কৌশিক আচার্য

কেন জানি না ২২ তারিখ রাত থেকেই দৃশ্যটা বার বার মাথায় আসছে। বৈদ্যুতিন মাধ্যমের ক্যাকোফনি ছাপিয়ে ভেসে উঠছে সোনার কেল্লা ছবির সেই অংশটুকু। যোধপুর সার্কিট হাউসে ছদ্মবেশী ডঃ হেমাঙ্গ হাজরা ওরফে ভবানন্দ জাতিস্মর মুকুলকে হিপনোটাইজ করে পৌঁছতে চাইছেন সোনার কেল্লার সুলুক সন্ধানে। চোখের পাতা ভারী হয়ে আসা মুকুলের ঠোঁট কেঁপে ওঠে। অস্ফুটে ভেসে ওঠে তিনটি শব্দ— জয়   সল মীর। ভুঁয়ো ভূ-পর্যটক মন্দার বোসের কপট উল্লাস ধরা পড়ে তাঁর সংলাপে— “কিসের মাসি কিসের পিসি, কিসের বৃন্দাবন, এতদিনে জানলাম আমি কোথায় গুপ্তধন।”
অর্পিতা মুখোপাধ্যায়ের ডায়মন্ড সিটির ফ্ল্যাট থেকে বিপুল পরিমাণে কালো টাকা উদ্ধারের পরে এমন হাজার হাজার মন্দার বোস সামাজিক মাধ্যম থেকে বৈদ্যুতিন মাধ্যম আলো করে বসে আছেন। গুপ্তধন আবিষ্কারের উত্তেজনার আগুনে প্রতি মুহূর্তে গা সেঁকে নিচ্ছেন নিজেদের মতো করে। সমস্ত বিষয়টাই গুলিয়ে দিতে দোসর মিডিয়াকুল। আসলে গুলিয়ে দিতে হয়। রাষ্ট্রশক্তির ইচ্ছেয় ও নির্দেশে। রাজ্যের প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী অনেকদিন ধরেই তদন্তের আতসকাচের নীচে। বার দু’য়েক সিবিআই দফতরে হাজিরাও দিয়েছেন। শিক্ষা দফতরে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যে পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতি হয়েছে তার হাতেখড়ি তাঁর জমানায়। মহামান্য আদালতের কাছে কানমলা খেয়ে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলি জামার আস্তিন গুটিয়ে খানিক সক্রিয়ও বটে।

একটি নির্বাচিত সরকারের শীর্ষস্থানীয় একজন ক্যাবিনেট মন্ত্রী তথা দলের মহাপঞ্চক (নাকি মহাতঞ্চক?) তথা শৃঙ্খলারক্ষা কমিটির বড়কর্তা শুধুমাত্র ক্ষমতার অপব্যবহার করে যে সম্পদ ও সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন তার আঁচ সরকার এবং সরকারের শীর্ষনেত্রী টের পাননি এ কথা শুনে নজরুল মঞ্চ আলো করে বসে থাকা উমেদাররা তালি বাজাতেই পারেন। এটাই এখন ভাতাজীবী বাঙালির ভবিতব্য। আসলে যখন একটা সংগঠিত অপরাধ ঘটে তখন তার শিকড় বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকে।

