পিয়াসী বিশ্বাস

লুডো। শহর-ছোঁয়া মফস্সলের নামী ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের ডেটা-শিটে অবশ্য নাম সৌজন্য রায়। ওহো! ভুল বললাম। পাড়ার শেষপ্রান্তে মাত্র ৫৭ জন পড়ুয়া নিয়ে টিমটিম করে টিকে থাকা প্রাইমারি ইস্কুলের নাম-ডাকার খাতাতেও অবশ্য কালো কালিতে পুরনো ছাঁদের হাতের লেখায় জ্বলজ্বল করে লুডোর পোশাকি নামটাই।

লুডোর দুটো ইস্কুল, দু’জন প্রাইভেট টিউটর, দুটো সাইকেল, দুটো এয়ারগান, খাঁচায় দুটো বদ্রি পাখি চিকু-মিকু আর কোন্নগর-বহরমপুর মিলিয়ে দু’জন দাদু। লুডোর মানডে টু ফ্রাইডে সকাল থেকে দুপুর স্কুল। স্যাটারডে-সানডে জোড়া ছুটি। প্রতিদিন অল্টার করে টিউশনের স্যররা আসেন সন্ধ্যায়। আর স্যাটারডে-সানডে বিকেল জুড়ে থাকে ক্যারাটে, ড্রয়িং, রিসাইটেশন আর স্যুইমিং ক্লাস। এখানকার বাড়িতে লুডোরা তিন জন। লুডো, পাপা আর মাম্মাম। লুডো জানে, পাপা বাড়িতে থাকলে ল্যাপটপ খুলে গম্ভীর মুখে ইংলিশে কনফারেন্স কল অ্যাটেন্ড করে। আর মাম্মাম যেহেতু কনসালটেন্ট তাই ফোনে হিংলিশে বকবক করে। না, না আপনারা যেমনটা ভাবছেন তেমনটা কিন্তু একেবারেই নয়। লুডোর কপাল কিন্তু খুব ভাল। ওর এই ছয় বছর বয়সে ও একদিনও পাপা আর মাম্মামকে একসঙ্গে ব্যস্ত থাকতে দেখেনি। হয় মাম্মাম ওর সঙ্গে থেকেছে, নয় পাপা। একা হওয়া কী, লুডো জানে না।

ওহো! আর একটা কথা বলাই হয়নি। ইদানীং কোনও কোনও স্যাটারডে লুডো পাড়ার শেষমাথার প্রাইমারি ইস্কুলে যায়-টায়।  আগে যেত না।  ক’দিন আগে ওই ইস্কুলের হেডস্যর নাকি ফোন করে পাপাকে ‘রিক্যুয়েস্ট’ করেছে লুডোকে মাঝে মাঝে ইস্কুলে পাঠাতে। মাম্মাম আর পাপা দু’জনেই কোনও স্যাটারডেটে ফ্রি থাকলে লুডোকে কাজের বুয়ার হাত ধরে ওখানে পাঠিয়ে দেয়।  লুডোর একটুও ভাল লাগে না। ওই স্কুলে কাজের বুয়ার ছেলেও তো পড়ে। আর পড়ে কয়েকটা ছেলেমেয়ে যারা কোথায় থাকে লুডো ঠিক জানে না। শুধু জানে ওরা ধাক্কাধাক্কি করে, ম্যানার্স জানে না। আর থালা বাজাতে বাজাতে মিডডে-মিল খায়। তার পরে ছুটি হলে নিজেরাই রাস্তা দিয়ে হেঁটে বাড়ি চলে যায়!

এই স্কুলে মাত্র দু’জন স্যর।  ক্লাসে বাংলায় কথা বলে আর সোজা সোজা কোয়েশ্চেন করে। আনসার দিতে না পারলেও পানিশ করে না। ইংলিশ ক্লাসে রাইমগুলোর সাথে সবাইকে নাচতে বলে আর গাইতে বলে। লুডো মাঝে মাঝে কনফিউজড্ হয়ে যায়, বুঝতেই পারে না কোন্ সাবজেক্টের ক্লাস হচ্ছে! মাঝে মাঝে এই স্কুলের ঘাসজমিটায় ওই ছেলেমেয়েগুলোর সঙ্গে হুড়োহুড়ি করতে ইচ্ছে করে বটে, কিন্তু মাম্মাম স্ট্রিক্টলি বারণ করেছে ওদের সঙ্গে না মিশতে। সো…!

এই স্কুলের কপিগুলো আর বইগুলো লুডোর ‘ভালো স্কুল’-এ পড়ানো হয় না।  লুডোর প্রাইভেট টিউটররাও এগুলো পড়ান না।  পাপা আর মাম্মামও এই স্কুলের আলাদা ব্যাগ খুলে কখনও লুডোকে পড়ার কথা বলে না।  লুডো বুঝতেই পারে না, এই মিনিংলেস স্কুলটায় তাকে পাঠানোর মানে কী! যদি পাপা-মাম্মাম প্রাইভেট টাইম কাটাতে চায়, দে শ্যুড্ ডু না! লুডো নোজ্ ইট্। যখন বড়রা নিজেদের মধ্যে গল্প করে তখন সেখানে ঘুরঘুর করতে নেই। লুডো ইজ্ নট্ লাইক দিস্ গাইস্ যারা খেলতে খেলতে টিচারস্ রুমেও ঢুকে পড়ে!

