তু আমরা কোনওদিনই নির্যাতিতাকে কাছে টেনে নিই না। দেখতে চাই না অ্যাসিড আক্রান্তের পোড়া মুখ। তাদের ত্যাগ করি, যেন তারা প্রাগৈতিহাসিক কোনও ভয়ঙ্কর প্রাণী! তাদের গড়া সংসার ভেঙে যায়, প্রেমিক ছেড়ে চলে যায়, তারা এক্কেবারে অচ্ছুৎ হয়ে যায়। সমাজের যত নিন্দা, যত কটূক্তি শুধুই আক্রান্তের জন্য। সমাজের আড়চোখ দুমড়ে মুচড়ে দেয় তাদের, প্রথম আঘাতের পর দ্বিতীয়, তৃতীয় আঘাত নেমে আসে, ভেঙে পড়ে তারা। কেননা, আমাদের স্থির বিশ্বাস, পুরুষ যা করেছে ঠিকই করেছে, যুক্তি আছে তার। আমরা ধরেই নিই যা হয়েছে মেয়েটার দোষেই হয়েছে।
শুধু যৌন হেনস্থা বলে নয়, যে কোনও রকম নারী নির্যাতনে নারীকেই প্রথমে দায়ী করা হয়। সংসারের নিত্য অশান্তি থেকে শারীরিক নির্যাতন, সবেতেই মেয়েদের দোষ খুঁজে পাই আমরা। অ্যাসিড হামলার মতো সহিংসতার ক্ষেত্রেও আক্রান্ত মেয়েটিকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়। হামলার পিছনে কারণ হিসাবে এমন ভাবে মেয়েটির দোষ বিশ্লেষণ করা হয় যেন অ্যাসিডে পুড়িয়ে দেওয়াটা কোনও দোষেরই নয়! সত্যিই বিচিত্র আমাদের মন! পুরুষকে তোল্লাই দেওয়ার জন্য কত কুযুক্তিকেই না উপযুক্ত যুক্তি হিসাবে খাড়া করি! অনেকেই যেমন যৌন হেনস্থার জন্য মেয়েদের বাড়ির বাইরে বেরনোকে দায়ী করে। মধ্যযুগীয় এই মানসিকতা নিয়ে কথা খরচ না করে বলতে চাই, আসল সত্যি হল বহু মেয়ে ‘নিজের বাড়ির’ চৌহদ্দিতে, চেনা-জানা পরিমণ্ডলে, আত্মীয় পরিজন দ্বারাও যৌন হয়রানির শিকার হয়। এবং তার পুনরাবৃত্তি ঘটে। বহু মেয়ে বাড়িতে নিজ আত্মীয়-পুরুষ দ্বারা নিগৃহীত হয়। বৈবাহিক ধর্ষণের কথা ছেড়েই দিলাম, শ্বশুর বাড়িতে পুত্রবধূ শ্বশুরের যৌন লালসার শিকার হয়, দেওর কুপ্রস্তাব দেয়, ভাসুর আঁচল ধরে টানে— এমন নজিরও রয়েছে। এগুলো কোনওটাই বিচ্ছিন্ন আচরণ নয়। কে, কাকে, কখন, কী ভাবে টার্গেট করবে, সবটাই ঘটে একটা প্রচ্ছন্ন নীল নকশার মাধ্যমে। হাজার সচেতন থেকেও মেয়েরা এর থেকে রেহাই পায় না। সত্যিই কেউ বুকে হাত দিয়ে বলতে পারেন, আমাদের দেশে ক’জন মেয়ে আছে যার বুকে একবারও নোংরা হাত পড়েনি?
