রঞ্জন ভট্টাচার্য

সালটা ১৯৬৭। মেদিনীপুর জেলার বঙ্গসন্তান প্রসেনজিৎ পোদ্দার পাড়ি দিয়েছিল মার্কিন মুলুকে, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকস্তরে পঠনপাঠনের জন্য। সেখানেই এক নাচের স্কুলে তার আলাপ হয়েছিল সুশ্রী রাশিয়ান তরুণী তাতিয়ানা তারাসফের সঙ্গে। নৃত্যপ্রদর্শনের পরে প্রচলিত লোকপ্রথায় অভিভাবদন জানাতে সে চুম্বন করেছিল প্রসেনজিতের হাতের তালুতে ও কব্জবন্ধে। সহজ, সরল গ্রামে বড় হয়ে ওঠা প্রসেনজিৎ এই লোকপ্রথাকে অন্য ইঙ্গিতবাহী স্তরে নিয়ে যায় এবং তার মনে বদ্ধমূল এই ভ্রম তৈরি হয়, হয়তো তাতিয়ানা তাকে প্রেম নিবেদন করছে।
তারপর? সব জায়গায় তাতিয়ানা-র পিছু নেওয়া, নিজের প্রেম নিবেদনকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য তাকে বাধ্য করা ও পরিশেষে তাতিয়ানা-র কাছে প্রত্যাখাত হয়ে তাকে চিরতরে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়া। এই হত্যালীলার পূর্বে প্রসেনজিৎ পোদ্দার কিন্তু তার মনোবিদকে জানিয়েছিল তাতিয়ানাকে তার খুন করে ফেলার ইচ্ছের কথা।
প্রেক্ষাপট বদলে যায়। স্থান-কাল-পাত্র-কুশীলবরা পাল্টে যায়। কিন্তু ছায়াপটে সেই কালান্তরের চিত্রনাট্য একই ভাবে গ্রথিত হয়। বিশ্ববরেণ্য মনোবিদ সিগময়েড ফ্রয়েডের এ মাসের ৬ মে জন্মদিন। মানব-মনের যে গঠন, সেখানে তিনি ত্রিধারা তত্ত্ব ‘ইড-ইগো ও সুপারইগো’-র প্রয়োগ করেন। পুরুষ ‘ইগো’ চায় অর্থ, দম্ভ, প্রতিপত্তি, অহঙ্কার ও বলপূর্বক অধিকার ছিনিয়ে নিতে। আর নারী ‘ইগো’ চায় যত্ন, ভালবাসা ও আবেগপূর্ণ সম্পর্কের গভীরতা। যুগ-যুগান্তরধরে অনেক দস্যু, লুটেরা নারীদেহকে ভোগ করেছে, তাদের ক্রীতদাসী বানিয়েছে কিন্তু নারীহৃদয় জয় করতে পারে নি। তাই নারীহৃদয় জয় করতে না পারাকে পুরুষমানুষ তার জীবনের সবচেয়ে ব্যর্থতা বলে মনে করে। মহাকাব্য রামায়ণে রাবণ সীতাকে অপহরণ করার কারণেই কিন্তু রাম-রাবণের যুদ্ধের সূত্রপাত। আবার সূর্পনখার প্রেম নিবেদনকে প্রত্যাখাত করার জন্যই কিন্তু রাবণের প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে ওঠা। মহাকাব্য মহাভারতে একইভাবে আমরা দেখতে পাই, সভাকক্ষে, সর্বজনসমক্ষে দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের প্রচেষ্টার কারণে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সূত্রপাত। দুঃশাসনের বুক চিরে রক্তপান করে সেই অপমানের জবাব দেওয়ার অঙ্গীকার।
মুর্শিদাবাদ, ভাগীরথীর তীরে এক ঐতিহাসিক স্থান যা একসময় ছিল অবিভক্ত ‘বাংলা-বিহার ও উড়িশ্যা’-র রাজধানী। কিন্তু সারা দেশে এখনও চিহ্নিত করা হয় পিছিয়ে পড়া জেলা হিসেবে। নারীশিক্ষায় জাতীয় গড়ের থেকে পিছিয়ে থাকা, বাল্যবিবাহে সারা দেশে সম্মুখসারিতে চলে আসা ও পাচার চক্রের রমরমায় কালিমালিপ্ত হয়েছে স্বাধীন বাংলার শেষ নবাবের জেলা। সম্প্রতি