লুডো এ সব কাউকে বলে না।  কমপ্লেইনও করে না। কারণ, লুডো এখান থেকে বাড়ি ফিরেই লাঞ্চ করে ড্রয়িং ক্লাসে চলে যায়। সেখান থেকে ক্যারাটে আর তার পরে টায়ার্ড হয়ে ফিরে খেয়েদেয়েই ঘুম।  আর সানডে মর্নিংয়ে আর কিছুই মনে পড়ে না ডিউ টু চিকু অ্যান্ড মিকু।

রিসেন্টলি লুডোর দু’টো দাঁত পড়েছে। এটুকুই যা স্যাড। বাকি সব একদম ঠিকঠাকই চলছিল। কিন্তু পাপা আর মাম্মাম একটু টেনশনে আছে ফ্রম ইয়েসটারডে নাইট।  খুব ব্যস্ত হয়ে ওর ফেন্ডস্ দের বাড়িতে ফোন করছিল আর লোকাল নিউজ চ্যানেল দেখছিল।  লুডোর স্কুলে নাকি কী সব ফান্ড রিলেটেড ইনভেস্টিগেশন হয়েছে। আর সেই জন্য নাকি অনেকদিনের জন্য স্কুল ফুললি ক্লোজড্ থাকবে।

সত্যিই তো! লুডো কোথায় যাবে? ওই প্রাইমারি ইস্কুলে কি রোজ যেতে হবে! না, না লুডো ভাবতেও চায় না ও সব বাজে কথা। খেলনা এয়ারগানটা নিয়ে লুডো ব্যালকনিতে গিয়ে একটা ফায়ার করে। চিকু-মিকু কিচমিচ করে ওঠে।

পাপা— “বছরের মাঝখানে কোনও নামী স্কুলে অ্যাডমিশন পাওয়া যাবে না। বুঝতে পারছ, আমি কী বলছি!”

মাম্মাম– “তা বলে সাতসকালে কনসালটেন্সি ছেড়ে আমিও লুডোকে টাইম দিতে পারব না। গট ইট? (পাপার থেকেও বেশি জোরে)

লুডো ফিক করে হেসে ফেলে, “টাইম কে চেয়েছে ! আই নো হাউ টু বি বিসি…”

যাক গে! লুডো আর কান দেয় না। তার পরে ব্যালকনির রেলিংয়ের উজিয়ে নীচে তাকায়। হোয়াট আ সারপ্রাইজ্! সেই পচা ইস্কুলের স্যরটা না! হাতে একটা বড় ব্যাগে একগাদা ফুলগাছ নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। লুডো চেঁচিয়ে বলে, “ওহ্…হ্যাল্লো….ওওও….” স্যর উপরে তাকাতেই লুডো ফোকলা দাঁতে হেসে বলে, “স্যর…”

স্যর হেসে নিজের ব্যাগটা দেখিয়ে বলেন, “মাই চিকু-মিকু |”  তার পরে “বাই সৌজন্য” বলে হেসে এগিয়ে যান।

লুডো দৌড়ে ঘরে ঢুকে মাম্মামকে বলার আগেই থেমে যায়। আচ্ছা, স্যর কী করে চিকু-মিকুকে চিনল! অ্যাঁ? পরদিন লুডো মাম্মামের সাথে স্কুল যায়। মানে, নিরুপায় হয়ে প্রাইমারি স্কুলে। মাম্মাম ওকে ক্লাসরুমে বসিয়ে দিয়ে টিচার্স রুমে চলে যায়।  অন্য বাচ্চারা ফ্যালফেলিয়ে দেখে।

শুরুর ক্লাসে ওই ‘স্যর’ আসে। নাম ডাকার খাতা নিয়ে পরপর দু’বার ডাকে, “সৌজন্য রায়”(এখানে স্যরের গলা)।  তার পরে তৃতীয় বার, “…লুডো”

অন্যমনস্কতা ভেঙে লুডো বলে, “প্রেজেন্ট স্যর।”  আর তার পরেই আবার আশ্চর্য হয়ে যায়! স্যর কী করে ওর নিক নেম জানল! এ কি ম্যাজিশিয়ান নাকি রে বাবাহ্?!

পরপর ক্লাস চলে।  তারপরে মিডডে-মিল। সবাই দৌড়ে বেরিয়ে যায় ব্যাগ রেখে।  লুডো টিফিন বক্স বের করে নুডলস্গুলো হাতে তুলে দুলিয়ে দুলিয়ে খেতে শুরু করে। হঠাৎ স্যর ঢোকেন! লুডো ভ্যাবাচ্যাকা! স্যর মিষ্টি হেসে একদম লুডোর পাশটায় বসেন। তারপর নিজের টিফিনবক্স খুলে হাতে আমের আচার নিয়ে বলেন, “খাবে নাকি লুডোবাবু?”