মোট কথা, ঘরে বাইরে বলে নয়, নারী যে বয়সে এবং যে অবস্থানেই থাকুক না কেন, সেই অবস্থান থেকেই সে যৌন হয়রানির শিকার হয়। মাটিকাটা শ্রমিক থেকে কর্পোরেট হাউস, পুলিশ প্রশাসন থেকে সংবাদমাধ্যম— সর্বত্র একই ছবি। বাকিগুলোর কথায় পরে আসছি, যে গণমাধ্যম নারীর অধিকার নিয়ে সরব, নারীমুক্তির জন্য গলা চড়িয়ে টিআরপি কুড়োয়, তার ভিতর-ঘরে উঁকি দিলে চক্ষু চড়কগাছ হতে বাধ্য। এ বিষয়ে আমার প্রত্যক্ষ কোনও অভিজ্ঞতা নেই, যেটুকু তথ্য দেব সবটাই মহিলা সাংবাদিকদের সংগঠন ‘সাউথ এশিয়ান উইমেন ইন ইন্ডিয়া’-র সাধারণ সচিব স্বাতী ভট্টাচার্যের লেখা থেকে। ‘সাউথ এশিয়ান উইমেন ইন ইন্ডিয়া’ এবং অসরকারি সংস্থা ‘সংহিতা’র যৌথ উদ্যোগে কর্মক্ষেত্রে মহিলা সাংবাদিকদের উপর যৌন হয়রানি বিষয়ে একটি সমীক্ষা হয়। সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে যে চিত্র উঠে আসে তা আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। এ ক্ষেত্রে যে সব মহিলা সাংবাদিকের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে তাঁদের মধ্যে অর্ধেক মহিলা সাংবাদিক জানিয়েছেন, তিনি নিজে যৌন হয়রানির শিকার। ৪৭ শতাংশ মহিলা বলেছেন, মহিলা সাংবাদিকদের যৌন হয়রানির কোনও না কোনও ঘটনা তাঁরা জানেন। পড়শি দেশ পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের সমীক্ষাতেও একই ছবি উঠে এসেছে। আরও ভয়াবহ ব্যাপার হচ্ছে, যাঁদের আমরা আলোর মশাল ভাবি, যাঁদের মুখে আমরা প্রতিবাদীর মুখ দেখি, সেই সাংবাদিকরাও, যাঁরা যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন তাঁদের ৮০ শতাংশ কোনও অভিযোগ দায়ের করেননি।
প্রশ্ন হল, কেন করেননি? তাঁরা সুশিক্ষিত, স্বাবলম্বী, স্বাধীন। এতগুলো ‘স’-এর অধিকারী হয়েও সামনে আসতে অসুবিধা কোথায় তাঁদের? এ ক্ষেত্রে প্রশ্ন সংক্ষিপ্ত  হলেও উত্তর কিন্তু রচনাধর্মী। বুঝতে হবে অনেকগুলো ‘স’-এর সঙ্গে সহাবস্থান করলেই সব সমস্যার সমাধান করা সহজ হয় না। নারীর প্রতি সব যৌন হয়রানির পিছনে থাকে নির্দিষ্ট নকশা, একটা সুপরিকল্পিত ছক। কোনও নারীই সেই ছক থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারে না। মহিলা সাংবাদিকেরাও না। অভিযোগ করা এবং তার বিচার হওয়াও এই ছকের আওতায় পড়ে। আমরা প্রথম থেকেই এই ছকের সূক্ষ সূক্ষ খোপগুলো নিয়ে আলোচনা করছি, দেখতে চাইছি মানুষের  ক্রোমোজোমের কোন কোন রন্ধ্রে রাক্ষসের বাসা।
