সুদীপ জোয়ারদার

‘এটা কাপড় না গামছা? বচ্ছরকার দিন, এমন শাড়ি কেউ দেয়!’

কত বছর আগের কথা হবে? চল্লিশ? না আরও একটু বেশিই হবে বোধহয়। তা সময় যাই হোক, কাজের বাড়ির পুজোর শাড়ি নিয়ে মনামাসির এই ক্ষোভ আমি এখনও পুজো এলেই শুনতে পাই। এটা নির্ভুল শোনার জন্য আমার কোনও টাইম মেশিন লাগে না।

অবশ্য শরৎ নামের আশ্চর্য এক ঋতু থাকতে আলাদা টাইম মেশিনের দরকারই বা পড়বে কেন ! শরৎ, সে যে নিজেই আস্ত একটা পিছনমুখী টাইম মেশিন। বর্ষা সরে যেতে আমাদেরকে সে তার মেশিনে বসিয়ে নিয়ে শুরু করে দেয় দৌড়।

কোথাও,পথের হদিশ জানা সেই চিরকালীন ‘কাস্তে-কাকা’ নিজেই এসে শুধোয়-‘বললে না তো কোন পথ খুঁজছ!’ আবার কোথাও আমি নিজেই নেমে পড়ি কাস্তে-কাকার ভূমিকায়। ধানবোঝাই গরুর গাড়ির গাড়োয়ান যখন শুধোন মাস্টার বাড়ির পথ, আমি এক লাফে গরুর গাড়িতে উঠে বসে আমাদের বাড়ির দিকে নিয়ে  চলি তাঁকে।

এই সরে-সরে যাওয়া স্টেশনের কোনও একটার প্ল্যাটফর্মে দেখা হয়ে যায় মনামাসির সঙ্গে। আর শুনে চলি কাজের বাড়ির কাপড় নিয়ে তাঁর ক্ষোভ।

শরৎকে বলেছি বটে পিছনমুখী টাইমেশিন। কিন্তু মনামাসি এই টাইম মেশিনটাকে কী এক অদ্ভুত উপায়ে পিছন থেকে একের পর এক স্টেশন টপকে একেবারে নিয়ে এসে হাজির করেন আমাদের ছোট্ট ফ্ল্যাটটাতে। শুধু তাই নয়, মনামাসি মেশিন থেকে নেমে আমাদের গৃহকাজের সাহায্যকারিণীকে শুধোন-‘ভাল আছিস  চন্দনা?’

‘চন্দনা তোমার চেনা?’ প্রশ্নটা করার আগেই মনামাসি চন্দনাকে শুধোন-‘পুজোয় সব বাড়ি বোনাস দিল রে?’

চন্দনা কাজ থেকে মুখ তুলে বলে-‘এই বাড়ি আর মোড়ের ওই কাকিমার বাড়ি ছাড়া কই আর দিল!  এ বার যা গেল! কাজ থেকে ছাড়ায়নি, এই বাঁচোয়া!’

‘-তোর কাজ যায়নি। কিন্তু তোদের পাড়ার ছবির কাজ গিয়েছে দু’বাড়ি। আসতে আসতে আরও শুনলাম জবা ডাক্তারের বাড়ি বোনাস চেয়েছিল। পাঁচশো টাকা ধরিয়ে দিয়েছে। অথচ কথা ছিল ওর এক মাসের মাইনে পনেরোশো টাকা বোনাস দেবে। ওকে নাকি ডাক্তার-বউ সাফ বলে দিয়েছে,এর বেশি পারবে না।’

চন্দনা হেসে বলে-‘এ আর বেশি কী। আমার বোন দুর্গা এক কাজের বাড়ি বোনাস চেয়েছিল। বলেছে,  বোনাস নাও। পুজোর পরে আর এসো না।’

অতীত বর্তমান আমার কাছে তালগোল পাকিয়ে যায়। তবে যে শুনি, ওঁরা আর ‘ঝি’ ‘কাজের মেয়ে’, ’কাজের মাসি’ নন! সভ্যতা ওঁদের নতুন পোশাক দিয়েছে, ‘গৃহ সহায়িকা’, ‘কর্ম সহায়িকা’! তা হলে পোশাকই শুধু দেওয়া হয়েছে,আর কিছু নয়!

মনে আছে করোনার প্রথম পর্বে ওঁদের নিয়ে বেশ হইচই হয়েছিল। সেই সময় সোশ্যাল মিডিয়াতেও অনেকে গৃহকাজের সাহায্যকারিণীকে সবেতন ছুটি দিয়ে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপনের গল্প ফলাও করে প্রচার করেছিলেন।

অবশ্য তখনই এইসব গল্পে কান পেতে বোঝা গিয়েছিল, প্রচারকারীদের দরদের খতিয়ান। সবেতন ছুটি দেওয়ার অন্তরালে একটা প্রশ্ন উঁকি দিয়েছিল সেই সময়েই। ব্যক্তিগত কারণে কোনও কর্মসহায়িকা ছুটি নিলে, তবে কি এর আগে ওখানে অন্য ‘ট্রিটমেন্ট’ করা হত!

