শুভদীপ ভট্টাচার্য

স্কুলবাড়িটার পাশেই বেড়ে উঠেছে অনাদরের ঘাস। গাছের পাতাগুলি একটু বেশিই সবুজ। ঝোপ-জঙ্গল বেড়ে এমন হয়েছে যেন দামাল শিশু। খিলখিলিয়ে হাসছে। বড় ফটক পেরিয়েই খোপ খোপ স্কুলঘর। পাল্লা একটু ঠেলতেই বিশ্রী আওয়াজ হল। এগিয়ে গেলেন বৃদ্ধ হেডমাস্টার। স্কুল-বেঞ্চের উপর জমে আছে ধুলোর পুরু চাদর। আলতো করে চাদর সরিয়ে মাস্টারমশাই দেখলেন, একটি খোদাই করা নাম- ‘মৃত্যুঞ্জয়’। বিকেলবেলার রোদ অনুমতি ছাড়াই ঢুকে পড়েছে ঘরে। অলস বিড়াল লাফ দিয়ে বাইরে যেতেই মাস্টারমশাইয়ের চোখে চিকচিক করে ওঠে ফেলে আসা সময়।

ভারতে প্রথম করোনা ধরা পড়ে ৩০ জানুয়ারি। কথায় রয়েছে “যস্মিন দেশে যদাচার”। গণতন্ত্রের শ্রেষ্ঠ পীঠস্থানে তখন ট্রাম্পের লক্ষ্য আমেরিকান-ভারতীয় ভোটব্যাঙ্ক। সাড়ম্বড়ে হল উদযাপন। বিদেশ তখন লাশ সাজাচ্ছে গণকবরে। ভয়ের খাপ খুলছে পাশ্চাত্য। মাস না পেরতেই মারির ছায়া পড়ল ভারতেও। তবে এ বার আর পাইক এসে জানায়নি, বন্ধ কর পাঠশালা। খোদ হীরকরাজের একদিনের ঘোষণায় গোটা দেশ হয়ে গেল ‘অবরুদ্ধ কাশ্মীর’। প্রথমে জনতা কারফিউ। তারপরে লকডাউন। রাষ্ট্রীয় সমনে বন্ধ হল স্কুল-কলেজ-আপিস-আদালত-বন্দর-কারখানা। সঙ্গীহীন একলা রাস্তা, শাবলতলার মাঠ। বিষণ্ণ অপু-দুর্গা। পাঠশালা বন্ধ যে!

মাস পেরোতেই মাঠ না যাওয়া ছেলের হাতে মাল্টিমিডিয়া। অনলাইন ক্লাস। বৃদ্ধ শিক্ষকের কপালে সেই থেকে চিন্তার ভাঁজ। যুগ যুগ ধরে জাতির মেরুদণ্ড গড়ে তুললেন যাঁরা তাঁদের চোখে অশনি সঙ্কেত। চিন্তা অমূলক নয়, কারণ মৃত্যুঞ্জয়েরা সত্তর শতাংশের আওতায়। ওদের নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। বাবা ইটভাটার শ্রমিক, মা পরিচারিকা। লকডাউন ঘোষণার পরে কাজ নেই। ‘ডিজিটাল স্বপ্ন’ সোনার পাথরবাটি মৃত্যুঞ্জয়দের। মানুষের সুবিধায় একে একে খুলে যায় প্রায় সমস্ত প্রতিষ্ঠান। ‘সিলেক্টিভ’ কর্মীর যোগদানে খানিক খুঁড়িয়ে চলা শুরু করে সময়ের রথ। থমকে থাকা সময়টাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বাজারে হয় জমাটি ভিড়। বাজার ফেরতা লোক দেখে স্কুলবাড়ির ঘুলঘুলিতে পাখির বাসা, গাছতলায় কুকুরের জটলা। আর রিলিফ দেওয়ার দিন কতিপয় “সবুজের অভিযান”।

মহামারির স্কুল যেন বিস্মৃত যুগের টাইমমেশিন। সকলের শিক্ষার সুনিশ্চিতকরণে তার উপর দিয়ে উড়ে যায় ‘জাতীয় শিক্ষানীতি’র উড়োজাহাজ। জাহাজ থেকে তামাম ভারতবর্ষে ছুড়ে দেওয়া হয় কালো কালির হরফ। ফুটে ওঠা সেই হরফ জানান দেয় ম্যাসিভ ওপেন অনলাইন কোর্সের। অর্থাৎ শিক্ষা হবে ভার্চুয়াল। ক্লাস মানে অনলি নেট। নেই বন্ধু-সহপাঠী। প্রয়োজন থাকবে না স্কুলবাড়ি, উদয়ন পণ্ডিত বা সূর্যপদ মাস্টারদের। শিক্ষক দিবসের আয়োজন সাঙ্গ হলে ছাত্রেরা আর পা ছুঁয়ে প্রণত হবে না শিক্ষকের কাছে। সিঙ্গল ইউনিট পরিবারের কল্যাণে ঘুচেছে অবনত শিরের দিন। গোটা সমাজটাই জেট-গতিতে হয়েছে উদ্ধত।

পরীক্ষা পাশের সঙ্গে সঙ্গে জুটেছে আনকোরা কাগজের উপর কালো হরফ ছাপা ডিগ্রি। কিন্তু পাল্লা দিয়ে বাড়ল কি সামাজিক দায়-মূল্যবোধ? শহরের বুকে ঠায় দাঁড়িয়ে লাঠি হাতে মহাত্মা। হরেক কিসিমের ফ্লেক্সে আঁকা মহাত্মার চশমা। তাতে লেখা “স্বচ্ছ ভারত”। মহাত্মার মুখও কোথাও কোথাও হারিয়ে গিয়েছে বিজ্ঞাপনে। ষাট ছুঁইছুঁই শিক্ষকের চোখে পড়ন্তবেলার রোদ। বাড়িতে তাঁর নাতিরও চলছে “অনলাইন ক্লাস”। যন্ত্রের ওপার থেকে নিঃশ্বাস ছেড়ে ছাত্রের মনে অন্য বিশ্বাস।

মৃত্যুঞ্জয়ের মাথার উপর টিনের চালা। বর্ষায় জল পড়ে থইথই করে ঘর। লকডাউনের পরে বাবার ভরসা একশো দিন। মায়ের সঙ্গী ধার করে কেনা সেলাই মেশিন। বৃদ্ধ শিক্ষকের মুখভার। জলে ভিজে যায় চোখ। মৃত্যুঞ্জয়েরা যে শতাংশে সত্তর। ছয় ইঞ্চির রঙিন স্ক্রিন ওদের কাছে নকশিকাঁথার মাঠ। মৃত্যু হয়তো জয় করেই নেবে তৃতীয় বিশ্ব। কিন্তু জীবনকে জয় করা অধরাই থেকে যাবে না তো? হাতের ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে শিক্ষক ভাবেন, বেঞ্চের উপর পুরু হয়ে যা জমে রয়েছে তা কি স্রেফ ধুলো নাকি মৃত্যুঞ্জয়দের অভিমান?

(ফিচার ছবিটি গুগল থেকে নেওয়া)