দেবর্ষি ভট্টাচার্য

ছেলেবেলার আবছা স্মৃতিগুলোর সাথে ইদানিং প্রায়ই দেখা হয়ে যায়। পথে, ঘাটে, প্রান্তরে, কাশফুলের সোহাগ জড়ানো নদীবাঁকে, শরতের নীলাকাশে উড়ে বেড়ানো মেঘবালিকাদের লেখা পুজোর গন্ধ মাখা চিঠির খামে। মেঠো জনপদের ধার ঘেঁষে সার সার পসরা সাজিয়ে দোকানীর গ্রাসাচ্ছাদনের শ্বাসপ্রশ্বাস। রংবেরঙের চুড়িতে মাখানো জ্যোৎস্নার সোহাগ। টগবগে কড়াইয়ে ফুটছে আড়াই প্যাঁচের রসনার তৃপ্তি। নাগরদোলার দোলাচলে সকল যন্ত্রণার ক্ষণিক প্রশমন। লাল ফিতের বাঁধুনিতে নিটোল খোপা যেন স্বপ্নবোঝাই। ঘর, গেরস্তালিময় পুজোর গন্ধ। শরতের ঝকঝকে সোনালী রোদের বাহুতে ভর করে দুলছে খুশির অষ্টপ্রহর। বাংলার গ্রাম, শহর, প্রান্তরের অন্তরাত্মা জুড়ে কেবলই উৎসবের সানাই, আলোর রোশনাই। পুজো এসে গেল বলে!

বঙ্গদেশের আপামর মানুষ কদিনের জন্য যেন বিস্মৃতির বালুচরে চেপে রেখে দিতে চায় জীবন-যন্ত্রণার সকল প্রদাহ, সকল অধরার গ্লানি, সকল বঞ্চনার দগদগে ক্ষত, সকল অতৃপ্তির বেদনার গাঢ় রক্তস্রোতের আন্দোলন। শরতের উৎসব মুখরিত আকাশে বাতাসে তো কেবলই থাকার কথা শিউলি ঝরা বাঁশির মূর্ছনার তোলপাড়। ধরার যা কিছু দুষ্ট, যা কিছু অনিষ্ট, সেই সকল কালিমা মুছে দিতে জগৎ-জননী মহামায়া শুধুমাত্র ‘মাতৃরূপেণ সংস্থিতা’ হয়েই আবির্ভূতা হবেন এমন প্রত্যাশায় শুধু নয়, তাঁর ‘সাম্যরূপেণ সংস্থিতা’ হয়ে আবির্ভূতা হওয়ার আশায়ও বুক বেঁধে থাকে মর্ত্যলোকের সকল চৈতন্য। অথচ এই মনকেমনের উৎসবের দিনেও এত অসাম্য, এত বৈষম্য, এত হাহাকার, এত অবিচারের ভারতবর্ষের হৃদ মাঝারে একাত্ম হয়ে কান পাতলেই মনে ধন্দ জাগে বৈকি! দেবী দুর্গা কি আদৌ সর্বজনীন হয়ে উঠতে পেরেছেন আপামর জনমানসের হৃদয়ের অন্তঃপুর জুড়ে!

করোনা বিধ্বস্ত কালে পুজোর গন্ধে আদিগন্ত জুড়ে যেন বিষাদের আঘ্রাণ। কচিকাঁচাদের প্রাণোচ্ছল ছুটোছুটি থাকবে না, কৈশোর অতিক্রান্তের দরজায় অবাধ যৌবনের কড়া নাড়ার উদ্দামতা থাকবে না, জীবন সংগ্রামে জর্জরিত প্রৌঢ় গৃহকর্তার মনে বাড়ির জন্য বাজারের বোঝার দায় থাকবে না, এ আবার কেমন পুজো!

শিয়ালদহ-কৃষ্ণনগর লোকাল ট্রেনে গান গেয়ে সংসার চলত বীরনগরের বীণার। কিংবা কলকাতা-লালগোলা এক্সপ্রেস ট্রেনে ডিম বিক্রি করে তিন ছেলেমেয়ের ভরা সংসার চালাতেন বেলডাঙার নিমাই। এমন বহু জীবিকাহারা মানুষজন শরতের নিদ্রাহীন রাতে অসহায়তার যন্ত্রণায় দাঁতে দাঁত চেপে আশার ঝিলিকে বুক বেঁধে  রয়েছেন রেলগাড়ির বাঁশি শোনার অন্তহীন অপেক্ষায়। কলে-কারখানায়, হাটে-মাঠে-ঘাটে, মায় বহুল প্রচারিত সংবাদপত্রের আপিসের নীচে … সর্বত্রই কর্মহারা মানুষের থমথমে মুখের ঢল। কার্তিকের জ্যোৎস্না গায়ে মেখে শারদ রজনীর তাতে বয়েই গেল! নিকানো মণ্ডপের ‘শক্তিরূপেণ সংস্থিতা’ দেবী দুর্গা দূর থেকে স্বপ্নের শবযাত্রা দেখেও ‘সাম্যরূপেণ সংস্থিতা’ হতে আর পারলেন কই!

