দেবর্ষি ভট্টাচার্য

অঘ্রানের শিশিরবিন্দু ঘাসে ঘাসে চমক আনার আগে থেকেই আমি আঘ্রাণ পাই। শিউলি ফোটা আলোআঁধারি মায়ার গন্ধ। বীরেন্দ্রকৃষ্ণের ভোরের গন্ধ। দুকুল ভাসানো কাশবনের গন্ধ। শিশিরের নীরবতার গন্ধ। স্নেহাতুর করতলের গন্ধ। মায়ের গন্ধ। পুজোর গন্ধ। সেই কোন ছেলেবেলায় ফেলে আসা কৈশোরের সঙ্গে বারবার দেখা হয়ে যায়। রাতে বাড়ি ফিরতে দেরি হলে উৎকণ্ঠার প্রহর জ্বেলে ঠায় বসে থাকা মায়ের সঙ্গেও। বছরভর সবকিছু আগলে রাখতে রাখতে শারদ রজনীতে ঝাঁপি ভেঙে বেরিয়ে পড়ে তারা। সেই সব গন্ধমাখা, স্পর্শলাগা, শব্দমেশা স্মৃতির মায়া ঘেরা ক্যানভাসগুলো।
ছেলেবেলায় বাবা-ঠাকুমার মুখে বারংবার শোনা বাংলাদেশের ‘দেশের বাড়ির’ সাদামাটা দুর্গা পুজোর নিরহংকারী রূপের ছটা যেন ইদানিং চোখে এসে বসে। দূর থেকে ভেসে আসা ঢাকের আওয়াজে যেন মিশে থাকে স্মৃতিকাতরতার জলতরঙ্গের শব্দ। নিঃশ্বাসে এসে ভিড় করে আটচালার গন্ধ, বাতাবি লেবুর গন্ধ, নিকানো মণ্ডপের গন্ধ, কলাবউয়ের গন্ধ, যৌথ পরিবারের গন্ধ। যৌথখামারের স্বপ্নপোড়া গন্ধও হঠাৎ করে আবার নাকে ভাসে। সাম্যের মুক্ত সকালে শ্বাস নেওয়ার ইচ্ছে আবার নতুন করে মনে জাগে। সিচুয়ানের ডাডু নদীর রক্তমাখা জলস্রোত চেতনাকে অস্থির করে তোলে। লুডিং ব্রিজের উপর সেই কালজয়ী সাম্যের লড়াই কি তবে মিথ্যে ছিল! কে জানে! সবকিছু মিলিয়ে দেখার ফাঁকেই মায়াঘেরা আয়ু হঠাৎ যেন কেমন করে ফুরিয়ে আসে! আজকাল আমি যেন একা। আমারই মুখোমুখি। তবু প্রাণপণে অটুট রাখতে চাইছি জীবনভর আগলে রাখা সব বিশ্বাস-অবিশ্বাসের ফুল, বেলপাতা, মন্ত্রোচ্চারণগুলো।
ছেলেবেলায় মালভূমির টিলা দেখে যেমন পর্বত ভেবে বসেছিলাম, ঠিক তেমনই প্রথম যৌবনে পাড়ার জীবন পুরোহিতকে দেখেও সাক্ষাৎ ঈশ্বর মনে হয়েছিল। বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বরে মন্ত্রোচ্চারণের দৃপ্ততার শক্তিকে যেন সব অধরাকেই হাতের নাগালে পাওয়ার সর্বোৎকৃষ্ট অবলম্বন বলে মনে হয়েছিল। আজ এই বয়সে এসে স্বীকার করতে কোথাও বাধা নেই যে, সেদিন যতটুকু নিষ্ঠা ছিল, তার থেকে ঢের বেশি ছিল ছলনার আশ্রয়। তা কি নিছক এমনি! রাতভর জেগে চোখাচোখি হওয়ার বাসনার আলোড়ন … তা কি নেহাত তুচ্ছ ছিল! সেদিন শারদ সকালের প্রাণোচ্ছল হাসির মুক্তগুলো আর আড়চোখে চোখাচোখির স্বপ্ন বিনিময়ের মুহূর্তগুলো কি বদ্ধ ঝাঁপিতেই ঘূর্ণিপাক খেতে খেতে ক্লান্ত হয়ে মরবে! গন্ধ ভেসে আসে, মহাষ্টমীর অঞ্জলির ফুল-বেলপাতার, আলোকোজ্জ্বল সন্ধ্যাবেলার, ভিড় থিকথিক মুক্তির রাত্রিবেলার। এলোকেশ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে জুঁইয়ের গন্ধ। ঝকঝকে হাসির গন্ধ। নতুন শাড়ির গন্ধ। বুকের গন্ধ। এলোমেলো করে দেয় সব … অতীত, বর্তমান, কাঁচাপাকা চুল। করতলে মেঘমালাকে আঁকড়ে ধরতেই, সে যে কেবলই বাষ্প হয়ে যায়! ছেড়ে যাওয়া হাত, বৃষ্টি হঠাৎ, আনমনে ছুঁয়ে ফেলা!
