কৌশিক গুড়িয়া

শুধু জেলায় নয়, লেখক হিসেবে নামডাক আছে জেলার বাইরেও। দেখি, তিনি টোটোয় ছ’মাসের পুরনো দৈনিক এবং জীর্ণ-মলিন ছোটো পত্রিকা-সহ প্রায় খান-চল্লিশ বই নিয়ে হাজির স্কোয়ার ফিল্ডের ক্যান্টনমেন্ট রোড থেকে যে রাস্তা বাস স্ট্যান্ড চলে গিয়েছে তার মুখে। আন্দাজটা হুবহু মিলে গেল তৃতীয়ার দুপুরে। হ্যাঁ, তিনি পৌঁছলেন বহরমপুরের পুরনো বইপাড়ায়। আগে যে রাস্তার আলোয় ঝিমুনি লেগে থাকত, আগে যেখানে প্রাক-সন্ধ্যায় রঙিন হয়ে এসে দাঁড়াতেন কয়েকজন মহিলা সহনাগরিক, সেখানেই। সে রাস্তায় আজ জমে উঠেছে বহরমপুরের পুরনো বইপাড়া। রাজু কিংবা বিপুলদের বদান্যতায় সেখানেই আজ অন্তত পাঁচটি বাতিল বইয়ের বিপণি। সেখানেই দাঁড়ালেন তিনি এবং যেন উজাড় করে দিলেন বাড়ির আবেগ-বর্জিত বর্জ্য উপাদান! দৈনিক খবরের কাগজে পেলেন কেজি প্রতি দশ টাকা আর পত্রপত্রিকা ও বাতিল বই প্রতি কেজি পাঁচ টাকা!
রাজু চৌহান মধ্য চল্লিশের যুবক। এ চত্বরের বেশিরভাগ দোকান তাঁর। পাঁচ কর্মচারী ও বিশাল পরিমাণ পুরনো বই পুঁজি তাঁর। আদপে মালদহের বাসিন্দা রাজু প্রায় সতেরো বছর এ শহরের ভাড়াটিয়া। কোনও রাখঢাক নেই; জানালেন, দোকান ভাড়া বাবদ হাজার দশেক এবং কর্মীদের মাইনে  মিটিয়ে মাসে তাঁর আয় তিরিশ থেকে পঁইত্রিশ হাজার। এ বার ভাবুন, আইনস্টাইনের রিলেটিভিটি তত্ত্বে কি এমন কথা লেখা আছে? বই কতটা আপেক্ষিক! যে বাতিল বই বাড়ির জঞ্জাল, হয়তো  গৃহকর্ত্রীর আবদার অথবা অত্যাচারে পুজোর আগেই ঘর পরিষ্কার করতে বাধ্য হয়েছিলেন সেই লেখক, তেমন বইপত্তর আবার রাজু কিংবা বিপুলের ক্ষেত্রে সংসারের লক্ষ্মী। ব্যবসার কাঁচামাল! সেই বাতিল বই আপেক্ষিকতার মায়ায় হয়ে ওঠে ছেলের দুধের পয়সা, হয়ে ওঠে আনাজ-মাছের মুল্য, কিংবা বাড়িভাড়ার কড়ি!
এ ব্যবসায় বিপুল বিশ্বাস অবশ্য লকডাউনের ফসল। তাঁর জীবিকার বয়স মাত্র ছ’মাস। আগে তেমন কাজ ছিল না। হয়তো রাজু বা অন্য কারও অনুপ্রেরণায় কলেজ স্ট্রিট থেকে বই সংগ্রহ শুরু করেন তিনি। কিংবা আমার আপনার মতো প্রতিবেশীরাই তাঁদের কাঁচামাল জোগান দেন। আর সেখান থেকেই লক্ষ্মী ও সরস্বতীর দোয়ায় করোনাকালেও শারদ উৎসব টিকে থাকল তাঁদের। সে তো গেল আর্থ-সামাজিকতার সিলেবাস, কিন্তু প্রশ্ন থেকে গেল ভিন্ন খাতে…

 

যাঁকে আমরা মান্য বলি, যাঁর লেখা ভিন জেলার সাময়িকপত্রের পাতায় দেখলে আমাদের চোখ জ্বলজ্বল করে ওঠে, এবং অগাধ মমতায় যাঁর কাছে ছুটে গিয়ে সদ্য প্রকাশিত একটি লিটল ম্যাগাজিন তুলে দেন নবীন কোনও কবি-সম্পাদক, তিনি কি জেলার নব্য কবি-সম্পাদকটিকে আড়ালে অবহেলা করলেন না? বহুকালের অভ্যেস থেকে আদর-যত্নের ডালপালায় যখন নতুন একটি পত্রিকা কিংবা কাব্যগ্রন্থের কুঁড়ি ধরে, তখন সে কুঁড়ির ফোটা ফুল এ ভাবে রাস্তায় ঢেলে দিতে পারলেন তিনি? আড়ালে অবমাননা করতে পারলেন মুর্শিদাবাদের অনামা-অখ্যাত নতুন লেখকের প্রাণ ভোমরাকে?
হ্যাঁ, সন্তর্পণে তাঁর উচ্ছিষ্ট বইপত্র ঘেঁটে দেখলাম, শহরের বেশ কিছু প্রকাশনার গল্প ও কবিতা গ্রন্থ! যা তিনি পাঁচ টাকা কেজি দরে বেঁচে দিলেন তা এ বার পিস হিসেবে দর পাবে। পুজোর আগে আনন্দের খবর এটুকুই! এমনকি পেলাম এ জেলার আরও এক নামী গল্পকারের তাঁকে লিখে দেওয়া উপহার গ্রন্থ! এ ঘটনার অভিমান ঠিক যেন শরতের শিউলির গা বেয়ে ঝরে  যাওয়া একদানা শিশির…
এ অভিযানে লাভবান হলাম আমিও। মাত্র তিরিশ টাকায় অর্জন করলাম ২০০৫ সালে সাহিত্য অকাদেমি পাওয়া বিনয় মজুমদারের হাসপাতালে লেখা কবিতাগুচ্ছ এবং সুজিত সরকারের নির্বাচিত কবিতা। আর বাড়ি ফিরতে ফিরতে আবারও মনে হল, আইনস্টাইন সত্যিই বড় কবি ছিলেন!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here