কল্লোল প্রামাণিক

এই সময়টার জন্য অপেক্ষায় থাকে গোটা গ্রাম। এই সময়টার জন্য অপেক্ষায় থাকেন কর্মসূত্রে ভিনদেশে থাকা ছেলেরা। এই সময়টার জন্য শ্বশুরবাড়িতে অপেক্ষায় থাকেন গ্রামের মেয়েরা।
কেন?
মুরুটিয়া থানার সীমান্তঘেঁষা গ্রাম দিঘলকান্দির বাসিন্দারা সমস্বরে বলছেন, ‘‘কেন আবার কী? ফুটবল!’’
কথাটা অবশ্য কথার কথা নয়। নৈশ ফুটবল প্রতিযোগিতা যে এ ভাবে উৎসবের চেহারা নিতে পারে তা দিঘলকান্দি বছরের পর বছর প্রমাণ করে দিয়েছে। আগামী শুক্রবার প্রতি বছরের মতো এ বারেও দিঘলকান্দি ফুটবল ময়দানে একদিনের নৈশ ফুটবল প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। দিঘলকান্দি কিশোর সঙ্ঘের পরিচালনায় ওই প্রতিযোগিতায় নদিয়া, মুর্শিদাবাদ ও দুই ২৪ পরগনার মোট ১৬টি দল যোগ দেবে। ফাইনালে জয়ী দলকে চ্যাম্পিয়ন ট্রফি ও নগদ চল্লিশ হাজার টাকা এবং রানার্স দলকে ট্রফি ও পঁচিশ হাজার টাকা দেওয়া হবে।
নৈশ ফুটবল প্রতিযোগিতার আয়োজকেরা জানাচ্ছেন, ক্লাবের প্রাক্তন সদস্য সমীর মণ্ডলের স্মৃতিতে ২০০৭ সাল থেকে শুরু হওয়া এই প্রতিযোগিতার নাম ‘সমীর স্মৃতি কাপ’। ক্লাবের অনেক সদস্য রুজির টানে দুবাই, কুয়েত, কাতার, সিঙ্গাপুর ও দেশের নানা প্রান্তে থাকেন। কিন্তু এই সময়ে ঘরের ছেলেরা ঘরে ফেরেন। শ্বশুরবাড়ি থেকে মেয়েরাও চলে আসেন বাপের বাড়ি।
ইতিমধ্যেই দুবাই থেকে বাড়ি ফিরেছেন নরেশ বিশ্বাস। ব্যাঙ্গালোর, ওড়িশা থেকে ফিরেছেন প্রসেঞ্জিৎ বিশ্বাস ও মণীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁরা জানান, বিদেশ থেকে সাধারণত ঈদ, দুর্গাপুজো বা অন্য কোনও উৎসবকে কেন্দ্র করে সবাই বাড়ি ফেরেন। কিন্তু দিঘলকান্দির যুবকেরা বাড়ি ফেরেন এই ফুটবল উৎসবে। কারণ, দিঘলকান্দির সবচেয়ে বড় উৎসব এই ‘নৈশ ফুটবল প্রতিযোগিতা’।
দিঘলকান্দি কিশোর সঙ্ঘের সম্পাদক রতন বালা বলছেন, ‘‘২০০৭ সাল থেকে ক্লাবের নিজস্ব মাঠে আমরা এই ফুটবল প্রতিযোগিতার আয়োজন করে আসছি। ওই বছরেই অগস্টের শেষ দিকে তৎকালীন ক্লাব সম্পাদক সমীর মণ্ডল মারা যান। তাঁরই স্মৃতিতে প্রতি বছর ২ সেপ্টেম্বর এই ফুটবল প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। এই খেলার জন্য আর্থিক ব্যয়ভার বহন করেন ক্লাবের সদস্য ও গ্রামের বাসিন্দারা।’’
রতনের সংযোজন, ‘‘এ বারের চ্যাম্পিয়ন দলের জন্য নগদ চল্লিশ হাজার টাকা দিচ্ছেন প্রসেঞ্জিৎ বিশ্বাস কনস্ট্রাকশন গ্রুপ ও রানার্স দলের জন্য পঁচিশ হাজার টাকা দান করছেন মণীন্দ্রনাথ ঠাকুর।” দিঘলকান্দির সুপ্রিয়া দেবীর শ্বশুরবাড়ি বনগাঁয়। তিনি বলছেন, “আমার মতো এলাকার অনেক মেয়েরা দুর্গাপুজোতে বাবার বাড়ি না এলেও খেলা উপলক্ষে সকলেই বাবার বাড়িতে আসে। সবার সঙ্গে এই সময় দেখা হয়। আমরা সকলেই রাত জেগে এই খেলা দেখি।’’
খেলা উপলক্ষে মাঠের পাশে বসে বিরাট মেলা। এ ভাবেই ফুটবল মিলিয়ে দেয়। গোলপোস্টের নেটে বাঁধা পড়ে যায় তামাম গ্রাম। সবকিছু গৌণ হয়ে গিয়ে মুখ্য হয়ে ওঠে স্রেফ ফুটবল!