আমি আদতে জংলী মানুষ। ফি বছর জঙ্গলের আদিমতার মাঝে আবাহন করে থাকি জগজ্জননী মহামায়াকে। শরতের সোনা রোদ্দুর যখন জঙ্গলের গভীরতার ফাঁকফোকর না পেয়ে অবসন্নতায় ঢলে পড়ে পাহাড়ের আহ্লাদী কোলে, আগাছাকীর্ণ গাছেদের গা বেয়ে জংলী সন্ধ্যা যখন ঝুপ করে নেমে আসে, সেই সান্ধ্যক্ষণেই বোধন হয়ে যায় আমার দুর্গার। সবুজ আদিগন্ত প্রান্তরের নিকানো মণ্ডপে যখন চেয়ে থাকি জৌলুসহীন আটপৌরে জগৎজননীর মাতৃসুধা ভরা মুখপানে, সকলের অলক্ষ্যে দেখে ফেলি দেবীর ত্রিনয়নের কোণে চিকচিক করে ওঠা স্বচ্ছ বিন্দুগুলি। জল? হবে হয়তো! তবে কি স্বাধীনতার ৭৩ বছর পরেও সকলের মা হয়ে উঠতে না পারার বেদনার গ্লানিতে দেবী মনও বেদনাক্লিষ্ট! নাকি ভারতভূমিতে ‘সাম্যরূপেণ সংস্থিতা’ হয়ে আবির্ভূতা হতে না পারার আত্মগ্লানি! তা না হলে, এমন আনন্দ সমাগমেও মা দুর্গার চোখ কেন এমন টলোমলো! সত্যি তো, জগজ্জননী মহামায়া হয়েও তিনি আজও বুভুক্ষু কৃষকের, ক্ষীণকায়া শ্রমিকের, নগ্ন মণিপুরীর, নিষ্পাপ কাঠুয়া শিশুর, উন্নাও কিংবা হাথরসের ধর্ষিতার, শাসক প্রণীত আইনের জাঁতাকলে সরকারি জাবেদায় নিজভূমে হঠাৎ পরবাসী বনে যাওয়া কয়েক লক্ষ নিরাপরাধ মানুষের জননী হয়ে উঠতে পারলেন কি! এঁরা সকলেই তো আজ ‘বহুজন সুখায় চ, বহুজন হিতায় চ”-র এই দেশে শক্তিহীনা! মাতৃহারা!

এই যন্ত্রণাক্লিষ্ট শারদ উৎসবের মাঝে কর্মহারাদের উৎকণ্ঠিত মন কখনও ছুটে যাবে বোকা বাক্সটার ডাকে। বিত্তবানের মাতৃ আবাহনের জন্য বরাদ্দ অর্থমূল্যের পরিসংখ্যান শুনে হয়তো চমক জাগবে বিষাদগ্রস্ত মনেও। হৃৎপিণ্ডটাকে কে যেন দুহাতে পাক মেরে দেবে। ফিনকি দিয়ে ছিটকে উঠবে রক্তের তপ্ত লাভা … মননে, চৈতন্যে। সেই ক্ষণে হয়তো ঘ্রাণ আসবে লক্ষ লক্ষ সহনাগরিকদের জ্বলে খাক হয়ে যাওয়া ‘ভারতীয় ভবিষ্যৎ’ থেকে গলগল করে উছলে ওঠা অনিশ্চয়তার নিকষ কালো ধোঁওয়ার। কিংবা হাথরসের দুর্ভাগা মেয়েটির রাতভর লাশ পোড়া গন্ধ। স্পষ্টত দৃশ্যমান হয়ে উঠবে আমাদের সমাজ, রাজনীতি, প্রশাসন, আইনের চালচিত্র। অব্যক্ত যন্ত্রণার ভারে মণ্ডপের সুসজ্জিতা প্রতিমার ঠোঁট যদি কেঁপে ওঠে! যদি চিকচিক করে ওঠে মহামায়ার ত্রিনয়ন!  ঠিক তখনই শারদোৎসব সত্যি সত্যিই ‘সর্বজনীন’ হয়ে উঠবে এই ব্যাধিগ্রস্ত বিশ্ব চরাচরে!

 (লেখক বঙ্গবাসী সান্ধ্য কলেজের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ও বাণিজ্য বিভাগের বিভাগীয় প্রধান)