মেয়েদের প্রতি আমাদের সমাজের সর্বস্তরের অবিশ্বাসের কথা আগেই বলেছি। সার্বিক অবিশ্বাসের এই চিত্রটা কেমন, একটা উদাহরণ দিলে স্পষ্ট হবে। প্রসঙ্গ ভিন্ন হলেও, সাম্প্রতিক অতীতে সুশান্ত সিং রাজপুতের ঘটনায় রিয়া চক্রবর্তীর উপর দিয়ে এই রকম অবিশ্বাসের ঝড় বয়ে গিয়েছে। এক্ষেত্রে  আমাদের অবিশ্বাসের মাত্রা এমনই ভয়াবহ ছিল যে বিচারের আগেই রায় ঘোষণা করে দিয়েছিলাম আমরা। তাঁকে শুধু দোষী সাব্যস্তই করিনি, ডাইনি, রাক্ষসী, কালা জাদুকরী বলতেও পিছপা হইনি। যৌন হেনস্থার ক্ষেত্রেও মেয়েদের প্রতি আমাদের অবিশ্বাস কিছুটা এমনই।  আমাদের ঘরে, বাইরে, চলতি-পথে এবং কর্মক্ষেত্রে  যৌন হয়রানির ঘটনা যে ঘটে সেটাই তো বিশ্বাস করে না অনেক মানুষ।
স্বাতী ভট্টাচার্য যেমন তাঁর লেখায় উল্লেখ করেছেন, যৌন হেনস্থা নিবারণ বিষয়ক কমিটি প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে মিডিয়া হাউসের কিছু কর্ণধার বলেছেন তাঁদের সংস্থায় যৌন হয়রানির মতো কিছু ঘটে না। তাই বোধ হয় এখনও অনেক প্রতিষ্ঠানে আইন মোতাবেক যৌন হয়রানি প্রতিকারের কমিটি তৈরি হয়নি। আবার অনেক প্রতিষ্ঠানে কমিটি থাকলেও তা ‘ধর লক্ষ্মণ’ মাত্র। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় এইসব কমিটির দণ্ডমুন্ডের কর্তারাই নিগ্রহের সঙ্গে যুক্ত। কিছু ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা অনেকে জানেনই না এমন একটি কমিটির অস্তিত্ব তাঁদের প্রতিষ্ঠানে আছে। অন্যদের কথা ছাড়ুন, সমীক্ষায় উঠে এসেছে, ৩১ শতাংশ মহিলা সাংবাদিক জানিয়েছেন, এমন কোনও কমিটি আছে বলেই তাঁরা জানেন না। ২৯ শতাংশ মহিলা জানিয়েছেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠানে এমন কমিটি নেই।
এই যদি কর্পোরেট হাউসের ছবি হয়, তাহলে ইটভাটা, দোকান, গৃহসহায়িকা, রাস্তায় কাজ করা মহিলাদের কথা কল্পনা করুন! তাঁরা তো একজন মালিক বা একজন সুপারভাইজারের মর্জিমাফিক কাজ করতে বাধ্য হন। তাঁদের কাজের স্থায়িত্ব নির্ভর করে মালিকের প্রসন্নতার উপর। তারা যৌন হয়রানির শিকার হলে প্রতিবাদ হবে কোন পথে? বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই, যে কোনও রকম কর্ম-পরিবেশে, অভিযোগ করলে প্রথমেই আসে অভিযোগ প্রত্যাহার করার চাপ, ভয় দেখানো। সেই সঙ্গে থাকে কাজ হারানোর ভয়, আর কোথাও কাজ না পাওয়ার দুশ্চিন্তা, বিরূপ সমালোচনা, অভিযোগকারীকেই দোষী ঠাওরানো, প্রমাণ দাখিল করতে না পারা, বিচার না-পাওয়ার হতাশা, অনেক সময় পরিবারের মানুষকেও পাশে না পাওয়া। এই সবগুলিই কর্মক্ষেত্রে যৌন হেনস্থার এক একটি ছক। এক এক করে সব ছকগুলো বিশ্লেষণ করলে পরিষ্কার হবে কোন মনস্তত্ত্বের পথ ধরে হাঁটে যৌন-হেনস্থাকারীরা।
(মতামত লেখকের ব্যক্তিগত। ফিচার ছবি ইন্টারনেট থেকে নেওয়া)

প্রথম পর্বের লিঙ্ক— https://sadakalo.in/?p=6087
দ্বিতীয় পর্বের লিঙ্ক—
ttps://sadakalo.in/?p=6135