কনিষ্ক কাশ্যপ

ফিরোজা নীল আকাশ, ভেসে বেড়াচ্ছে সাদা তুলোর মতো মেঘ। গভীর রাতে হালকা কুয়াশার আস্তরণ জমছে, ভোরবেলা শিশির ভেজা ঘাসের গালিচায় টুপটাপ ঝরে পড়ছে শিউলি। সকালে উঠে এ সব দেখলেই ছেলেবেলার স্মৃতি ফিরে আসে। নব্বইয়ের দশকে স্মার্টফোন কল্পবিজ্ঞানের বস্তু। ফোনের সঙ্গে ক্যামেরা থাকবে, এটাও ভাবা যেত না। কিন্তু মনের ক্যামেরায় তোলা সে সব ছবি আজও অমলিন। এ বার করোনা যেন সেই পুজোকেই ফিরিয়ে এনেছে। ঠাকুর দেখার মিছিলে শামিল হওয়া নেই, তাড়াহুড়ো নেই। পুজো মানে ঘরে, চিলেকোঠায়, ছাদে এক অখণ্ড অবসর!
পঞ্চমীর রাতে এই লেখা লিখতে লিখতে এ সবই মনে হচ্ছিল। এক লহমায় যেন সিকি শতক পিছিয়ে গিয়েছি। ঘুম ভাঙলেই বোধনের সকাল। বেলগাছের তলায় দেবীর বোধন হবে, শুরু হবে বাঙালির সেরা শারদোৎসব। বোধন শব্দের অর্থ জাগ্রত হওয়া। নিদ্রা থেকে হোক, কিংবা অজ্ঞানতা থেকে। প্রশ্ন হচ্ছে, দেবীর বোধন না-হয় হল, বাঙালির বোধন হবে কি? করোনা পরিস্থিতিতে যে ভিড়ের ছবি ফুটে উঠেছে, উৎসবের ভিড় ঠেকাতে হাইকোর্টকে নির্দেশ দিতে হয়েছে। অথচ ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যরক্ষার কারণে মানুষেরই তো এই সচেতনতা দরকার ছিল!
বাঙালির মজ্জায় ইদানীং আরও কিছু অজ্ঞানতা ঢুকে পড়েছে। যেমন ধর্মীয় গোঁড়ামি, কথায় কথায় ধর্মীয় পরিচয় টেনে নিয়ে আসা। অথচ সংস্কৃতিগত ভাবেই তামাম আর্যাবর্ত থেকে বাংলার সাংস্কৃতিক ঔদার্য ছিল পৃথক। সেই কারণেই দুর্গাপুজোকে শারদোৎসবে উন্নীত করতে পেরেছিলেন আমাদের পূর্বসূরিরা। একটা পুজোয় সমাজের সব স্তরের মানুষ, সব ধর্মের মানুষের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ সংযোগ বোধহয় আর কোথাও দেখা যায় না। সেই কারণেই বাড়ির পুজোর দালান থেকে সর্বজনীন আঙিনায় আসতে পেরেছেন দুর্গা। কালে কালে মূল স্রোতের পুজো হয়ে উঠেছে পাড়ার মণ্ডপে কিংবা গ্রামের চণ্ডীমণ্ডপে আসীন দশভূজা। তিনি তখন আক্ষরিক অর্থেই সর্বজনীন এবং সর্বজননী! সেই বোধ হারাচ্ছি আমরা। সর্বজনীন আঙিনাতেও ধর্মীয় গোঁড়ামিকে টেনে আনছি, সযত্নে পুঁতছি সাম্প্রদায়িকতার বিষ। এই অজ্ঞানতাকে সরিয়ে ঔদার্যের বোধন হবে কি?