মুর্শিদাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় চালু হলেও অনেক ছাত্রছাত্রীরা স্নাতক বা স্নাতকোত্তর স্তরের শংসাপত্রগুলি পায় কিন্তু কল্যাণী, গৌরবঙ্গ, বর্ধমান, বিশ্বভারতী বা কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। পাঁচটি মহকুমার প্রায় কোটি ছুঁইছুঁই জনবসতির এই জেলায় তাই প্রান্তিক স্থানগুলি থেকে আসা ছাত্রছাত্রীদের থাকতে হয় হস্টেল, মেস বা ‘পেয়িং গেস্ট’ হিসেবে। হস্টেলে স্থান পাওয়ার চেয়ে সুন্দরবনে বাঘের দুধ পাওয়া বোধ করি অনেক সহজ। কৃষিপ্রধান জেলার বাবা-মায়েদের সামর্থ্য নেই যে ‘পিজি’ (পেয়িং গেস্ট) বাড়ি জোগাড় করা বা তার ব্যয়ভার বহন করা। কন্যাসন্তান হলে তো উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখাও এখন দুরূহ। তাও অনেক বাধা পেরিয়ে কিছু বাবা-মায়েরা তাঁদের সন্তানের স্বপ্নপূরণের চেষ্টা করেন।
হস্টেলের ওই একচিলতে বিছানায় সূর্যের আলো ঢুকতে না ঢুকতেই, স্বপ্নগুলি সব জানলা দিয়ে পালিয়ে যায়। আর ‘নিরাপত্তা’? ওই বিলাসবহুল শব্দটি মেয়েরা জীবনে শোনে, কিন্তু দেখতে পায় না। কেউ পূর্ব সচেতন হয় না, সহমর্মিতা দেখায় না। অপরাধ হয়ে যাওয়ার পরে তৎপরতা দেখতে পাই এই প্রচারসর্বস্ব দাপুটে মিডিয়ার যুগে, যেখানে আত্মপ্রচার ও পিঠ চাপড়ানোর নিরন্তর অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলতে থাকে।
দু’টি মন একসময় কাছে আসে। তারপর ভেঙেও যায়। ‘মেল ডমিনেন্ট শভেনিস্টিক সোস্যাইটির ইগো’ তা মানতে পারে না। ‘স্টকিং’ বা পিছু ধাওয়া চলতে থাকে (যা নিয়ে বলিউডে সুপারস্টার শাহরুখ খানের ‘ডর’ সিনেমাও তৈরি হয়েছে)। ‘প্যারানইয়া’ বা সন্দেহপ্রবণতার ঘূর্ণাবতে প্রত্যাখাত প্রেমিকের মনে তৈরি হয় ‘সুপারসাইক্লোন’। এরমধ্যে যদি তৃতীয় ব্যক্তির প্রবেশ ঘটে এ দ্বিবাহুর সম্পর্ক ত্রিভুজে রূপান্তরিত হয়, তাহলে তো আগুনে ঘি পড়ে।
শেক্সপিয়রের অন্যতম মাস্টারপিস, অনন্য সৃষ্টি ‘ওথেলো’। ওথেলো জানত তার বর্হি-অবয়ব সুন্দর নয়। তার সহধর্মিণী ‘ডেসডিমোনা’ ছিল অপরূপা। কিন্ত একদিন ওথেলোর কানে বিষ ঢালা হয়। পরপুরুষের রুমাল দেখিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা হয় যে, ডেসডিমোনা ব্যভিচারিণী এবং ওথেলোর অবর্তমানে পরকীয়া চালিয়ে যাচ্ছে। মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। ষড়রিপুর দ্বিতীয় রিপু, ক্রোধ মাথায় চেপে বসে। হিতাহিতজ্ঞানশূণ্য হয়ে খুন করে বসে তার প্রেয়সীকে। ‘যে আমার হয়নি, সে অন্য কারো হবে না।’