শারদ রাতে বাবা এসে আমার মাথায় হাত রেখে আবার বলে চলেন, আম-জাম-কাঁঠালের মায়া ঘেরা বাংলাদেশের ‘দেশের বাড়ির গল্প’। গোলাভরা ধানের গল্প। দেশের বাড়ির অনাড়ম্বর দুর্গাপুজোর গল্প। পুজোর দিনের হইহুল্লোড়ের গল্প। দেশভাগের গল্প। স্বপ্ন ভেঙে চৌচির হওয়ার গল্প। ছিন্নমূল হয়ে ভিনদেশে ভিড় জমানোর গল্প। নিদারুণ জীবন সংগ্রামের গল্প। আবার নড়চড়ে বসে এতদিন ধরে ঝাঁপি বন্ধ স্মৃতির মায়াঘেরা সেই জলছবিগুলো। বন্ধ দরজা ভেঙে ছিটকে বেরিয়ে পড়ে। কলকল স্রোতে বয়ে চলে তারা। আমি ভেসে যাই তার অমোঘ টানে। দূর থেকে ঢাকের বাদ্যির আওয়াজ ভেসে আসে। দেবীর বোধনের আর দেরী নেই যে! শাঁখের আওয়াজে কাশবন দুলে ওঠে। বাবা অনেক না-বলা কথা ফেলে রেখেই মিলিয়ে যান কালের গহ্বরে। পড়ে থাকে স্পর্শহীন কথাগুলো। অবহেলায় ঝরে পড়া শিউলি ফুলের মতো। আমি তার ঘ্রাণ পাই। স্পষ্ট শুনতে পাই বাঁশবনের কান্না, নদী বাঁকের আর্তনাদ, পাড় ভাঙার শব্দ, রাজনৈতিক পাশা খেলার শব্দ, দেশভাগের শব্দ।
আজকাল যেন নিজেকেই বলি … একদিন, কোনও কালের অন্তে কোনও একদিন, হিংস্র এই পৃথিবীটা সর্বান্তকরণে মানবিক হবে। অসহিষ্ণুতার আগ্রাসনকে প্রতিহত করে ঠিক একদিন শাশ্বত হয়ে উঠবে আমার প্রাণের বহুত্ববাদী জন্মভূমি। উন্মত্ত এই পৃথিবীটা একদিন ঠিক মানুষের বসবাসযোগ্য হবে। বিশ্বব্যাপী সকল পরিবার আর মানুষেরা মঙ্গলময় হবে। বলতে বলতেই জলে ঝাঁপ দেওয়ার ঝপাং শব্দ কানে আসে। কারা যেন উলু দেয়। ঢাক বেজে ওঠে দুরন্ত তালে। চোখ বুজে দেখতে পাই, ধুয়ে যাচ্ছে সব … শোক, ক্রোধ, হিংসা, রক্তের দাগ। রং ধুয়েমুছে ভেসে ওঠে প্রতিমার কঙ্কাল। নিরাভরণ চালচিত্রের কাঠামো। সত্যম, শিবম, সুন্দরম। হইহই হাসি আর নেশার হুল্লোড়ের মাঝেই কাদের সঙ্গে যেন কোলাকুলি হয়ে যায়। আশীর্বাদও হয়। নেশাতুর নিশি এ ভাবেই কখন যেন অন্য এক ভোর এনে দেয়!
জীবনের অমোঘ চলমান গতিপথ মেনেই আজ অনেকটা দূর চলে এসেছি। পিছনের পথের মায়ার উদ্দীপনায় এখন সামনের বাকি পথ চলা। তবু আজও শারদীয়া আলো হয়ে এসে পড়ে … মননে, চৈতন্যে। এতদিনের জমিয়ে রাখা অবচেতনের উচ্ছ্বাসগুলো শারদ রাতের আসকারায় যেন মুক্তমালা। দূর থেকে ভেসে আসে … “পদ্মপাতায় পানি যেমন রে, জীবন টলমল টলমল করে”! পৃথিবীর অন্য সব প্রাণীর মতো প্রাণপণে আমিও বাঁচতে চাইছি। আরও, আরও খানিকটা বাঁচতে চেয়ে বলছি, নিজেকেই … “সোনালী সোনালী চিল, শিশির শিকার করে নিয়ে গেছে তারে”!

(লেখক বঙ্গবাসী সান্ধ্য কলেজের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ও বাণিজ্য বিভাগের বিভাগীয় প্রধান) 

(ফিচার ছবিটি গুগল থেকে নেওয়া)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here