কৌশিক গুড়িয়া

খেলা শুরু হওয়ার বারো কি চোদ্দো মিনিট পরে বিপক্ষের তিন জন প্রায় আমাদের বক্সের কাছাকাছি উঠে এসেছে। আমার বন্ধুরা বেশ দূরেই। আমার পিছনে শুধু গোলকিপার, অতনু। সাহিনুর উল্টোদিক থেকে চিৎকার করছে, “এগিয়ে আয়, এগিয়ে আয়, আটকা আটকা…”

খেঁকশিয়ালের মতো ছুটে এসে বলের উপর সজোরে এক লাথি মারলাম। দেখি প্রতিপক্ষ ও আমার পায়ের মাঝে পড়ে বলটি সোজা আকাশে উড়ে গেল, অ-নে-ক উঁচুতে…! এবং অবশ্যই তাকে পাওয়া গেল সাইড লাইনের বাইরে। তারপর সে কী চিৎকার! বন্ধুরা এসে জড়িয়ে ধরল। যেন উদ্ধার করে ফেলেছি দলকে। নির্ঘাত গোল খাওয়া থেকে বাঁচিয়েছি আমাদের দলকে…

খেলা শেষে ম্যাচ ড্র হল। আমারা তখন সিক্সে পড়তাম। সেদিনই প্রথম বাবা-মাকে লুকিয়ে ব্যাগের মধ্যে বল নিয়ে স্কুলে গিয়েছিলাম। নাইলনের লাল বল। হালকা, তবে বেশ টাইট। গায়ে হালকা সাদা সাদা ছোপ। তখনও চামড়ার ফুটবল ছুঁয়ে দেখিনি। শনিবার ছিল। তাই স্কুল শেষে মাঠেই খেলা ছিল আমাদের। দেরি করে ফিরেছিলাম বলে বাড়িতে বকুনিও জুটেছিল।

কিন্তু সেদিনের খেলায় দ্বিতীয় বার বলে পা লাগানোর ক্ষমতা হয়নি আমার। বন্ধুদের তুলনায় শীর্ণ ছিলাম। শক্তিও ছিল না তেমন। ভয় পেতাম। ফলে ফুটবলটা ঠিক আমার খেলা হয়ে ওঠেনি কোনওদিন! তবে শৈশব থেকে কৈশোরের আওতায় এলে তো লোভ থাকে, হিরো হতে পারার বাসনা থাকে, সেই লোভেই মাঠে যেতাম। যখন একটু বড় হলাম, পাড়ায়-পাড়ায় ম্যাচ হতো। দলে আমার নাম থাকত ঠিকই, আমি কিন্তু মনে মনে চাইতাম এগারো জনের পরে যেন আমি থাকি। কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে দেখভাল করতাম, ক্লাব ঘর থেকে আরও একটা বল আনার দরকার পড়লে আমারই ডাক পড়ত। অগত্যা, ফুটবল মরসুমে মাঠে যখন থাকতেই হতো আমি অপেক্ষাকৃত সহজ মনে করে গোলকিপার সাজতাম। হ্যাঁ, সেটা ছিল সাজাই। প্রকৃত প্লেয়ার হতে গেলে কেমন হতে হয় তা হয়তো আমিনুল ইসলাম, ধীমান দাস আপনাদের মতো কারও কাছে শেখার প্রয়োজন ছিল…

ফুটবল যে কতটা প্যাশন হতে পারে, কতটা ভালোলাগার জমি দখল করে নিতে পারে, মুর্শিদাবাদের শিশু-ফুটবলারদের নিয়ে আমিনুল সেটা করে দেখাচ্ছেন! বিভিন্ন দৈনিকের খবর পড়ে মনে হচ্ছে ডোমকলের ‘বেবি লিগ’ যেন প্রতিনিয়ত ফুটবলে তা দিচ্ছে। মা-পাখি যে ভাবে তার বাসায় সযত্নে ডিমগুলিকে লালন করে, যে ভাবে ঝড় ও বৃষ্টির রাতে কুসুম-উষ্ণতার চাদর ঢেকে দেয়। এ যেন ঠিক তেমনটাই।

আমার যখন দু’বছর বয়স তখন পেলে কলকাতায় প্রথম আসেন। মোহনবাগানের সঙ্গে সেইসব স্মৃতি বাবা এখনও নানা প্রসঙ্গে বলেন। কিন্তু কেন জানি না, পেলের নাম শুনলে শ্রদ্ধা আসে, ভালোলাগার পারদ গরম হয়। তবে সেটা ফুটবলের আকর্ষণ নাকি পেলের ব্যক্তি ক্যারিশমা তা আমার কাছে এখনও পরিষ্কার নয়। ২০১৫ সালে পেলে যখন দ্বিতীয় বার কলকাতায় এলেন আমি কিন্তু তাঁকে দেখতে যাওয়ার তাগিদ অনুভব করিনি।