শিল্প-সংস্কৃতির পীঠস্থান বহরমপুর শহর, আর গোরাবাজার তার হৃৎপিণ্ড। প্রেমিক যুগলদের হৃদয়ের ভাষাপ্রকাশের একটু নিরিবিলি জায়গার বড় অভাব। এ শহরের ‘গড়ের মাঠ’ হলো ‘স্কোয়ার ফিল্ড’ আর নতুন শপিং মলের আলোকসজ্জা ও ব্যস্ততার মধ্যে এই শহর খোঁজে ‘বো-ব্যারাক’, এসপ্ল্যানেড। কিন্তু ভাঙা হৃদয়ের ‘বোঝাপড়া’ যখন এই পরিবেশ বদলাতে পারে না তখন ভয়প্রদর্শনের জন্য খেলনা বন্দুক বের করতে হয়। কিন্তু কাঙ্খিত হৃদয় পাওয়া যায় না। উপরন্তু সে আরও ভয় পেয়ে যায়। পালিয়ে যেতে চায় সেই আক্রোশ ও প্রেমান্ধের বাহুজোড় থেকে। রাগ ও প্রতিহিংসা চড়তে থাকে। আধডজন ছুরিকাঘাতেও মাথায় উঠে যাওয়া, তাৎক্ষণিক ‘ইমপালস’ নামতে থাকে না। তখন সে কাউকে তোয়াক্কা করে না। নাগরিক সমাজকে খেলনা বন্দুক তাক করে থাকে। সবাই দু’পা পিছিয়ে যায়। কিছু ‘অসম সাহসী’ এরই মধ্যে ‘ভিডিয়ো’-কে ‘ভাইরাল’ করে। কোল খালি হয়ে যায় মায়ের। বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন বাবা। পরে হত্যাকারীকেও খোঁজ নিতে দেখা যায় তার ‘প্রেমিকার’ ব্যাপারে।
এই ঘটনার বীভৎসতা এখন বিদ্যুৎবেগে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। শিশু ও কোমলহৃদয়ের মানুষদের মধ্যেও এর প্রভাব পড়বে। শোকসন্তপ্ত পরিবারের পাশে থেকে তাদের মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং করা প্রয়োজন। অভিযুক্তের কঠোরতম শাস্তির দাবিও উঠছে। ইতিমধ্যেই তাদের পরিচয় এথিক্সের তোয়াক্কা না করেই গণমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনকে আরও গতিশীল হতে হবে। অপরাধীর সঙ্গে ক্রিকেট বা ক্যারাম খেলার ছবি কিংবা জেলায় নিষিদ্ধ ওষুধ ধরা, অস্ত্রোদ্ধারের ছবি যেমন প্রচারমাধ্যমে তুলে ধরা প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন জনমানসে ‘প্রশাসন’ সম্পর্কে ভীতিমূলক মানসিকতার পরিবর্তন করা।
একসময়ে নাগরিক সমাজের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ ছিল প্রশাসনের। আই.এম.এ, প্রবীণসভা, রোটারি, লায়ন্স, শহীদ ক্ষুদিরাম পাঠাগার, ঋত্বিক নাট্যগোষ্ঠী, রোকেয়া, পি.আর.সি, স্টুডেন্টস হেলথ হোম, রেডক্রশ প্রভৃতি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলির সঙ্গে নিয়মিত মিটিং এখন করা হয় না। শুধু আমলানির্ভর শাসনতন্ত্র এখন ‘ভিসি’ (ভিডিও কনফারেন্সিং) করে। প্রশাসনিক স্তরের নীতিপ্রণয়ণকারীরা বদলি হয়ে যান। জেলার মানুষের মনের কথা কেউ শোনে না।
তাই ভাগীরথীর তীরে সূর্য অস্তমিত হয়ে যায়। মনের অশান্ত বঞ্চনার ঢেউগুলি শান্ত হয়ে আসে। লালগোলা থেকে কলকাতার ট্রেনে সব সুখদুঃখের আদান প্রদান হয়। দুর্বল স্মৃতির মানুষ কয়েকদিন পরে আবার অন্য আলোচনার প্রসঙ্গে ঢুকে পড়বেন। গরম চায়ে চুমুক দিয়ে আমরা আবার রাজনীতি ও আইপিএল খেলার আলোচনায় ব্যস্ত হয়ে পড়ব। কারও কারও স্বপ্নে, অবচেতন মনে এই ঘটনা শিহরিত করে যাবে। সময় অশ্বমেধের ঘোড়ার মতো ছুটে চলবে। ঐতিহাসিক জেলায় এই অপমৃত্যুও স্মৃতি হয়ে থেকে যাবে।
(লেখক মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজের মনোরোগ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান। মতামত লেখকের ব্যক্তিগত। প্রতীকী ফিচার ছবিটি ইন্টারনেট থেকে নেওয়া)