তার মাঝেই শাসক দলের শহিদ দিবস। নেপোয় দই মারার পুরোনো প্রচলিত প্রবাদকে প্রমাণ করে দীর্ঘদিন ধরে ২১ জুলাইয়ের কপিরাইট এখন শাসকদলের কুক্ষিগত। যদিও পুলিশের গুলিতে নিহত কংগ্রেসি শহিদদের স্মৃতির অলিন্দে এখন টলিপাড়ার মৌরসিপাট্টা। রাত পোহাতে না পোহাতেই খোদ প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রীর দুয়ারে ইডি। রাজ্যজুড়ে খানাতল্লাস। ভর সন্ধ্যায়, চ্যানেলে চ্যানেলে সেই বার্তা রটি গেল ক্রমে/বিশ কোটি নগদ উদ্ধার হইল নর্মসঙ্গী হোমে। মাঝ রাতেই গ্রেফতার পার্থবাবু। তারপরের ঘটনাক্রম সবার জানা। জনপ্রিয় ওয়েবসিরিজ ‘মির্জাপুর’-এর আদলে হইচই করে রিলিজ হয়েছে ‘শিক্ষাসুর’। রোজ নতুন মোড়। নতুন বাঁক। বান্ধবীর সংখ্যার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে পার্থবাবুর অবৈধ সম্পত্তির হিসেব নিকেশ। সৌজন্যে মিডিয়াকুল।
এ বিষয়ে সম্প্রতি হাটে হাঁড়ি ভেঙেছেন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি নুথালাপতি ভোঙ্কট রমানা। গেল হপ্তায় রাঁচীতে একটি অনুষ্ঠানে তিনি স্পর্শকাতর বিষয়ে বিভিন্ন চ্যানেলে প্রাইম টাইমে বসা বিতর্ক সভাকে একপেশে আদালত বা ‘ক্যাঙ্গারু কোর্ট’ বলে অভিহিত করেছেন। পাশাপাশি এই ক্যাঙ্গারু কোর্ট এবং সামাজিক মাধ্যমের বিষয়টি না জেনে বা বুঝে কেবল নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যপূরণের জন্য বিতর্ক করা গণতন্ত্রের স্বাস্থ্যর জন্য ক্ষতিকর বলেও ইঙ্গিতবাহী মন্তব্য করেছেন মাননীয় বিচারপতি। একদম অব্যর্থভাবে মৌচাকে ঢিল! এ ভাবেই তো গুলিয়ে দেওয়া হয়।
রাজ্য জুড়ে বিগত দশক ধরে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া জুড়ে যে মানি ট্রেল চলেছে তাকে ব্যক্তিগত দুর্নীতির তকমা এঁটে দেওয়ার নির্লজ্জ প্রয়াস ইতিমধ্যেই শাসকদলের তরফ থেকে শুরু হয়ে গিয়েছে। নজরুল মঞ্চের বঙ্গবিভূষণ পুরস্কার প্রদানের অনুষ্ঠানে প্রশাসনের শীর্ষ থেকে সেই বার্তা পাঠানো হয়েছে। যাকে এক কথায় বলা যায় প্রসেস অফ ডিসএ্যসোসিয়েশন। এ-ও এক ধরনের গুলিয়ে দেওয়া। যার দোসর মিডিয়া ও সামাজিক মাধ্যম। বৈধ চাকরি প্রত্যাশী যে হবু শিক্ষক ও শিক্ষিকারা প্রায় পাঁচশো দিন ধরে খোলা আকাশের নীচে ধর্ণায় বসে আছেন তাঁদের কোনও নেতা নেই। কোনও তহবিল নেই। শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা, তাঁদের মাথার উপরে কোনও পার্টির ছাতা নেই। ঠিক ওঁদের দিক থেকে দৃষ্টিটা ঘুরিয়ে দেওয়াটাই উদ্দেশ্য। যাতে আমজনতা একটা প্রজন্মের ভবিষ্যতের ও আইনি প্রক্রিয়ার মীমাংসার বদলে মিম নিয়েই ব্যস্ত থাকে। এটাও একটা খেলা। যে খেলা গত লোকসভা নির্বাচনের সময় থেকেই শাসক দলের ঘোষিত নীতি।
একটি নির্বাচিত সরকারের শীর্ষস্থানীয় একজন ক্যাবিনেট মন্ত্রী তথা দলের মহাপঞ্চক (নাকি মহাতঞ্চক?) তথা শৃঙ্খলারক্ষা কমিটির বড়কর্তা শুধুমাত্র ক্ষমতার অপব্যবহার করে যে সম্পদ ও সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন তার আঁচ সরকার এবং সরকারের শীর্ষনেত্রী টের পাননি এ কথা শুনে নজরুল মঞ্চ আলো করে বসে থাকা উমেদাররা তালি বাজাতেই পারেন। এটাই এখন ভাতাজীবী বাঙালির ভবিতব্য। আসলে যখন একটা সংগঠিত অপরাধ ঘটে তখন তার শিকড় বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকে। কানে টান পড়লে মাথাব্যথা হওয়াটাও সমীচীন। কাজেই অফেন্স ইজ দ্য বেস্ট ডিফেন্স। রয়্যালটি, সুরকার, পেনশন ছুঁয়ে শেষে আলকাতরা! কোটা সিস্টেমের সরকারিকরণ! টাকার বিনিময়ে চাকরি বিক্রিকে ব্যক্তিগত ভুল বলে দায় এড়িয়ে যাওয়া এবং ভুল শোধরানোর সুযোগ আদায়ে সিলমোহর! আঁধারে ডুবতে থাকা একটা রাজ্য তথা জনগোষ্ঠীকে আর একবার গুলিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা।
আসলে অন্ধকারের রং তো কালোই হয়। মহামান্য আদালতের নির্দেশে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার এই সক্রিয়তা অতীতের নারদা অথবা সারদাকাণ্ডের তদন্তের মতো শীতঘুমে যাবে কিনা তা নিয়েও সন্দেহ অমূলক নয়। গতকাল টেলিফোনে এই বিষয় নিয়েই কথা হচ্ছিল এক পুরনো বন্ধুর সঙ্গে। টেলিফোন রাখার আগে সেই ‘সোনার কেল্লা’ ছবিতে যোধপুর সার্কিট হাউসে চিন্তামগ্ন ফেলু মিত্তিরের কথা ধার করে বলেই ফেললাম, “নিশ্চিন্ত আর থাকা গেলো না রে তোপসে। ….ভালো লাগছে না। একটা নকশা চোখের সামনে ভেসে ভেসে উঠছে। আবার মিলিয়ে যাচ্ছে ! কয়েকটা লোক। তাদের কেউ কেউ মুখোশ পড়ে রয়েছে। কেউ বা আবছা আলোয়। কেউ বা অন্ধকারে!” কে জানে ঠিক বললাম কিনা!
(ফিচার ছবি ইন্টারনেট থেকে নেওয়া। মতামত লেখকের ব্যক্তিগত)