সুদীপ জোয়ারদার

আলো হয়/গেল ভয়। ভয় কি আলো হলে যায়? যায়ই তো! যে কারণে রাত্রি হলে ভয়ের সব তরঙ্গ নানা দিক থেকে ছুটে আসে। যাঁরা মানসিক ভাবে একটু ভীতু প্রকৃতির রাত্রি এলে কেমন ভাবে ভয় এসে হাজির হয় তাঁরা ভালোই জানেন।
কথা হল, ‘আলো হয়/গেল ভয়ে’র স্রষ্টাও কি জানতেন এ কথা? অথবা ভয়ে পীড়িত হতেন আলো গেলে? ‘ফুরায় বেলা, ফুরায় খেলা, সন্ধ্যা হয়ে আসে/ কাঁদে তখন আকুল-মন, কাঁপে তরাসে’ তে যদিও সন্ধ্যা আসলে জীবনসন্ধ্যা, কিন্তু সন্ধ্যা হয়ে এলে মন যে কাঁপে ত্রাসে সেটা বিলক্ষণ জানা ছিল তাঁর, বেশ বোঝা যায়। ‘আমার ভয় করছে। বড় অন্ধকার।’ ‘সহজপাঠ’-এর ভীতু উল্লাসকে তো আমারা ছোটবেলাতেই পেয়েছি! খুব বিচ্ছিন্ন ব্যাপার একে মনে হয় না।
রাত্রি নিয়ে রানী চন্দকে একবার রবীন্দ্রনাথ তো বলেইছিলেন, ‘রাত্রিটা অসম্পূর্ণ সৃষ্টি টের পাওয়া যায়। যে-সময়ে গাছপালা ডালপালাগুলোকে পায়নি, পাখি তার পালক পায়নি; সেগুলো হচ্ছে দুঃস্বপ্ন বিধাতার।’ আর তাই ‘সহজপাঠ’-এ রাত্রি ‘কালো রাতি’ যাকে ঘুচিয়ে দেয়, মুছে দেয় যে, সে আলো!
‘আমি ভয় করব না, ভয় করব না/দু বেলা মরার আগে মরব না, ভাই, মরব না’ লাইন দু’টিতে কান পেতে আমরা শক্তি পাই। সেই সঙ্গে এ-ও মনে হয় কবি এখানে যেন  নিজেকে নিজেই উজ্জীবিত করছেন।’ cowards die many times before their death’ এর হালকা অনুরণন এবং তার চাইতেও অনেক বেশি শক্তিশালী অভিঘাত যেন এখানে। শুধু এই-ই বা কেন? ‘নাই ভয়, নাই ভয়, নাইরে/থাক পড়ে, থাক ভয় বাইরে’ এমন উজ্জীবন মন্ত্র তো তাঁর রচনায় বহু জায়গায় রয়েছে।
ভীতু মানুষের জন্য এত অভয়বাণী, এত ভয়কে জয় করার পথ বাতলে দেওয়া এ সব দেখে তাঁকে ভীতু মানুষ হিসেবে নিজের দোসর ভাবতে বেশ ভালোই লাগে। আর তাই তো তাঁর সাহিত্য সম্ভার থেকে খুঁজে খুঁজে চলি ভয়ের নানা চিহ্ন!