৮৬-র বিশ্বকাপ শুরুর আগে কলকাতার একটি হোসিয়ারি কোম্পানি কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে জানিয়েছিল, পোস্টকার্ডে সম্ভাব্য বিজয়ীর নাম পাঠান। উত্তর ঠিক হলে থাকবে বিশেষ পুরস্কার। আমারই উৎসাহে পোস্টকার্ড পাঠিয়েছিলেন বাবা। আর্জেন্টিনার নাম লিখে সেবার আমরা পুরস্কারও পেয়েছিলাম। আমার ফুটবল প্রেম কিছুটা এরকম ছিল। কিন্তু সরাসরি মেঠো-ফুটবল আমাকে সেভাবে সাফল্য দেয়নি। বরং সমবয়সী প্রায় সবাই যখন টিভিতে মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গলের খেলা থাকলে উন্মাদ হয়ে যেত, আমি খানিক বিব্রত বোধ করতাম। আমরা যাঁদের বাড়িতে ভাড়ায় থাকতাম, টিভিতে খেলা দেখতে যেতাম তাঁদের বাড়িতে। ফুটবল দেখতে যাওয়ার দুটো কারণ থাকত। প্রথমত বাড়ির পড়া থেকে রেহাই, দ্বিতীয়ত সে বাড়িতে মুড়ি-মাখার সঙ্গে সুন্দর দার্জিলিং চা পাওয়া যেত। আজ স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে, টিভি দেখতে পালানোটা ততটা মোহনবাগান বা ইস্টবেঙ্গলের প্রতি প্রেম থেকে ছিল না। তবে আরও একটু বয়স বাড়লে মোহনবাগানের নামে কেন জানিনা একটু বেশি দরদ অনুভব করতাম! তবে ইস্টবেঙ্গলের কৃশানু-বিকাশের জুটি বেশ প্রিয় ছিল। প্রিয় ছিল ভাস্কর গাঙ্গুলির গোলকিপিং। তারও পরে চিমাদের যুগ এল। মনে পড়ে কোনও এক দুপুরবেলা শুনেছিলাম, গলায় পেয়ারা আটকে মারা গিয়েছিলেন কলকাতা ময়দানের সুদীপ। সে সময়কার প্রায় সবার অটোগ্রাফ এখনও আমার পুরনো খাতায় জমানো আছে…

তখনও ওয়াইন কোম্পানিরা ক্লাবের মালিক হয়ে ওঠেনি। বাবা একবার চুনী গোস্বামীর কাছে নিয়ে গেলেন। চুনী তখন নেতাজি ইন্ডোরের একটি কেবিনে বসতেন। সেভাবে ফুটবলের কাছে যাওয়া হয়নি আমার, হয়তো  খেলোয়াড়দের গ্ল্যামার বেশি টেনেছে আমাকে। নইমুদ্দিনকে খুব স্টাইলিশ মনে হত আমার, একবার অটোগ্রাফ নিতে গিয়ে তাঁর কাছেই প্রথম রে-ব্যান দেখেছিলাম। দেখেছিলাম, সানগ্লাসের একটি হাতল দাঁত দিয়ে চেপে আমার নোটবুকে সই করছেন।

একটা কথা ছোটবেলা থেকে আজও মাঝে মাঝে শুনি, প্রায়ই লোকে বলেন এত কোটির দেশ আমাদের, তবুও আমরা এখনও আন্তর্জাতিক মানের একটা টিম তৈরি করতে পারলাম না কেন? মানছি যে, ফুটবল জনগণের খেলা। মানছি ফুটবল বাঙালির আবেগ। কিন্তু যে কোনও বিষয়েই উপযুক্ত বা স্পেশ্যালিস্ট হতে গেলে আজকের দিনে আবেগ কিন্তু শেষ কথা নয়। শেষ কথা হল কতটা পরিকাঠামো ও কতটা নিখুঁত টেকনিক আমরা ব্যবহার করব। ফুটবল-সফল দেশগুলো তাদের সরকারি বাজেটে কত শতাংশ খেলার খাতে বরাদ্দ করেন, সেই বিষয়টি একবার আমাদের দেশ বা রাজ্যের বাজেট-বরাদ্দের পাশে রাখলেই পরিষ্কার হয়ে যাবে। বাবা ক্রীড়া দফতরের আধিকারিক ছিলেন। শুনেছি, রাজ্যের ক্রীড়া-বরাদ্দের ৮০ শতাংশই নাকি কর্মীদের মাইনে দিতে খরচ হয়ে যায় (১৯৯৮-৯৯ পর্যন্ত)! তাহলে ২০ শতাংশ দিয়ে কি সাফল্যের নাগাল পাওয়া সম্ভব?

তবে আমিনুল, ধীমান আপনাদের কাছে অনুরোধ, এ সব মাথায় আনবেন না। পরিকাঠামোর পাশাপাশি প্রেম যে বিশ্বজনীন এক অস্ত্র, সেটা আপনারা ফুটবল দিয়ে প্রমাণ করেছেন। তাই আশা তৈরি হয়, বেবি ফুটবল থেকেই একদিন দেশের পতাকা উড্ডীন করবে জেলার ‘বেবি’রা।