অনিমেষ বৈশ্য

ভেবেছিলাম রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী হব। বোশেখ পঁচিশের সকালে লক্ষ্মীপুজোর মতো এ-পাড়ায় সে-পাড়ায় গান গেয়ে বেড়াব। সুন্দরী ঘোষিকারা আমার নাম উচ্চারণ করে বলবেন, ‘এ বার মঞ্চে আসছেন অমুক।’ আমি ঘনঘন ঘড়ি দেখব। তারপর গাইব, ‘তোমার সুরের ধারা ঝরে যেথায়…।’
এ-সব এ জীবনে কিছুই হল না। আমার জীবন নিয়ে কোনও আফসোস নেই। একটাই আফসোস, হারমোনিয়াম বাজিয়ে রবীন্দ্রসঙ্গীত শিখিনি। যাঁরা রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে পারেন, মহিলা মহলে তাঁদের খুবই কদর। আফসোসের সেটাও একটা কারণ বটে। সকালে টিভি চ্যানেলে খাতা খুলে গান গাইছি, এমন সময় নিউ ইয়র্ক বা ভূতগোবিন্দপুর থেকে কোনও কিন্নরকণ্ঠী বলে উঠবেন, ‘আপনার গান শুনে সকালটা ভালো হয়ে গেল। আপনি এ ভাবেই গেয়ে যান।’ আমি ঘাড়টা অনেকটা নুইয়ে বুকে হাত রাখব। আশ্চর্য প্রসন্নতা ফুটে উঠবে আমার মুখে। কিন্তু এ জীবনে কিছুই হল না।

এ-রকম  রংবাজি আমি জীবনে দেখিনি। দর্শকদের তুমুল আবদার প্রত্যাখ্যান করে তিনি ধীর পায়ে নেমে যাচ্ছেন। যেন কিছুই হয়নি, যেন এ- রকম তো কতই হয়, উফফ। হেমন্তবাবুকে ফাটাকেষ্ট মনে হচ্ছিল। কী রংবাজ! পকেটে পিস্তল নেই। ঝোলায় পেটো নেই। শুধু রবিবাবুর গান গেয়ে এ-রকম ‘রেলা’ দেখানো যায়?

সেই ইলেভেনে যখন পড়ি, তখন থেকে রবীন্দ্রসদনের সামনের মাঠে ভোরবেলায় গান শুনতে যেতাম। এখন সেই অনুষ্ঠান হয় না। মাঠই তো নেই। দু’একজন ছাড়া প্রায় সব শিল্পীই আসতেন। সবাই কিঞ্চিৎ অস্থির। এখানে গেয়েই আবার ছুটতে হবে অন্য কোথাও। শিল্পীদের এই অস্থিরতা আমাকে খুব টানত। কবির জন্মদিনে একটু অস্থির হব বলেই আমার গান শেখাটা খুব জরুরি ছিল। কিন্তু তা হয়নি। যাই হোক, শিল্পীরা একটি বা দু’টি গান গাইতেন। ভোরের বাতাসে ভেসে বেড়াতেন রবিঠাকুর।
তা একবার একটু বেলার দিকে মঞ্চে উঠলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। তিনি দু’টি গান গাইলেন। তারপরে দর্শকরা আর একটি গান গাইবার অনুরোধ জানালেন। হেমন্তবাবু হারমোনিয়াম ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর পিঠটা একটু চুলকে গম্ভীর গলায় বললেন, ‘আরও অনেকে আছেন।’ এই বলে তিনি নেমে গেলেন। এ-রকম  রংবাজি আমি জীবনে দেখিনি। দর্শকদের তুমুল আবদার প্রত্যাখ্যান করে তিনি ধীর পায়ে নেমে যাচ্ছেন। যেন কিছুই হয়নি, যেন এ- রকম তো কতই হয়, উফফ। হেমন্তবাবুকে ফাটাকেষ্ট মনে হচ্ছিল। কী রংবাজ! পকেটে পিস্তল নেই। ঝোলায় পেটো নেই। শুধু রবিবাবুর গান গেয়ে এ-রকম ‘রেলা’ দেখানো যায়? তা-ও ধুতি পরে! এরপর ভেবেছিলাম, আমি গায়ক হবই। কিন্তু আমি যত গানের কাছে যাই, গান আমার থেকে তত দূরে সরে যায়। কিছুতেই আর গায়ক হতে পারি না।
আজ সকালে টিভি খুলে শুনলাম, কারা যেন গাইছেন, ‘আকাশ জুড়ে শুনিনু ওই বাজে তোমারি নাম সকল তারার মাঝে…।’  মেঘলা আকাশ। থম মেরে আছে চরাচর। ঝড় আসবে নাকি! আমার খাটের ফাঁকে, দেওয়ালের ঝুলে, হলুদ হয়ে যাওয়া বইয়ের পাতার ফাঁকে গানের সুর ঘুরছে, ‘মন মিলে যায় আজ ওই নীরব রাতে/ তারায় ভরা ওই গগনের সাথে।’ একবার, দু’বার। ‘মন মিলে যায় আজ ওই নীরব রাতে…।’
চোখের কোণা ভিজে উঠছে। আজ আর শিল্পী হতে ইচ্ছে করছে না।

(ফিচার ছবি ইন্টারনেট থেকে নেওয়া)