মরণকে ‘শ্যামসমান’ ভাবা খুব সহজ ব্যাপার নয়। এর জন্য অনেক পথ পেরোতে হয়। আবিষ্কার করতে হয় নিজের জন্য অভয়ের মন্ত্র। উদয়ের পথেও কান পেতে থাকতে হয় ‘ভয় নাই, ওরে ভয় নাই-/নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান/ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই’ এই প্রবোধ বাণীর জন্য।
এমন ভয়কে জয় করার পরেও তো ভয় থেকেই যায়। কেমন সে ভয়? ‘চিরকুমার সভা’য় পূর্ণ অক্ষয়বাবুকে ভারী সুন্দর একটা কথা বলেছে- ‘অভূতপূর্বের চেয়ে ভূতপূর্বকেই বেশি ভয় হয়।’ ‘সঙ্কটের কল্পনাতে ম্রিয়মাণ’ না হওয়ার নির্দেশ তাঁর গানেও রয়েছে। ভূতপূর্ব মানে সেই অমোঘ পিছুটান যা দু’পা এগোলে পিছিয়ে দেয় তিন পা। রবীন্দ্রনাথ বরাবরই ছিলেন এই পিছুটানের বিপক্ষে। ভূতপূর্বের নিগড়ে বন্দি মানুষ যে অচলায়তন গড়ে তোলে তাকে তাঁর লেখায় ভেঙে পড়তেও দেখি তাই।
‘ম্যাট্রিকুলেশনে পড়ে/ব্যঙ্গসুচতুর/বটকৃষ্ট ভীরু ছেলেদের বিভীষিকা।’ ‘ভীরু’ কবিতার এই লাইন ক’টি পড়লেই উঁকি দিয়ে যায় তাঁর জীবনের নর্মাল স্কুল পর্ব এবং সেখানে অধিকাংশ ছেলেদের ‘অশুচি, অপমানজনক’ সংস্রবে এক কোমল বালকের সিঁটিয়ে যাওয়ার ছবি। বিদ্যায়তনের এই ব্যাধিরই হয়তো নতুন নাম-‘র‍্যাগিং।’
‘চন্ডালিকার’ প্রকৃতি তার মাকে আর এক ভয়ের কথা জানিয়েছে- ‘ভয় করিনে মা/ভয় করি নে।/ ভয় করি পাছে সাহস যায় নেমে,/পাছে নিজের আমি মূল্য ভুলি।’ কী বলব একে? এখনকার ভাষায় কি এঁরই নাম ‘সেলফ কনফিডেন্স’! ‘আমরা শুনেছি ওই-/মাভৈঃ, মাভৈ্ঃ, মাভৈঃ’, যতই ভিন্ন প্রেক্ষিতে বলা হোক, এ কি নয়, সাহসকে ধরে রাখার উদ্দেশ্যেই তাঁর নিজস্ব এক অন্তর্গত উচ্চারণ!
শরীর থাকলেই ব্যাধি হয়। ব্যাধির ভয় কমবেশি সকলেরই আছে। রবীন্দ্রনাথও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। তবে শেষ বয়সে পীড়িত রবীন্দ্রনাথ যখন অস্ত্রোপচারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন স্বজনবন্ধুদের চাপে সে সময় তিনি ভয় পাচ্ছেন তাঁর দেহ অস্ত্রোপচারে ছিন্নভিন্ন হওয়ার। বলছেন, ‘আমি রোগকে ভয় করি না, ভয় করি চিকিৎসাকে।’
চিকিৎসার ভয়ের সঙ্গে আমাদের তো আবার দুঃখীরামের সেই বৈদ্যনাথ মানে ‘রোগীর বন্ধু’ও জুটে যায় হরদম। সরাসরি না হলেও আকারে ঈঙ্গিতে চলে সেই একই ভয় ধরানো- ‘মরবার সময় তার ঠিক আপনার মত চেহারা হয়ে এসেছিল।…ওই-রকম তার চোখ বসে গিয়েছিল, গালের মাংস ঝুলে পড়েছিল, হাত-পা সরু হয়ে গিয়েছিল,  ঠোঁট সাদা, মুখের চামড়া হলদে…’ ইত্যাদি ইত্যাদি।
স্ট্রেস আর অ্যাংজাইটির এই যুগে রবীন্দ্রনাথের লেখায় জীবনে ভয়কে কিন্তু এ ভাবে পড়ে নেওয়াই যায়। সবচেয়ে মজার ব্যাপার, নানাবিধ ভয় ধরে এগোতে এগোতে একসময় ভয়টা হারিয়েও যায় বেমালুম। কারণ, অন্ধকারের উৎস থেকেই উৎসারিত হয় আলো। যে আলোর আর এক নাম সেই রবীন্দ্রনাথই।

(ফিচার ছবিটি এঁকেছেন কৃষ্ণজিৎ সেনগুপ্ত)