প্রশ্নটা যে ভুল ছিল না, করোনার দীর্ঘস্থায়ী মৌরসিপাট্টা বুঝিয়ে দিচ্ছে হাড়ে হাড়ে। আর তাছাড়া করোনায় কর্মসহায়িকাহীন জীবনযাপনে মানুষ বোধহয় একটু বেশি সাহসী হয়ে গিয়েছে বাড়ির কাজ নিজে সামলানোর ব্যাপারে। কিন্তু এর সঙ্গে তো আমানবিক আচরণের কোনও সম্পর্ক নেই!

হ্যাঁ, যাঁদের নিয়ে কথা হচ্ছে তাঁদের একাংশের আচরণও হয়তো কখনও কখনও আমাদের ব্যথিত করে। কিন্তু দাঁড়িপাল্লায় আমাদের আচরণের পাল্লা ওঁদের আচরণের পাল্লার চেয়ে এখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যে ভারী তা বেশ দেখতে পাচ্ছি।

মনামাসির সেই ক্ষোভের যুগে ভড়ং কম ছিল। এককালে, সেই যে এক অক্ষরে কবিতা বানিয়ে এক সাহিত্য-আসর মাত করেছিলেন দাদাঠাকুর,  ‘ঝি/কি/ঘি/দি’, সেখানে ‘ঝি’কে তখনও সেন্সর করার ভাবনা গজিয়ে ওঠেনি। আমরা এ কবিতা যত্রতত্র বলে মজা নিতে পারতাম দেদার।

তারপর, ‘নিতাইবাবু বলিতেছিলেন-‘চিত্তে সুখ নেই দাদা। ঝি-বেটী পালিয়েচে,খুকিটার জ্বর…।’ পরশুরামের  ‘বিরিঞ্চিবাবা’র এই সংলাপ পড়ে তখন আমরা কে না হেসেছি! আর শরৎচন্দ্রের ‘চরিত্রহীন’ উপন্যাসের  সাবিত্রী! শরৎচন্দ্র যেভাবে তাঁর সঙ্গে আমাদের প্রথম পরিচয় করিয়েছিলেন আজকের দিনে  হলে তার নিশ্চিত আপত্তি উঠত। ‘সাবিত্রী বাসার ঝি এবং গৃহিনী। চুরি করিত না…।’ বাংলা সাহিত্যের অন্যতম নারীচরিত্র কাহিনিতে আসছে এ ভাবে, ভাবা যায়!

-‘মনামাসি, তুমি কি তোমার সেই স্টেশনটায় ফিরে যাবে না? চলো তোমাকে দিয়ে আসি।’

-‘চল তবে।’ আমার কথায় মনামাসি আবার উঠে বসে শরৎ নামের টাইম মেশিনে। ওঠার আগে চন্দনার দিকে তাকিয়ে বলে- ‘সেসময় শাড়ির নামে পুজোর সময় কোনও কোনও বাড়িতে গামছা দিলেও, অন্য জিনিসে পুষিয়ে দিত। তোদের কালে তো দেখছি সবেতেই মনিবের হাতভারী!’

‘গৃহিনী সর্বজয়াকে মাস দুই বেশ যত্ন করিয়াছিলেন। হালকা কাজ দেওয়া, খোঁজ খবর নেওয়া। ক্রমে ক্রমে অন্য পাঁচজনের সমান হইয়া দাঁড়াইতে হইল। বেলা দুইটা পর্যন্ত কাজ করার পর প্রথম প্রথম সে বড়  অবসন্ন হইয়া পড়ে, এভাবে আগুনের তাতে থাকার অভ্যাস তাহার কোনো কালে নাই…’ , ‘পথের পাঁচালী’র এ সেই চেনা গল্প যেখানে সব হারানো সর্বজয়ার অপুকে নিয়ে রাঁধুনির বৃত্তি আঁকড়ে বাঁচতে চাওয়ার বর্ণনায় আমরা আজও চোখ সজল করে ফেলি।

কিন্তু এ উপন্যাস। বাস্তবের সর্বজয়াদের প্রতি আচরণে যদি আমাদের সেই মন-কেমনের ছোঁয়া আর একটু লাগত, তা হলে পুজোর এই মরসুমে মনামাসিকে এতটা পথ পেরিয়ে এসে শুধোতে হত না,  ‘চন্দনা, সব বাড়িতে বোনাস দিয়েছে রে?’

(ছবিটি গুগল থেকে নেওয়া)