দেবর্ষি ভট্টাচার্য

কৈশোরকাল থেকে নবমী নিশি ছিল বেদনার রঙে নীল। গ্লাসের ভেতর লাফিয়ে নামে বিষাদ। রাত্রিগুলো আলো জ্বালে যত, অন্ধকারের চোখ রাঙে তত। বাঁকা চাঁদ আড়চোখে আজও দেখে ফেলে। আলোআঁধারি পথ হাতড়ে চলে আবছা কুয়াশা। মণ্ডপের সুসজ্জিত আলোর আবডালে থরে থরে অন্ধকার জমাট বাঁধে। আধেক লীন স্মৃতির আকাশে মেঘের আড়াল থেকে কে যেন বিড়বিড় করে বলে ওঠে … “ফুরায়ে যেও না তুমি নবমী নিশি”। সঙ্গে সঙ্গে মন-প্রাণ জুড়ে অব্যক্ত ফুটন্ত কথার বুদবুদ। কাকেই বা বলি! আলোর অপেরার মধ্যে লুকিয়েছিল কতটা কান্না! কত জনমের রক্তস্রোতের দাগ চাপা পড়ে আছে নিয়নের ঝাড়বাতির আলোর অন্তরালে! তোকে ছাড়া আর কাকেই বা বলি! তুই ছাড়া কজনাই বা বোঝে, মৃত প্রজাপতির পাখায় লেগে থাকে কতখানি শোক!
ছেলেবেলার নবমী নিশি চলে যেতেই পায়ে পায়ে হেঁটে যাই মুছে যাওয়া ক্ষত চিহ্নের ফসিলের কাছে। রং-তুলিতে তুফান তোলা বন-পাহাড়ির নিবিড় আলিঙ্গনে। কে জানে, তাঁরা কেমন আছে! আমার প্রাণের মেঘরঙা ক্যানভাসগুলো, অস্ফুট জ্যোৎস্নায় যা কানায় কানায় ভরেছিল! কেমনই বা আছে বুকের বাঁ দিকে দপদপ করে জ্বলতে থাকা আধো-আলো-অন্ধকারময় কেরোসিনের পিদিমের সেই আকুলতা! মুহূর্তদের কালান্তরি আবেগের আলিঙ্গনে আগলে রাখার সেই ব্যাকুলতা! অথবা আকাশভরা চাঁদ, তারারা! জঙ্গলের ফিসফাস! নগ্ন আদিমতা! নিস্তব্ধতার আড়াল ভেঙে ছুঁতে আসে প্রতিটি ক্ষণ।
নবমী নিশি ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই হারিয়ে গেছে কঙ্কনা। ঘোর নিশি ডাকে যে ছিল বাঁধনহারা, পাগলপারা।  তা সে ‘সঘন গহন রাত্রি’ই হোক, বা প্লাবনের জ্যোৎস্না। নিশি ডাকের নাকি একটা গন্ধ আছে! নিখাদ স্পর্শ আছে। জংলী আবদার আছে। মাদকতাও আছে। ধামসা, মাদল, মহুয়া … সবই জড়িয়ে আছে আষ্টেপৃষ্ঠে। নিশি ডাকের আবেদনে মারাংগুরুও নাকি এসে বসেন মগডালে!
