শুভদীপ ভট্টাচার্য

বাবাকে খুঁজে চলে বিট্টু। সবাই জানে, বিট্টুর বাবা কোথায়, কিন্তু কেউই তাকে সদুত্তর দিতে পারে না। এ ঘর, ও ঘর বাবাকে খুঁজে খুঁজে ক্লান্ত বিট্টু ছুড়ে দিল, ‘মা, এ বার বাবা জামা কিনে আনবে না?’
বিট্টুর বয়স এখন আড়াই। ভুল হল, দু’বছর সাত মাস। গত একবছর ধরে কানাগলি, খেলার মাঠ আর দিগন্তব্যাপ্ত আকাশের নীচে বিট্টু খুঁজছে ওর বাবাকে। বিট্টুর দিদি রাতের আকাশে আঙুল তুলে বলে ‘ওই যে দেখছিস, জ্বলজ্বল করছে, ওটা বাবা’। লাখো তারার ভিড়ে বিট্টু গুলিয়ে ফেলে, বাবাকে ভাল করে চিনতে পারে না।
বহরমপুরের কান্তনগর এলাকায় সরু গলি ধরে কিছুটা এগিয়ে গেলে চোখে পড়ে কতগুলি ঘর। সেখানেই বেঁচে নিচ্ছে কতগুলি জীবন, বেড়ে উঠছে বিট্টুও। পাড়ার মোড়ে নাগাড়ে বাজছে ঢাক। টালির চালের নীচে একটা ঘরে বসে অঝোরে কেঁদে চলেছেন বিট্টুর মা, মলি। কান্নার আওয়াজও একসময় ঢেকে দেয় ঢাক। মাথায় হাত রেখে সান্ত্বনা দিতে দিতে প্রৌঢ়ারও সম্বল শুধু চোখের জল।
বিট্টু ফ্যালফ্যাল করে কিছুক্ষণ মা ও ঠাম্মার দিকে তাকিয়ে থাকে। তার পরে ড্রয়ার থেকে বের করে একটা আগলে রাখা স্মৃতিচিহ্ন, একটা মোবাইল ফোন। সেটা কানে তুলে নিয়ে বলে, ‘বাবা, আমার জন্য একটা বন্দুক আর অনেকগুলো তুবড়ি আনবে। ঠিক আছে?’ কোনও উত্তর না পেয়ে ফোনটা সে রেখে দেয়। দিদিকে সঙ্গে নিয়ে বিট্টু ফের তারাভরা আকাশে খুঁজে চলে বাবাকে।
গত বছর আলোর উৎসবেই কান্তনগরের দুই বাড়িতে নেমে এসেছিল আঁধার। বিট্টুর বাবা পেশায় ময়রা, ছোটন দাস বেরিয়ে গিয়েছিলেন অন্যদিনের মতো। বিট্টুর হাতে দিয়ে গিয়েছিলেন তুবড়ি আর চরকির প্যাকেট। ছোটনের সঙ্গেই কাজে গিয়েছিলেন কান্তনগরের গৌতম হাজরাও। তবে কাজ শেষ হলেও তাঁদের আর ঘরে ফেরা হয়নি। শর্ট-সার্কিটেই শেষ হয়ে যায় দুটি তাজা প্রাণ! গৌতমের সংসারের হালও তথৈবচ। তাঁর স্ত্রী রাখী ছেলে গোপাল আর মেয়ে খুশিকে নিয়ে কোনও ভাবে টেনে চলেছেন সংসার। দুটি বাড়ির দুয়ারেই তাই থমকে গিয়েছে পুজোর রোশনাই।
ছোটনের মা বলে চলেন, ”ছেলেটা বলে গিয়েছিল, ফিরে এসে মাংস খাবে। রান্নাও করলাম। আর সেই রাতেই সব শেষ হয়ে গেল। ঘরে ফিরল সাদা কাপড়ে ঢাকা ছেলের দেহ।” বৃদ্ধার চোখে ভেসে ওঠে টুকরো টুকরো অজস্র স্মৃতি। মলির চোখে টলটলে শ্রাবণ। এ বার মায়ের কোলে এসে ফের বায়না ধরে বিট্টু, ”ও মা, বাবা বন্দুক আর তুবড়ি নিয়ে কখন আসবে?”
(ফিচার ছবিটি গুগল থেকে নেওয়া)