ফিরে যাই গোড়ার কথাতে। কেন এ বারের পুজো ছোট্টবেলার কথা মনে পড়িয়ে দিচ্ছে, তার সুলুকসন্ধানে। নব্বইয়ের দশকের সেই দিনে দূষণ ছিল না, ছিল না আবালবৃদ্ধবনিতার সামাজিক ‘সেলিব্রিটি’ হওয়ার ইঁদুরদৌড়। বরং ছুটির অবসরে পাড়ার মণ্ডপে, বাড়ির চিলেকোঠায় কিংবা গলিতে আড্ডা জমত। হাসি, ঠাট্টা, মস্করা ছিল। ছিল ক্যাপ-বন্দুক, ছিল মিছিমিছি চোর-পুলিশের লড়াই। সেই আমলে পুজোর দুপুরে কচি পাঁঠার ঝোলের ভুরিভোজ ছিল, ছিল পাকা কাতলার তৃপ্তির ঢেঁকুর। আক্ষরিক অর্থেই পুজোর ছুটি ছিল, ছোটাছুটি নয়। তাই বাতাসের কম কার্বনকণায় কুয়াশার পরত তৈরি হত, ভোরে জমত শিশিরকণা। শিউলি ঝরার টুপটাপ শব্দ মিলত আর হাওয়ায় মিলত পুজোর গন্ধ।
সে সব কোথায় গিয়েছিল, তা খোঁজার অবসর গত দেড় দশকে বাঙালি পায়নি। থিম পুজোর লড়াই কলকাতা ছাড়িয়ে শহরতলি, মফসসলে ঢুকেছে। পুজো আনন্দ নয়, ডেকে আনত পুরস্কারের টেনশন। বিচারকমণ্ডলীর অভ্যর্থনায় পাড়ার লোকজন মণ্ডপে আড্ডা জমাতে পারতেন না, ছোটরা ক্যাপ-বন্দুক নিয়ে ছুটতে পারত না, বোধনের আগে অসুরের গায়ে, সিংহের মুখে হাত দিতে পারত না। কোনও কোনও মণ্ডপে চেনা দুর্গার মুখই হারিয়ে গিয়েছিল। কুমোরের শিল্পের সহজতা, মিষ্টতা থাকত না, ডাকসাইটে শিল্পীর তাত্ত্বিক ব্য়াখ্যায় বেদনাতুর হয়ে উঠত ‘উমার’ মুখ। হাজারো পুরস্কার, উপচে পড়া ভিড়ে সেই বেদনা কি ঢাকা পড়ত? পুজোকর্তারা তাকিয়ে দেখার ফুরসত পেতেন না।
আসলে ছুটতে ছুটতে আমরা ভুলেই গিয়েছিলাম, উৎসবের মর্ম পুরস্কার, ভিড়, চাকচিক্যে নয়। উৎসবের মর্ম ছুটির দিনে পরিবার, বন্ধুদের আড্ডায়। উৎসবের মর্ম পাড়ার সামাজিক মেলামেশায়। দুর্গা নারীশক্তির প্রতীক, প্রকৃতির রূপক। গাড়ি, কলকারখানা, প্লাস্টিক, রাসায়নিকের দূষণে সেই প্রকৃতিকেই ক্রমশ বিষাক্ত করে তুলেছিলাম। পাড়ার পুকুরে, বিলে মাছেদের খেলা ভাল লাগত না আমাদের। পুকুর ভরাট করে কত লাভ হবে, সেই অঙ্কেই মশগুল থাকতাম। স্থানীয় বাজারের দোকান ভাল লাগত না, বরং একই জিনিস শহুরে শপিং মলে বেশি দামে কিনে ইজ্জত বাড়ানোর চেষ্টা করতাম। শহরতলির ট্রেন বন্ধ, শহরে করোনার থাবা এ বার সেই ‘বস্ত্রালয়’ কিংবা ‘এম্পোরিয়াম’, ‘সিল্ক হাউস’ কিংবা ‘স্টোর্স’-এ মুখ ফেরাতে বাধ্য করেছে। পকেটে টান থাকায় কম দামের জিনিসপত্রের খোঁজ করেছি। বুঝতে পেরেছি, একই জিনিস গত কয়েক বছর শপিং মলে বেশি দামে কিনেছি। বুঝেছি, বাতাসে দূষণ কমলে আজও কুয়াশা হয়, শিশির জমে। আজও পাড়ার বস্ত্রালয়ের মালিকের হাসি মুখ একই আছে, কম খরচেও আনন্দ কেনা যায়, ছুটোছুটি না-করেও ছুটি কাটানো যায়।
সত্যিই কি বুঝলাম? অকালবোধনের শুরুতে বাঙালির বোধন হল কি? নাকি করোনা কাটলেই ফের ফিরে আসবে ছুটোছুটি?

 

(ফিচার ছবিটি গুগল থেকে নেওয়া)