শাল-পিয়ালের জঙ্গলে আমাকেও একবার নিশি ডেকেছিল। সেদিন চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙেছিল। ইচ্ছেনদীর মতো আঁকাবাঁকা সেই চাঁদ। থোকা থোকা ছাতিম ফুলেরা মধুকরী মাদকতার গন্ধ নিয়ে ঠিক এসে হাজির। কঙ্কনার এলোচুলও। কাঞ্চনচূড়ার মতো। শরীরের বুনো গন্ধ। যেন মহুয়া ফুলের মত্ততায় ভরা। দূর থেকে ভেসে আসা ধামসা, মাদল আর বন্য নদী। উজান স্রোতের খরবায়ু মন। আর ছিল বল্গাহীন শরীর। জঙ্গলের ফিসফাস। আর আদিমতা।
অনেক নবমী নিশি পেরিয়ে আজ এসে থমকে দাঁড়িয়েছি কার্তিকের হিমেল কুয়াশার কাছে। তোর শ্বাসে-প্রশ্বাসে যে কুয়াশারা নিশিভর লেগে থাকত। মনে আছে তোর, কুসুমতলির নিকানো মণ্ডপের আলো! কিংবা ছাতিমের আলোমাখা নির্জন ধু ধু প্রান্তর! দূর থেকে ভেসে আসা ঢাকের আওয়াজ! চোখে চোখ, হাতে হাত! পুজোর গন্ধ! জন্মান্তরি পথ চলার শব্দ! জীবনে কোনওদিন ভেবেছিলি, এও নাকি ভুলে থাকা যায়! তবু আমি আজও ঘ্রাণ পাই। তুইও চুরি হয়ে গেলি কঙ্কনা! কোনও এক স্বপ্নের কাছে ফেলে রেখে তোর সেই মুখ, কখনও না দেখা! তোর শায়িত শরীরে ছিটিয়ে দেওয়া আতরের গন্ধ। ধূপকাঠির বিলীন হওয়ার নৈঃশব্দ্য। আমার আর কিচ্ছু মনে নেই। মনে রাখতে চাই না। দুঃসহ যন্ত্রণায় কিলবিল করে ওঠে মন। সেই বীভৎস ঘটাং শব্দটা! লিভারে চাপ। অসহনীয়। ক্ষতবিক্ষত হৃদয়। অনর্গল রক্তস্রোত। এই জরাগ্রস্ত কার্তিকের হিমেল নবমী নিশিতেও তোর শরীরের পোয়াতি ধানক্ষেতের গন্ধ ছিল। মুঠোয় জোনাকি নিয়ে এসেছিলি তুই। বিশ্বাস কর, জগৎ জুড়ে আজ এতটুকুও মেঘ জমেনি কোথাও, যখন আমার চোখের পাতায় বৃষ্টি নামলো।
‘এ পৃথিবীর ঘোরতর অসুখ আজ’। প্রেমও বিপন্ন। বুনো গন্ধও। কঙ্কনা আজও ঘুমিয়ে আছে। নবমী নিশি ফুরবার আগেই। ‘এই ঘুম চেয়েছিলি নাকি’! ধামসা স্তব্ধ। মাদল বাকরুদ্ধ। মহুয়ার ঘোর স্তিমিত। ইচ্ছে নদীর মতো চাঁদ মেঘাচ্ছন্ন। আকাশে, বাতাসে প্রাণঘাতী আণুবীক্ষণিক জীবাণুর দানবীয় দাপাদাপি। ধরিত্রীতে ভ্যাক্সিন আর ভোটের অঙ্ক মিলেমিশে একাকার। কঙ্কনা, তুইই বল, এতকিছুর পরেও ‘মানুষ কি তবু ঋণী থাকতে পারে এ পৃথিবীর কাছে’! তুই মরে গিয়ে বেঁচেছিস কঙ্কনা। আমি মরিনি, তাই আমি আজ মৃত। আমার মতো অনেকেই হয়তো মরেনি আজও। তুই বিলক্ষণ জানিস, ‘শকুন ও শেয়ালের খাদ্য আজ তাঁদের হৃদয়’। বহু যুগ পরে একটা নির্ভেজাল সত্যকে উন্মুক্ত করে ফেলি। তোর কাছে আমার আর লজ্জা কী! তুই এখন বহু দূরের পৃথিবী। আমিও প্রাণপণে দূরত্ব আগলে রাখি। কিন্তু সত্যি বল, যতটা দূরে গেলে আঁচ লাগবে না, পুড়বে না হৃদয়, ততটা দূরে কি আর কোনওদিন যাওয়া যায়!
(ফিচার ছবিটি গুগল থেকে নেওয়া)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here