লুডো বলে, “কী এটা?”

স্যর বলে, “আমের আচার…”

—-ম্যাংগো পিকল্? ওয়াও!

—-খাও খাও

—-আচ্ছা, তুমি কী করে জানলে আমার নাম লুডো?

আলাপ ক্রমে জমে ওঠে…

—আচ্ছা লুডোবাবু, এ ইস্কুল তোমার পছন্দ নয় বুঝি?

—না, খেলার কেউ নেই।

—কেন? এতজন আছে!

—মাম্মাম বারণ করেছে ওদের সাথে মিশতে। কথা বলতেও ইচ্ছে করে না কারও সাথে।

—ও, আর আমার সাথে?

—অল্প অল্প।

—শোনো লুডোবাবু, বলতে যখন ইচ্ছে করে না, তা হলে বরং লেখো।

—কী?

— এই যে, এই ইস্কুলে এসে রোজ যা যা দেখছ, যা যা করছ, যা কিছু নতুন লাগছে… তাই।

—ইউ মিন ডায়েরি?  ইংলিশে লিখব? আমি বাংলা ভাল লিখতে পারি না।

—যা খুশি। তোমার যে ভাষায় লিখতে ইচ্ছে করবে তুমি সেই ভাষাতেই লিখবে।

রোজ রোজ টানা এই পচা ইস্কুলে লুডো প্রথম বার। এমন আজব স্যরও প্রথম। আর, এমন আজব হোমটাস্কও প্রথমবার।

লুডোর ডায়েরি…

ডে ওয়ান: টুডে আই হ্যাভ ডান্সড্ উইথ মাই ফ্রেন্ডস্ অন আ রাইম। ইট ওয়াজ্ নাইস্।  ফাউন্ড অ্যান অ্যান্ট-হাউজ্ বিসাইড আওয়ার ক্লাসরুম।

ডে টু: আই হ্যাভ ড্রন আ ফ্রগ এন্ড ইটস্ ‘ব্যাঙাচি’। হোয়াট আ ফানি নেম। খুউব হেসেচি।

দিন ছয়: মজার স্কুল। ভাল ওরা। ওরা বন্দু। আজ আই হ্যাভ শেয়ারড্ মাই টিফিন উইথ তোপু। আই লাভ ইউ আচার-স্যর।

ইদানীং লুডো এয়ারগান চালায় কম। ব্যালকনির রেলিংয়ে ভর দিয়ে চিকু-মিকুকে শোনায়, “…হাঁসগুলি ভেসে ভেসে করে কোলাহল…” | লাল সাইকেলের ঝুড়িতে রেখেছে হলুদ চরকিটা। আচার-স্যার বানানো শিখিয়েছে ক্লাসে। মন চাইলে লুডো এখন পাপা-মাম্মামের কথার মাঝখানে দৌড়ে গিয়ে দু’জনকে হামি খেয়ে আসে।

টানা ১৩টা দিন। রোজ ইস্কুল। আদর্শপাঠ শিশুনিকেতন।  শনিবারের রাত।  লুডো মাম্মামকে হাতের ছায়া দিয়ে হরিণ বানানো দেখাচ্ছে। হঠাৎ ফোন কানে পাপা এসে বলল, “শুনছ, নেক্সট উইক থেকে লুডোদের স্কুল ফুল ফেজে শুরু হচ্ছে। উফ, নিশ্চিন্ত হলাম গো।”

দশ মিনিট পরেও দেওয়ালে ছায়ার হরিণ নড়ছে না। মাম্মাম কী যেন ভাবছে। পাপা আনমনে লুডোর ‘সহজ পাঠ’  উল্টোচ্ছে। আর লুডো আজ আর একবার কনফিউজড্। আচার-স্যর, হেডস্যর, তপু, পিঁপড়ের বাসা, ঘুগনি দিয়ে ইস্কুলের ভাত, ইঁদুরের গর্তে ফেলে আসা লুডোর তিন নম্বর দাঁতটা… লুডোকে ভাবাচ্ছে। কাকে জিজ্ঞাসা করবে লুডো? চিকু-মিকুকে? পাপা-মাম্মামকে? নাকি আচার-স্যারকে?

নেক্সট মানডে আসতে দু’দিন বাকি। মানে, মাঝে শনি আর রবিবার।  উইকেন্ড। পাপা আর মাম্মাম এই দু’দিন পুরো ছুটি নিয়েছে। না না, শর্ট ট্রিপের কোনও প্ল্যান নেই।  ওরা একসাথে তিন জন বসে একটু ভাববে। পাপা-মাম্মাম-লুডো গালে হাত দিয়ে শুধু ভাববে… ভাববে…

লুডো জানে, দেয়ার উইল বি আ ম্যাজিক! হবেই। হতেই হবে।